এক এগারোর সময় জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেলে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকেও নির্যাতন করা হয়। জেআইসি বা ‘আয়নাঘরে’ তাকে নির্যাতনের তথ্য মিলেছে বিভিন্ন সাক্ষীর বক্তব্যে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম গতকাল এ তথ্য জানিয়েছেন। জেআইসি ঘুরে দেখার পর চিফ প্রসিকিউটর ‘আয়নাঘর’ নিয়ে নিজের পরিদর্শন অভিজ্ঞতাও তুলে ধরেন। ট্রাইব্যুনাল সূত্র জানায়, দু’জন সাক্ষী ও গ্রেপ্তার দু’জন আসামির বর্ণনায় উঠে এসেছে তারেক রহমানকে নির্যাতনের বর্ণনা। সাবেক এমপি লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী তদন্ত সংস্থায় বলেছেন, ডিজিএফআই কর্তৃক তারেক রহমানকে জিজ্ঞাসাবাদের নামে নির্যাতন করা হয়। এ বিষয়ে তিনি বিস্তারিত তথ্যও দিয়েছেন।
শতাধিক গুম ও হত্যার ঘটনায় অভিযুক্ত সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের মামলায় সাক্ষ্য দেন সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূঁইয়া। ট্রাইব্যুনালে তিনি বলেন, ২০০৭ সালে নির্বাচনের প্রাক্কালে প্রধান বিচারপতির বয়স বাড়ানোর জন্য যে সংঘাত শুরু হয় তার পরিপ্রেক্ষিতে স্টেট অব ইমার্জেন্সি ঘোষণা করা হয়। ২০০৭ থেকে ২০০৯ পর্যন্ত সময়ে ডিজিএফআই হয়ে ওঠে দেশের মুখ্য নিয়ন্ত্রক। বিভিন্ন সময়ে তারা বিভিন্ন ব্যক্তিদের উঠিয়ে এনে তাদের সেলে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করতো। এর মধ্যে অনেক মন্ত্রী এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ ছিলেন। তারা তারেক রহমানকেও উঠিয়ে নিয়ে নির্যাতন করে। আরেক সাক্ষী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবদুল্লাহিল আমান আযমী তার বইয়ে লিখেন, যে তাকে জেআইসিতে যে রুমে বন্দি করে বাখা হয়েছিল সেই একই রুমে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকেও এনে নির্যাতন করা হয়েছিল। যা তিনি বন্দি থাকাবস্থায় তাকে খাবার সরবরাহ করা লোকদের কাছে শুনেছেন। এ ছাড়া প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) সাবেক মহাপরিচালক শেখ মামুন খালেদকে তদন্ত সংস্থায় জিজ্ঞাসাবাদেও এ বিষয়ে তথ্য মিলেছে। তিনি বলেছেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী গত ২০০৭ সালের ৭ই মার্চ গ্রেপ্তার হন। তখন তিনি কুমিল্লা সেনানিবাসে কমান্ড্যান্ট স্কুল অব মিলিটারি ইন্টেলিজেন্সে কর্মরত ছিলেন। তিনি বলেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে দুইবার ডিজিএফআই এর জেআইসিতে নেয়া হয় এবং জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। যা জেআইসিতে রক্ষিত রেজিস্টারে নির্দিষ্টভাবে লেখা আছে।
ওদিকে গতকাল পরিদর্শনের পর ‘আয়নাঘর’-এর বিভিন্ন সেলের বর্ণনা দিয়েছেন ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম। তিনি বলেন, চারটি স্থাপনার মধ্যে টিএফআই সেলকে সবচেয়ে ভয়াবহ বলে মনে হয়েছে। সেখানে শ্রেণিভেদে বন্দিদের আলাদা করা হতো বলে ধারণা পাওয়া গেছে। তবে জেআইসি সেলও কোনো অংশে অমানবিক ছিল না এমনটি নয়। তিনি বলেন, একজন মানুষকে যখন দিনের পর দিন বন্দি করে রাখা হয়, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয় এবং আইনি সহায়তা পাওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়, তখন সেটিই ক্রাইমস এগেইনস্ট হিউম্যানিটি। তাকে কোন সেলে কীভাবে রাখা হয়েছিল তার চেয়ে বড় বিষয় হলো, কতোদিন এবং কী প্রক্রিয়ায় তাকে আটক রাখা হয়েছিল।
জেআইসি সেলের কাঠামোর বিষয়ে তিনি বলেন, কক্ষগুলো সাউন্ডপ্রুফ রাখার ব্যবস্থা ছিল, যাতে ভেতরের কোনো কান্নার আওয়াজ বাইরে না যায়। ভারী এক্সজস্ট ফ্যান ছিল, কোনো জানালা ছিল না। অন্ধকার প্রকোষ্ঠের মধ্যে মানুষকে রাখা হতো। তিনি আরও বলেন, কোন কক্ষ কতো বড় বা ছোট, সেটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বাংলাদেশের একজন নাগরিককে এভাবে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস আটকে রাখা হয়েছে। প্রচলিত আইন অনুযায়ী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী একজন নাগরিককে ২৪ ঘণ্টার বেশি আটকে রাখতে পারে না। সেখানে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস কিংবা বছরের পর বছর কাউকে আটকে রাখার কোনো যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়।
শনিবার দুপুরে কাউন্টার টেরোরিজম ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর (সিটিআইবি) অধীনে থাকা জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেন্টার বা জেআইসি পরিদর্শনে যান ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদার, সদস্য বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী এবং রেজিস্ট্রার আবু সালেহ মোহাম্মদ রুহুল ইমরান। এ ছাড়া প্রসিকিউশনের পক্ষে চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম, প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম, জহিরুল আমিন, ব্যারিস্টার শাইখ মাহদী ও তাসমিরুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন। ডিফেন্সের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন- আজিজুর রহমান দুলু, ব্যারিস্টার হামিদুল মিসবাহ, ব্যারিস্টার মাহিন রহমান এবং রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী আমির হোসেন। সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও সংবাদপত্র মালিকদের সংগঠন নিউজপেপার্স ওনার্স এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (নোয়াব) কার্যনির্বাহী কমিটির সভাপতি হিসেবে দৈনিক মানবজমিন-এর প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন। পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম।
ভবিষ্যতে বাংলাদেশে এ ধরনের কোনো টিএফআই সেল, জিআইসি সেল বা তথাকথিত ‘আয়নাঘর’ প্রতিষ্ঠিত না করার আহ্বান জানিয়ে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, কোনো নাগরিক অপরাধ করলে তাকে অবশ্যই আইনের আওতায় এনে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। কিন্তু কোনো নাগরিক যেন বিচারবহিভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার না হন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাধ্যমে অহেতুক হয়রানি বা গোপন বন্দিশালায় দিনের পর দিন, মাসের পর মাস আটক না থাকেন, তা নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, বিগত সরকারের আমলে কিছু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য সরকারের কথিত অসৎ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে এসব টর্চার সেল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সেখানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও ইসলামী সংগঠনের নেতৃবৃন্দসহ ভিন্নমতের ব্যক্তিদের ধরে এনে আটকে রাখা হতো। অনেককে সেখান থেকে পরবর্তীতে গুম করা হয়েছে। এখনো বহু গুমের শিকার ব্যক্তির সন্ধান পাওয়া যায়নি। অনেক ভুক্তভোগীকে মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর আটকে রেখে নির্যাতন করা হয়েছে। চিফ প্রসিকিউটর বলেন, এই টিএফআই ও জিআইসি সেলের সঙ্গে সম্পৃক্ত যেসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া গেছে, তাদের অনেককেই ইতিমধ্যে বিচারের আওতায় আনা হয়েছে এবং বিচার চলছে। ভবিষ্যতে যাদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যাবে, তাদেরও এসব অমানবিক কর্মকাণ্ডের জন্য বিচারের মুখোমুখি করা হবে।
ডিফেন্সের আইনজীবীদের বক্তব্যের সমালোচনা করে তিনি বলেন, আমাদের ডিফেন্সের বন্ধুরা শেখ হাসিনার ভাষায় কথা বলেন। শেখ হাসিনা যেমন যখন যা মন চায়, সেভাবে কথা বলেন, তাদের প্রতিনিধিরাও একইভাবে বিভ্রান্তিমূলক বক্তব্য মিডিয়ার সামনে উপস্থাপন করেন। জাতিকে আর বিভ্রান্ত করার সুযোগ নেই। এই দেশের মানুষ নিজেরাই ভুক্তভোগী। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, প্রায় ৩০ হাজার মানুষ অঙ্গহানি ও পঙ্গুত্বের শিকার হয়েছেন, প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ শহীদ হয়েছেন এবং ৪ হাজারের বেশি মানুষ গুম, খুন কিংবা কথিত ক্রসফায়ারের শিকার হয়েছেন বলে বিভিন্ন তথ্য রয়েছে। প্রায় ২৫০ জনের এখনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। ইলিয়াস আলী, সুমনসহ বহু ব্যক্তি গুমের শিকার হয়েছেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, আমাদের সাক্ষ্য-প্রমাণ ও এভিডেন্সে যা উঠে এসেছে, আমরা সেটিই আপনাদের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করছি। আমরা কোনো গোপন বিচার করছি না, কোনো ক্যামেরা ট্রায়ালও করছি না। অত্যন্ত স্বচ্ছতার সঙ্গে বিচার কার্যক্রম চলছে এবং সারা বিশ্বের মানুষ এই বিচার দেখছে। আন্তর্জাতিক মানের স্বচ্ছ বিচার প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ একটি নজির স্থাপন করবে বলে আমরা মনে করি।
তৎকালীন সরকার ও রাষ্ট্র পরিচালনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহিতার আওতায় আনার কথা উল্লেখ করে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, কী কারণে একজন নাগরিককে আটক রাখা হয়েছিল, কেন এই আয়নাঘরের প্রয়োজন হয়েছিল-এর ব্যাখ্যা তৎকালীন সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা এবং যারা রাষ্ট্র পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তাদের প্রত্যেককেই দিতে হবে। এই ব্যাখ্যা প্রসিকিউশন দেবে না; এর ব্যাখ্যা তাদেরই দিতে হবে।
আওয়ামী লীগ শাসনামলে লোকজনকে অবৈধভাবে আটকে রাখা ও নির্যাতনের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এসব গোপন বন্দিশালা সাধারণ মানুষের কাছে আয়নাঘর নামে পরিচিত। এখানে গুম ও নির্যাতনের অভিযোগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা করা হয়েছে। এতে অভিযুক্ত আসামিদের তালিকায় ডিজিএফআইয়ের সাবেক পাঁচ মহাপরিচালক এবং পাঁচ পরিচালক রয়েছেন। মামলাটি বর্তমানে ট্রাইব্যুনাল-১ এ বিচারাধীন রয়েছে। এ মামলায় এমপি হুম্মাম কাদের চৌধুরী, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবদুল্লাহিল আমান আযমী, অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা হাসিনুর রহমানসহ মোট ৬ জন সাক্ষী দিয়েছেন। আসামিদের মধ্যে ডিজিএফআইয়ের সাবেক তিন পরিচালক- মেজর জেনারেল শেখ মো. সরওয়ার হোসেন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাহবুবুর রহমান সিদ্দিকী ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমেদ তানভির মাজাহার সিদ্দিকী এরই মধ্যে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে রয়েছেন। ৩ আসামির পক্ষের আইনজীবী ব্যারিস্টার হামিদুল মিসবাহ বলেন, জেআইসি ছিল সিটিআইবি-এর আওতাধীন। এটি ছিল জেলখানার মতো। এবং তারা ছিল জেলারের ভূমিকায়। জেলার যেমন সিদ্ধান্ত নেন না যে এখানে কাকে আনা হবে, কতোদিন রাখা হবে, কবে ছাড়া হবে। আমার ক্লায়েন্টের ভূমিকাও একই রকমের ছিল। তারা এসব বিষয়ে জানতেন না এবং তাদের কোনো সম্পৃক্ততাও নেই।
ডিজিএফআইয়ের বন্দিশালা
জিআইসি পরিদর্শনের পর সাক্ষী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব) আযমীর দেয়া সাক্ষ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন আসামিপক্ষের আরেক আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু। তার দাবি, ট্রাইব্যুনালে আযমী বলেছেন, বন্দিশালায় থাকাকালে তিনি আলো-বাতাস, চন্দ্র-সূর্য ও গাছপালা কিছুই দেখেননি। অথচ আজ পরিদর্শন করা কক্ষটির দক্ষিণ দিকে দু’টি জানালা রয়েছে এবং সেখান থেকে বাইরে থাকা গাছপালা স্পষ্ট দেখা যায়। ডিফেন্স আইনজীবী বলেন, যে ব্যক্তি দাবি করেছেন তিনি গাছপালা দেখেননি, তার কক্ষের দু’টি জানালা দিয়ে যদি গাছপালা দেখা সম্ভব হয়, তাহলে তার সাক্ষ্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এতে দিবালোকের মতো পরিষ্কার, মিস্টার আযমী মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়েছেন।
বন্দিশালাটিকে ‘আর্ট গ্যালারি’ নামে ডাকা হতো: প্রসিকিউশনের জেআইসি’র বর্ণনাসম্বলিত ডকুমেন্টে বলা হয়, ঢাকা সেনানিবাসে ডিজিএফআই সদর দপ্তর ও মেস-বি সংলগ্ন একটি দোতলা ভবনটিই ছিল জেআইসি। ডিজিএফআই-এর কাউন্টার টেরোরিজম ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো (সিটিআইবি)-এর অধীনে পরিচালিত এ স্থাপনাটি মূলত জিজ্ঞাসাবাদের কাজে ব্যবহারের কথা থাকলেও আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এটি গোপন বন্দিশালা হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। বন্দিদের আটকে রাখার সময় কোনো কোনো ক্ষেত্রে গোপন বন্দিশালাটিকে ‘আর্ট গ্যালারি’ নামেও উল্লেখ করা হতো। দোতলা ভবনের নিচতলায় থাকা জেআইসি বন্দিশালাটি দুই অংশে বিভক্ত। সেখানে ছোট-বড় মিলিয়ে মোট ২৬টি স্থায়ী সেল ছিল। এক অংশের সেলগুলোর গড় আয়তন প্রায় ১৬ ফুট বাই ৬ ফুট। এ অংশের ছাদ ছিল তুলনামূলক উঁচু। অন্য অংশের সেলগুলোর গড় আয়তন ছিল ১২ ফুট বাই ৮ ফুট। এসব সেলের দেয়াল সিমেন্ট দিয়ে এবড়ো-থেবড়োভাবে তৈরি করা। এর মধ্যে অপেক্ষাকৃত বড় দু’টি সেল ‘ভিআইপি সেল’ নামে পরিচিত ছিল সাধারণ সেলগুলোতে কোনো জানালা ছিল না। কয়েকটি সেলে এক্সহস্ট ফ্যান, লোহার শিক ও কাঠের দরজা ছিল। অপেক্ষাকৃত বড় দু’টি সেল ‘ভিআইপি সেল’ নামে পরিচিত ছিল। বন্দিদের জিজ্ঞাসাবাদ ও নির্যাতনের জন্য দু’টি সাউন্ডপ্রুফ বিশেষ কক্ষও ছিল বলে তদন্তে উঠে এসেছে। স্থাপনাটির নিরাপত্তা ও অভ্যন্তরীণ দায়িত্বে এমওডিসি ও সামরিক বাহিনীর সদস্যরা নিয়োজিত ছিলেন। বন্দিদের চিকিৎসার জন্য ডিজিএফআইয়ের এমআই রুমে কর্মরত চিকিৎসক ও মেডিকেল এসিস্ট্যান্টরাও দায়িত্ব পালন করতেন বলে জানা গেছে।
এতে আরও বলা হয়, জেআইসিতে আটকে রাখা ব্যক্তিদের অনেককে পরবর্তী সময়ে টিএফআইসহ অন্যান্য গোপন বন্দিশালায়ও পাঠানো হতো। গুম ও নির্যাতনের অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর জেআইসি পরিচিতি পায় ‘আয়নাঘর’ নামে। বন্দিদের পরিচয় গোপন রাখতে বিভিন্ন শিল্পকর্মের নাম কোডনেম মোনালিসা) হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। তদন্তের সময় স্থাপনাটি পরিদর্শন করে দেয়াল, দরজা, জানালা ও অন্যান্য কাঠামোতে পরিবর্তন ও ক্ষয়ক্ষতির চিহ্ন পাওয়া গেছে। তদন্তসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, ৫ই আগস্ট ২০২৪-এর পর জেআইসি’র মূল কাঠামো ও সম্ভাব্য আলামতের একটি বড় অংশ নষ্ট করা হয়েছে, ফলে বলপূর্বক গুম ও নির্যাতনের ঘটনাগুলোর গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্যপ্রমাণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
