বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি খাতের বড় অংশ জুড়েই রয়েছে মৌলিক বা ‘বেসিক’ পণ্য। টি-শার্ট, প্যান্ট, সোয়েটার, আন্ডারগার্মেন্টস ও শিশুদের পোশাকের মতো পণ্যের ওপরই দেশের পোশাক রপ্তানি অনেক বেশি নির্ভরশীল। বিপরীতে বিশ্ববাজারে তুলনামূলক বেশি চাহিদার উচ্চমূল্যের ও বৈচিত্র্যময় পোশাক- যেমন আউটারওয়্যার, ড্রেস, স্পোর্টসওয়্যার, টেকনিক্যাল ওয়্যার ও স্যুট- রপ্তানিতে বাংলাদেশের অংশ এখনো বেশ কম। ক্যালেন্ডার বছর ২০২৫-এর পোশাক রপ্তানির তথ্য বিশ্লেষণ করে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ প্রায় ৩৮.৮২৫ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে। একই সময়ে ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড সেন্টারের (আইটিসি) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্ববাজারে পোশাক রপ্তানির পরিমাণ ছিল প্রায় ৪২৬ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েস (বিএভি) ইপিবি ও আইটিসি ট্রেড ম্যাপের তথ্য বিশ্লেষণ করে এই তুলনা করেছে। তথ্য বলছে, বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি হওয়া পোশাকের ৭৬.৯৪ শতাংশই বেসিক ক্যাটাগরির পণ্য। এর মধ্যে রয়েছে বটমওয়্যার বা প্যান্টজাতীয় পোশাক, টি-শার্ট, সোয়েটার, ইননারওয়্যার, শিশুদের পোশাক এবং ছোটখাটো অ্যাক্সেসরিজ। অন্যদিকে বিশ্বব্যাপী মোট পোশাক বাণিজ্যে এসব মৌলিক পণ্যের অংশ ৬১.৫৮ শতাংশ। অর্থাৎ বিশ্ববাজারের তুলনায় বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি বেসিক পণ্যের ওপর প্রায় ১৫ শতাংশীয় পয়েন্ট বেশি নির্ভরশীল।
এর মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ বটমওয়্যারের। বাংলাদেশের মোট পোশাক রপ্তানির ৩৩.৬৮ শতাংশ আসে এই শ্রেণির পণ্য থেকে। বিশ্ববাজারে বটমওয়্যারের অংশ ২১.৬৮ শতাংশ। অর্থাৎ বিশ্ববাজারের তুলনায় বাংলাদেশের রপ্তানি ঝুড়িতে প্যান্ট ও অনুরূপ পোশাকের নির্ভরতা অনেক বেশি। টি-শার্টের ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা যায়। বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির ১৮.৬৪ শতাংশ টি-শার্ট থেকে আসে। বিশ্ববাজারে এই হার ১০.০৯ শতাংশ। তবে বেসিক ক্যাটাগরির সব পণ্যে বাংলাদেশ এগিয়ে নেই। বরং ছোট অ্যাক্সেসরিজের ক্ষেত্রে বিশ্ববাজারের তুলনায় বাংলাদেশের অবস্থান বেশ পিছিয়ে।
বিশ্বের পোশাক বাণিজ্যে ছোট অ্যাক্সেসরিজের অংশ প্রায় ৭.৫২ শতাংশ হলেও বাংলাদেশের রপ্তানি ঝুড়িতে এর অংশ মাত্র ০.৩৫ শতাংশ। অর্থাৎ এই খাতে বাংলাদেশের অংশ বিশ্ববাজারের তুলনায় প্রায় ২১ গুণ কম। এটি পোশাক খাতের পণ্য বৈচিত্র্যের একটি বড় সীমাবদ্ধতার দিকও তুলে ধরে। পোশাক তৈরির পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট আনুষঙ্গিক পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানিতে বাংলাদেশ এখনো তুলনামূলকভাবে কম সক্রিয়।
বেসিক ও উচ্চমূল্যের পণ্যের মাঝামাঝি অবস্থানে রয়েছে শার্ট ও ব্লাউজ। এই ‘সেমি-বেসিক’ ক্যাটাগরির পণ্য বাংলাদেশের মোট পোশাক রপ্তানির ১০.৩৩ শতাংশ। বিশ্ববাজারে এর অংশ ৭.৩৮ শতাংশ। অর্থাৎ এই শ্রেণির পণ্যে বাংলাদেশ বিশ্ববাজারের তুলনায় কিছুটা বেশি নির্ভরশীল। তবে এই অংশটি বেসিক পণ্যের তুলনায় অনেক ছোট।
বিজিএমইএ’র সাবেক পরিচালক ও বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের (বিএভি) প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি দীর্ঘদিন ধরেই মূলত বেসিক পণ্যের ওপর নির্ভরশীল। টি-শার্ট, প্যান্ট, সোয়েটারসহ এসব পণ্যে আমাদের উৎপাদন সক্ষমতা ও অভিজ্ঞতা অনেক বেশি। কিন্তু বিশ্ববাজারের চাহিদা এখন দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। ফলে শুধু একই ধরনের পণ্যের পরিমাণ বাড়িয়ে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা কঠিন হবে। তিনি বলেন, বিশ্ববাজারে আউটারওয়্যার, স্পোর্টসওয়্যার, টেকনিক্যাল ওয়্যার, ড্রেস ও অন্যান্য উচ্চমূল্যের পণ্যের বড় বাজার রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের রপ্তানি ঝুড়িতে এসব পণ্যের অংশ এখনো তুলনামূলকভাবে কম। এর অর্থ হলো, আমাদের সামনে শুধু চ্যালেঞ্জ নয়, বড় একটি সুযোগও রয়েছে। বিশ্ববাজারে যে জায়গাটি আমরা এখনো দখল করতে পারিনি, সেটিই ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির অন্যতম ক্ষেত্র হতে পারে।
মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, এখন আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু বেশি পরিমাণ পোশাক রপ্তানি করা নয়, বরং বেশি মূল্য সংযোজন করা। এজন্য পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানোর পাশাপাশি সিনথেটিক ও নন-কটন পোশাক, টেকনিক্যাল টেক্সটাইল, স্পোর্টসওয়্যার ও অন্যান্য বিশেষায়িত পণ্যের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে হবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ যদি বেসিক পণ্যের পাশাপাশি উচ্চমূল্যের পোশাকের বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে পারে, তাহলে একই পরিমাণ পণ্য রপ্তানি করেও বেশি রপ্তানি আয় করা সম্ভব হবে। তাই এখন পোশাক খাতের কৌশল হওয়া উচিত ‘ভলিউম’ থেকে ‘ভ্যালু’-এর দিকে যাওয়া।
বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা দেখা যায় উন্নত বা উচ্চমূল্যের পোশাকের ক্ষেত্রে। আউটারওয়্যার, ড্রেস, টেকনিক্যাল ওয়্যার, স্পোর্টসওয়্যার ও স্যুট- এই পাঁচ ধরনের পণ্যকে উন্নত বা ‘অ্যাডভান্সড’ ক্যাটাগরিতে ধরা হয়েছে। এই পণ্যগুলোর সম্মিলিত অংশ বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিতে মাত্র ৯.৩৫ শতাংশ। অথচ বিশ্ব পোশাক বাণিজ্যে এসব পণ্যের অংশ ৩০.৪৬ শতাংশ। অর্থাৎ বিশ্ববাজারে উচ্চমূল্যের ও বৈচিত্র্যময় পোশাকের যে গুরুত্ব, বাংলাদেশের রপ্তানি ঝুড়িতে তার উপস্থিতি অনেক কম।
সবচেয়ে বড় ব্যবধান আউটারওয়্যারে। বিশ্ববাজারে মোট পোশাক রপ্তানির ১৩.৪৫ শতাংশ আসে আউটারওয়্যার থেকে। বাংলাদেশে এই হার মাত্র ৩.৮৩ শতাংশ। অর্থাৎ বিশ্বের সবচেয়ে বড় পোশাক ক্যাটাগরিগুলোর একটি বাংলাদেশে এখনো তুলনামূলক ছোট।
বাংলাদেশের মোট রপ্তানি ও বিভিন্ন এইচএস-৬ পণ্যের হিসাবের মধ্যে ৩.৩৮ শতাংশ বা প্রায় ১.৩১৩ বিলিয়ন ডলারের একটি অংশের পূর্ণ মিল পাওয়া যায়নি। বিএভি’র বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এটি ইপিবি’র ২-ডিজিট ও ৬-ডিজিট হিসাবের মধ্যকার একটি পরিচিত ব্যবধান। বিশ্ববাজারের ক্ষেত্রে এই ব্যবধান প্রায় ০.৫৯ শতাংশ, যা মূলত রাউন্ডিংয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত।
