২৪ ঘণ্টায় নাটকীয় মোড়, নেপথ্যে কূটনৈতিক বিবৃতি

২৪ ঘণ্টায় নাটকীয় মোড়, নেপথ্যে কূটনৈতিক বিবৃতি

ফন্ট সাইজ:

ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে একটি কূটনৈতিক বিবৃতি সব হিসাব-নিকাশ পাল্টে দিয়েছে। বরবাদ হয়ে গেছে একটি সুনির্দিষ্ট নকশা। যার উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশকে চাপে রেখে ফায়দা তোলা। কিন্তু হঠাৎ করেই পরিস্থিতি নাটকীয় মোড় নিয়েছে। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলন ঘিরে দু’দেশের সম্পর্কে তিক্ততার সৃষ্টি হয়েছিল। হিমশীতল হয়ে পড়েছিল সম্পর্ক। বিশেষ করে দিল্লির রাজনৈতিক কৌশল ঢাকাকে স্তম্ভিত এবং ক্ষুব্ধ করেছিল। যার পরিণতিতে ওই কূটনৈতিক বিবৃতি আসে। যে বিবৃতির ভাষা ছিল ভিন্ন, স্বাভাবিক কূটনীতির বাইরে। যদিও আলোচিত সে বিবৃতিতে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ইঙ্গিতও ছিল। শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলন নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে বাংলাদেশ তার প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিল। বলেছিল, একজন দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি কোনো অবস্থাতেই সরকারি মদতে সংবাদ সম্মেলন করতে পারেন না। জবাবে দিল্লির তরফে বলা হয়, এতে তাদের কোনো হাত নেই। দিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্ট ক্লাব আলাদা সত্তা নিয়ে কাজ করে থাকে। কিন্তু বাংলাদেশ আগাগোড়াই বলেছিল, আপত্তি সত্ত্বেও যদি এই সংবাদ সম্মেলন হয়, তাতে ভারতের কোনো সাংবাদিক প্রশ্ন করতে পারবেন না। বাংলাদেশ তো নয়ই। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল গোটা সংবাদ সম্মেলনই যেন ইন্ডিয়ান শো। অর্থাৎ ভারতীয় সাংবাদিকরাই সংবাদ সম্মেলনের মুখ্য ভূমিকায়। এমনকি বাংলাদেশি সাংবাদিকদেরকেও প্রশ্ন করার সুযোগ দেয়া হয়। হাসিনাপুত্র জয়ের অংশগ্রহণও ছিল সেখানে।

এই খবর ঢাকায় পৌঁছার পর বিদেশ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা সংবাদ সম্মেলনে দেয়া হাসিনার বক্তব্য পর্যালোচনা করেন। শীর্ষ কর্মকর্তারা এক অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে মিলিত হয়ে পরবর্তী কৌশল নির্ধারণ করেন। এই কৌশলের অংশ হিসেবে একটি তাৎক্ষণিক কূটনৈতিক বিবৃতি প্রচারের সিদ্ধান্ত হয়। এটি নিছক কূটনৈতিক বিবৃতি নয়। পুরোপুরি রাজনৈতিক বিবৃতি। যার মাধ্যমে ঢাকার অবস্থান পরিষ্কার করা হয়।

এতে বলা হয়, পলাতক দণ্ডপ্রাপ্ত গণহত্যাকারী শেখ হাসিনাকে নয়াদিল্লিতে সরাসরি গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার অনুমতি দেয়ায় বাংলাদেশ ক্ষুব্ধ হয়েছে। সেখানে তিনি এবং তার সহযোগীরা বাংলাদেশ রাষ্ট্র ও এর জনগণের বিরুদ্ধে বিষাক্ত ঘৃণা ছড়িয়েছেন।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, এমন একটি দিন বেছে নেয়া হয়েছে, যখন বাংলাদেশের জনগণ জুলাই বিপ্লবের দ্বিতীয় বার্ষিকী উদ্‌যাপন করছে, সে সময় ভারতীয় ভূখণ্ডে শেখ হাসিনার এই মতবিনিময় বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত। জুলাই বিপ্লবের শহীদদের প্রতি চরম অপমান। জুলাই বিপ্লবের চেতনায় উদ্বুদ্ধ বাংলাদেশের জনগণ দৃঢ়ভাবে অঙ্গীকার করেছে, দেশ আর কখনো ফ্যাসিবাদের অন্ধকার সময়ে ফিরে যাবে না। বাংলাদেশ কখনোই তাঁবেদার রাষ্ট্রে পরিণত হবে না। দণ্ডপ্রাপ্ত গণহত্যাকারী শেখ হাসিনা ও তার মাফিয়া চক্রের আর কখনো বাংলাদেশের রাজনীতিতে স্থান হবে না। বাংলাদেশ সার্বভৌম- সমতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা এবং জাতীয় মর্যাদার ভিত্তিতে ভারতের সঙ্গে গঠনমূলক ও ভবিষ্যতমুখী সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়। তবে পরিতাপের বিষয়, ২০১৩ সালের বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় দণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর জন্য বারবার অনুরোধ জানানো হলেও ভারত এখনো কোনো সাড়া দেয়নি। বরং তাকে প্রকাশ্যে গণমাধ্যমের সঙ্গে মতবিনিময়ের সুযোগ দেওয়া বাংলাদেশের জনগণের অনুভূতিতে আঘাত করেছে। এবং এটি দুই দেশের সমপ্রীতিপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের জন্যও ক্ষতিকর বলে উল্লেখ করা হয়।

এই বিবৃতি প্রচারের সঙ্গে সঙ্গেই দিল্লিতে কর্মকর্তারা নড়েচড়ে বসেন। বিদেশ মন্ত্রকের সঙ্গে রাজনৈতিক নেতাদের একাধিক বৈঠকের খবর পাওয়া যায়। এসব বৈঠকে আত্মসমালোচনাও করা হয়। এখানে বলে রাখা ভালো- বেশ কিছুকাল যাবত দিল্লির বিদেশ মন্ত্রণালয় বাংলাদেশ বিষয় সামলায় না। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সরাসরি দেখভাল করে। ভারতের নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল সমন্বয় করে থাকেন। বাংলাদেশের আপত্তির কথা তাকেও জানানো হয়েছিল। বলা হয়েছিল, সংবাদ সম্মেলন করতে দিলে তা উসকে দেয়া হবে, ক্ষতিগ্রস্ত হবে কূটনৈতিক সম্পর্কের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। বাংলাদেশের এই অভিপ্রায়ের প্রতি ভারত সম্মান দেখাবে- এমন প্রতিশ্রুতিও দেয়া হয়। যাইহোক, এসব ঘটনায় পরিস্থিতি অন্যদিকে মোড় নেয়। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নতুন বার্তা আসে ঢাকায়। একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, দিল্লির বিদেশ মন্ত্রকের একজন শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা একটি বিশেষ পত্র নিয়ে ঢাকা আসছেন খুব শিগগিরই। ওই বিশেষ পত্রে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়নের তাগিদ থাকবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দিল্লি সফরের আমন্ত্রণও থাকতে পারে। প্রধানমন্ত্রী অবশ্য ব্রিকস সম্মেলনে যাচ্ছেন না- এটা প্রায় নিশ্চিত। হাসিনার তৎপরতার সঙ্গে ঢাকার রাজনৈতিক উত্তাপের কোনো মিল আছে কিনা তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। একইদিনে কেন একটি মহল ভিন্ন কৌশলে রাজনৈতিক ছক তৈরি করেছিল। জুলাই বিপ্লবের অনুষ্ঠান বয়কট থেকে শুরু করে তাদের বক্তৃতার ভাষাও পর্যালোচনা করা হচ্ছে। বিদেশি কূটনীতিকরা নিরাপত্তায় বিঘ্ন ঘটতে পারে এমন আশঙ্কা থেকে অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করেন। যা ছিল বাংলাদেশের জন্য এক দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা।

ওদিকে আগামী ১০ই আগস্ট ঢাকায় অবস্থানরত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এক সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন। ঢাকায় আসার পর এটাই হবে তার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎ। বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই সাক্ষাতের বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে বলে ওয়াকিবহাল কূটনীতিকরা মনে করছেন। রাজনীতিক কাম কূটনীতিক দীনেশ ত্রিবেদী মন্ত্রী পদমর্যাদায় হাইকমিশনারের দায়িত্ব পালন করছেন।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন