ভ্রমণ ভিসায় বাংলাদেশে এসে নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে বিদেশি নাগরিকরা। কখনো বেশি বেতনের চাকরি, কখনো ঘরে বসে বাড়তি আয়ের লোভনীয় প্রতারণার ফাঁদ পেতে পকেট কাটছে সাধারণ মানুষের। আর এই প্রতারণার মাধ্যমে শত শত কোটি টাকা নিজ দেশে পাচার করছে চক্রটি। সম্প্রতি অবৈধ ভিওআইপি, জিএসএম গেটওয়ে ডিভাইসসহ রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা থেকে এমনই এক চক্রের সদস্য চার চীনা নাগরিককে আটক করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের সদস্যরা। তাদের কাছ থেকে দেশীয় বিভিন্ন অপারেটরের ৬ হাজারের বেশি অ্যাক্টিভ সিমকার্ড, ১৪টি ল্যাপটপ, ১৬টি স্মার্টফোন এবং ২০টি গেটওয়ে মেশিন জব্দ করা হয়েছে। তারা মূলত বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে সাধারণ মানুষের ফোনে লিংক সংযুক্ত খুদে বার্তা পাঠাতো। ওই লিংকে চাপ দিলেই মানুষ তাদের ফাঁদে পরে যেতো। এরপর বিভিন্ন উপায়ে টাকা নিয়ে নেয় চক্রটি।
এমন শত শত মানুষকে নিঃশ্ব করেছে তারা।
এর আগেও ১৪ই মে রাজধানীর উত্তরা ও তুরাগে কয়েকটি ফ্ল্যাটে অভিযান চালিয়ে ছয় চীনা নাগরিকসহ ৯ জনকে গ্রেপ্তার করে গোয়েন্দা পুলিশের সদস্যরা। তাদের কাছ থেকে ৬৪ পোর্টবিশিষ্ট তিনটি জিএসএম, জিপিআরএস সিম মডিউল (ভিওআইপি জিএসএম গেটওয়ে) মেশিন, ৮-পোর্টের একটি ও ২৫৬-পোর্টের একটি জিএসএম মডিউল মেশিন উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন অপারেটরের প্রায় ২৮০টি সিম কার্ড, একাধিক ল্যাপটপ, ২০টি স্মার্টফোন, নগদ প্রায় ৬ লাখ ৫ হাজার টাকা, বিদেশি নাগরিকদের পাসপোর্ট ও এনআইডি এবং একটি টয়োটা মাইক্রোবাস জব্দ করা হয়। তারা সকলেই সংঘবদ্ধভাবে অনলাইন জুয়া, প্রতারণা, অবৈধ ই-ট্রানজেকশন ও অর্থ পাচার চক্রের সঙ্গে জড়িত ছিল।
চক্রটি নিজেদের জুয়ার পোর্টাল পরিচালনার পাশাপাশি কোটি কোটি টাকা বিদেশে, বিশেষ করে চীনে পাচার করছিল। পরে রমনা থানায় সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশে করা মামলায় তাদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়। তাদের রিমান্ডও মঞ্জুর করে আদালত। ওই অভিযানে অংশ নেয়া ডিবি পুলিশের সদস্যরা বলেন, নিয়মিত সাইবার মনিটরিংয়ের সময় ফেসবুক, ইউটিউব, টেলিগ্রাম গ্রুপ এবং বিভিন্ন ভুয়া ওয়েবসাইটে অনলাইন জুয়ার বিজ্ঞাপন ও ডিপোজিট বোনাসের প্রলোভনের তথ্য পাওয়া যায়। এরপর একাধিক মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে অবৈধ লেনদেনের বিষয়ও শনাক্ত হয়। এসব ওয়েবসাইটে অল্প সময়ে দ্বিগুণ-তিনগুণ লাভের প্রলোভন দেখিয়ে সাধারণ মানুষকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলা হচ্ছিল। এরপরই আমরা অভিযান চালিয়ে তাদেরকে আটক করি।
গত ২৬শে এপ্রিলও বিকালে উত্তরা ৩নম্বর সেক্টরের ৪নং রোডের ৪৭ নম্বার বাড়ি একটি ফ্ল্যাট থেকে প্রায় শতাধিক চোরাই মোবাইল ও কম্পিউটার পণ্যসহ ওয়াং গুওফেং ও ঝাং হাইবিন নামে দুই চীনা নাগরিককে আটক করে পুলিশ। ১৩ই জানুয়ারি বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা এবং উত্তরা পশ্চিম থানা এলাকা থেকে পাঁচ চীনা নাগরিকসহ একটি অনলাইন প্রতারক চক্রের ৮ সদস্যকে আটক করে ডিবি সাইবার ইউনিটের সদস্যরা। তাদের কাছ থেকেও ১১টি অবৈধ ভিওআইপি গেটওয়ে ডিভাইস, ৫১ হাজার ২৫১টি সিম কার্ড, ৫১টি মোবাইল ফোন, দু’টি সিপিইউ ও ৬টি ল্যাপটপ জব্দ করা হয়। ওই অভিযানের নেতৃত্বে থাকা ডিসি (সাইবার উত্তর) হাসান মোহাম্মদ নাসের রিকাবদার বলেন, ওই চক্রটিও টেলিগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ এবং অন্যান্য সোশ্যাল মিডিয়া গ্রুপ ব্যবহার করে ভুয়া চাকরির বিজ্ঞাপন, লাভজনক বিনিয়োগ, কম দামের পণ্য এবং ঘরে বসে কাজ বিজ্ঞাপন দিয়ে লোকদের প্রলুব্ধ করতো।
ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে হাতিয়ে নেয়া অর্থ পরে ক্রিপ্টোকারেন্সিতে রূপান্তরিত করা হতো এবং ভিওআইপি গেটওয়ে মেশিনের মাধ্যমে বিদেশে স্থানান্তর করতো।
এসব বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (গোয়েন্দা) মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, চীনা নাগরিকরা মূলত ভ্রমণ ভিসায় বাংলাদেশে এসে বিভিন্ন চাইনিজ প্রতিষ্ঠানের আড়ালে এসব অপকর্ম পরিচালনা করছে। অনলাইন প্রতারণার দায়ে গত ১লা আগস্ট রাতেও আমরা বসুন্ধরা এলাকা থেকে ঝর্ণা চাকমা জিয়ানা (২৭), লিউ হুই জাং (৪৬), ওয়ে ইউজি (৩০) ও শে ই রান (৪২) নামে চারজনকে আটক করেছি। তারা সকলে একই ভবনে ভাড়া থাকতো। মূলত ঝর্ণা নামের এক উপজাতি নারী ওই পুরো ছয়তলা ভবনটি ভাড়া নিয়ে নিজে ভবনের একতলায় থাকতেন এবং বাকি পাঁচটি ফ্লোর চাইনিজদের কাছে ভাড়া দেন, যেখানে তারা হোটেলের মতো যাতায়াত ও অবস্থান করতো। চাইনিজ নাগরিকরা সেখানে অবস্থান করে উন্নত প্রযুক্তি ও ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার করে অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসা এবং অনলাইন জুয়ার সাম্রাজ্য পরিচালনা করে আসছিল। চক্রটি অনলাইন জুয়া ও প্রতারণার মাধ্যমে মাসে প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ কোটি টাকা পাচার করতো। ডিবি প্রধান বলেন, তাদের এই কাজের অন্যতম হাতিয়ার হচ্ছে আমাদের দেশীয় সিম। তাদের কাছ থেকে ৬ হাজার সিমকার্ড পাওয়া গেছে। সবগুলো সচল।
আর এই সব সিম তাদের আমাদের দেশীয় বিভিন্ন এজেন্ট সরবরাহ করেছে। যার বেশির ভাগই প্রতারণার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে রেজিস্ট্রেশন করে নেয়া। যেমন- অনেক সময় সিম কিনতে গিয়ে ফিঙ্গার দেয়ার পরে দোকানি বলে আপনার ফিঙ্গার হয়নি, আবর দেন। তারাই মূলত এমন মিথ্যা কথা বলে সুকৌশলে সিমগুলো রেজিস্ট্রেশন করে নিয়ে পরে এদের কাছে বেশি দামে সরবরাহ করতো। তাই সিম রেজিস্ট্রেশনের সময় সকলকে সচেতন হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন এই পুলিশ কর্মকর্তা। একইসঙ্গে অনলাইন জুয়া ও মোবাইলে আসা বিভিন্ন লিংকের প্রলোভনে পা না দেয়ার আহ্বান জানান তিনি।
