যুব আন্দোলন মোদিকে ‘ভয়াবহভাবে দুর্বল’ করেছে, রাজনীতিতে আসবেন না

ওয়াংচুক বলেন

যুব আন্দোলন মোদিকে ‘ভয়াবহভাবে দুর্বল’ করেছে, রাজনীতিতে আসবেন না

ফন্ট সাইজ:

ভারতের সাম্প্রতিক যুব-নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে ‘ভয়াবহভাবে দুর্বল’ করে দিয়েছে। এমন মন্তব্য করেছেন বিশিষ্ট আন্দোলনকর্মী সোনম ওয়াংচুক। তার অনশন এই আন্দোলনকে দেশজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে। বিবিসিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ওয়াংচুক বলেন, ২৫শে জুলাই শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দিকে নিয়ে যাওয়া গণবিক্ষোভের পর দেশের সামগ্রিক পরিবেশ বদলে গেছে।

৫৯ বছর বয়সী এই আন্দোলনকর্মীর ভাষায়, তরুণরা এখন অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী। তারা বিশ্বাস করছে, চাইলে তারা পরিবর্তন আনতে পারে এবং আর সবকিছু নীরবে মেনে নিতে হবে না। ককরোচ আন্দোলন ২০১৪ সাল থেকে ক্ষমতায় থাকা মোদি সরকারের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বৃহৎ গণবিক্ষোভে পরিণত হয়। আন্দোলনের নামটি এসেছে ভারতের প্রধান বিচারপতির একটি বিতর্কিত মন্তব্য থেকে। আদালতে এক শুনানিতে তিনি বেকার তরুণদের একটি অংশকে ‘তেলাপোকা’র (ককরোচ) সঙ্গে তুলনা করেন, যা ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়।

ওয়াংচুক দিল্লির তীব্র গরমে জুন ও জুলাই মাসে টানা ২৬ দিন অনশন করেন। এ সময় তিনি শুধু লবণ ও পানি গ্রহণ করেন। তিনি জানান, অনশনের সময় তার ওজন ১১ কেজি কমে গিয়েছিল। এর মধ্যে এ পর্যন্ত ৬ কেজি ফিরে পেয়েছেন। তিনি অভিযোগ করেন, অনশনের শেষ ছয় দিনে তাকে জোর করে হাসপাতালে নেয়া হয়। যা তার কাছে ‘হাসপাতালের চেয়ে কারাগারের মতো’ মনে হয়েছে। ততদিনে প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে জনরোষ ভারতের সাম্প্রতিক বছরের অন্যতম বড় সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়।

ওয়াংচুক অনশন ভাঙার পরদিনই শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেন। এরপর মোদি সরকার প্রশ্নপত্র ফাঁসের মামলাগুলোর দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে ফাস্ট-ট্র্যাক আদালত গঠনের ঘোষণা দেয় এবং পরীক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারের দায়িত্ব একজন প্রযুক্তি খাতের বিলিয়নিয়ার উদ্যোক্তার হাতে তুলে দেয়।
সরকার আরও জানায়, প্রশ্নপত্র ফাঁসের কারণে আত্মহত্যা করা শিক্ষার্থীদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেয়া হবে। তবে ওয়াংচুকের মতে, ভারতের সমস্যা অনেক গভীরে। তিনি বলেন, ২৫ বছর ধরে দেশটিতে স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের বেকারত্বের হার প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশের মধ্যে রয়েছে। প্রকৌশলী ও শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ওয়াংচুকের মতে, বর্তমান পরীক্ষা ব্যবস্থা চাকরির বাজারের বাস্তব চাহিদার সঙ্গে প্রায় অসংগত। তার ভাষায়, অধিকাংশ পরীক্ষা বহু নির্বাচনী প্রশ্নের ওপর নির্ভরশীল এবং লাখো শিক্ষার্থীর মূল্যায়ন সহজ করার জন্য তৈরি।

কিন্তু এগুলো শিক্ষার্থীর প্রকৃত দক্ষতা ও বোঝাপড়া কতটা যাচাই করছে, সে বিষয়টি গুরুত্ব পায় না। ফলে স্কুলগুলোর শিক্ষাদান পদ্ধতিও একইভাবে গড়ে উঠছে। তিনি মনে করেন, পরীক্ষায় যদি ব্যবহারিক দক্ষতা ও যোগ্যতার ওপর বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়, তাহলে বিদ্যালয়গুলোও তাদের শিক্ষাপদ্ধতি পরিবর্তন করবে এবং এতে ভারতের কর্মসংস্থান সংকট মোকাবিলায় সহায়তা মিলবে।

ওয়াংচুক বলেন, ১৫ বছর পর বিশ্ব এবং দেশের পরিস্থিতি কী হতে পারে, তা মাথায় রেখে এখন থেকেই পরিকল্পনা করতে হবে। তার মতে, শিশুদের শেখানোর পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনলে তারা ভবিষ্যতে বেকার হয়ে পড়বে না এবং যেসব খাতে জনবল প্রয়োজন, সেগুলোও জনবল সংকটে ভুগবে না। অবশ্য ভারতের সরকার বরাবরই অর্থনীতি পরিচালনা নিয়ে সমালোচনা প্রত্যাখ্যান করেছে। সরকারের দাবি, বেকারত্ব সংকট নিয়ে যে অভিযোগ করা হচ্ছে তা অতিরঞ্জিত এবং তাদের সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি এখনো শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে।

এদিকে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ককরোচ জনতা পার্টি আন্দোলনের অনেক কর্মী এখনো আদালতের মামলা, পুলিশি হয়রানি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচারের শিকার হচ্ছেন। এটি ঘটছে, যদিও ভারতের সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দিয়েছে যে যেসব আন্দোলনকারীর বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে কিন্তু পূর্বে কোনো অপরাধের রেকর্ড নেই, তাদের বিরুদ্ধে যেন জোরপূর্বক ব্যবস্থা না নেয়া হয়। তবুও ওয়াংচুকের দাবি, গত কয়েক দিনে ভালো অগ্রগতি হয়েছে।
ওয়াংচুকের বিশ্বাস, ভারতে এখন পরিবর্তনের হাওয়া বইছে। তার মতে, শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগে বিলম্ব হওয়ায় সরকারের বড় ধরনের রাজনৈতিক ক্ষতি হয়েছে।

তিনি বলেন, এতে তরুণরা নিজেদের শক্তি ও ঐক্যের ওপর আরও বেশি আস্থা অর্জনের সুযোগ পেয়েছে। ওয়াংচুক সতর্ক করে বলেন, সরকার যদি জনগণের কথা না শোনে, তাহলে আন্দোলন আবারও শুরু হতে পারে এবং তা শুধু শিক্ষা সংস্কারের দাবিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না। তিনি দাবি করেন, এর প্রভাব ইতিমধ্যেই ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) অনুভব করছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, চলতি সপ্তাহে অনুষ্ঠিত তিনটি উপনির্বাচনের মধ্যে দুটি আসনে বিজেপির পরাজয়ের কথা। এর মধ্যে বিহারের একটি আসনও রয়েছে, যা দলটি ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে রেখেছিল। তবে তিনি এখনো মনে করেন, ভারতের নেতৃত্ব চাইলে নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করতে পারে।

তার ভাষায়, আমি সবসময় বিশ্বাস করি মানুষ নিজের ভুল বুঝতে পারে এবং তা সংশোধন করতে পারে। তাই আমি তাদের সেই সুযোগ দিতে চাই। অনশন ভাঙার ১২ দিন পর ওয়াংচুক এখন নিজের শহর লাদাখের লেহ’তে ফিরে গেছেন। তিনি জানান, অহিংস প্রতিরোধের দর্শনের প্রবক্তা মহাত্মা গান্ধীর অনুপ্রেরণায় অনশনের শক্তির প্রতি তার বিশ্বাস আরও দৃঢ় হয়েছে। এর আগেও তিনি লাদাখের জন্য অধিক স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে এবং পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল এলাকায় সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পের বিরুদ্ধেও অনশন করেন। যদিও সে সময় তিনি লক্ষ্য অর্জন করতে পারেননি, তবুও তার বিশ্বাস, ‘আমরা যখন নিজেরাই কষ্ট সহ্য করি, তখন সরকার সেটিকে লাঠি বা পাথর ব্যবহার করার চেয়ে ভিন্নভাবে উপলব্ধি করে।’

ভবিষ্যতে নির্বাচনে অংশ নেয়ার কোনো পরিকল্পনা আছে কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে ওয়াংচুক বলেন, না। তিনি নিজে নির্বাচনে দাঁড়ানোর চেয়ে অন্যদের নেতৃত্বে আসতে সহায়তা করতেই বেশি আগ্রহী।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন