পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় এলেও পূর্ববর্তী সরকারের আমলের কাটমানি তথা চাঁদাবাজির সংস্কৃতি দ্রুত বিজেপির মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। দলের কাছে গত কয়েক সপ্তাহে কয়েক শত অভিযোগ আসার পর বিজেপি নেতৃত্ব বিড়ম্বনায় পড়েছে। দলীয় সূত্র অনুযায়ী, রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত, বিশেষ করে কলকাতা ও সংলগ্ন জেলাগুলো থেকে অভিযোগ এসেছে। অভিযোগের মধ্যে রয়েছে চাঁদাবাজি, জোরপূর্বক তৃণমূল কংগ্রেসের অফিস দখলের চেষ্টা, বিরোধী দলের কর্মীদের সঙ্গে কথিত যোগাযোগ রাখা এবং দলের স্বার্থবিরোধী অন্যান্য কার্যকলাপ। স্বার্থের সঙ্ঘাতে অনেক জায়গায় গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব ও মাথাচাড়া দিয়েছে। এসবই দলীয় নেতৃত্বের কাছে চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। তবে দলীয় নেতৃত্ব কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছেন বলে জানা গিয়েছে।
সূত্রের খবর, রাজ্যের ক্ষমতাসীন বিজেপি চাঁদাবাজি ও শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে ২২ জন দলীয় পদাধিকারীকে (যার মধ্যে বেশ কয়েকজন মণ্ডল সভাপতিও রয়েছেন) সাসপেন্ড বা সাময়িক বরখাস্ত করেছে। দলীয় নেতাদের মতে, রাজ্যে ক্ষমতায় আসার পর এটিই দলের নেয়া সবচেয়ে কঠোর সাংগঠনিক পদক্ষেপ। দলের রাজ্য নেতৃত্ব প্রকাশ্যে কর্মীদের ‘চাঁদাবাজির সংস্কৃতি’ থেকে বিরত থাকার বিষয়ে সতর্ক করার কয়েক সপ্তাহ পরেই এই শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নেয়া হলো। তারা স্পষ্ট জানিয়েছিল যে, বিজেপি সরকারের আমলে এ ধরনের কার্যকলাপ বরদাস্ত করা হবে না। দলীয় সূত্র জানিয়েছে, সাসপেন্ড হওয়া নেতারা বিভিন্ন সাংগঠনিক স্তরের এবং তাদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, জোরপূর্বক তৃণমূল কংগ্রেসের (টিএমসি) অফিস দখলের চেষ্টা, বিরোধী দলের কর্মীদের সঙ্গে কথিত যোগাযোগ রাখা এবং দলের স্বার্থবিরোধী অন্যান্য কার্যকলাপের অভিযোগ রয়েছে।
তিন মাস ধরে রাজ্য শাখার নেয়া ব্যাপক শাস্তিমূলক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই এই পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। দলীয় সূত্র অনুযায়ী, রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তÑ বিশেষ করে কলকাতা ও সংলগ্ন জেলাগুলো থেকে অভিযোগ ওঠার পর ২৫০ জনেরও বেশি নেতা ও কর্মীকে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শো-কজ) পাঠানো হয়েছিল। বিজেপি সূত্র জানিয়েছে, প্রায় ৮০ জন পদাধিকারীর ব্যাখ্যা সন্তোষজনক হওয়ায় তাদের অব্যাহতি দেয়া হলেও, অনেকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জবাব দিতে ব্যর্থ হন অথবা এমন জবাব দেন যা দলের শৃঙ্খলা রক্ষা কমিটির কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি; যার ফলে ২২ জন সদস্যকে সাসপেন্ড করা হয়। এই কঠোর পদক্ষেপ রাজ্য নেতৃত্বের বারবার দেয়া সতর্কবার্তাকে বাস্তবে রূপ দিল। এর মাধ্যমে বিজেপির সাংগঠনিক আচরণ এবং তৃণমূল কংগ্রেসের আচরণের মধ্যে একটি স্পষ্ট পার্থক্য তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। কারণ তৃণমূলের স্থানীয় নেতাদের বিরুদ্ধেও চাঁদাবাজিতে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। রাজ্য বিজেপি সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য সম্প্রতি দলীয় কর্মীদের সতর্ক করে বলেছিলেন যে, পূর্ববর্তী সরকারের আমল থেকে পাওয়া ‘সংস্কৃতি’ ত্যাগ না করলে ‘পরিস্থিতি বা হাওয়া বদলে যেতে পারে’।
তিনি তাদের আচরণ সংশোধনের জন্য ১৫ দিনের সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিলেন এবং পরিণতির বিষয়েও হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন। দিলীপ ঘোষ, অর্জুন সিং এবং অগ্নিমিত্রা পালের মতো নেতারাও বারবার জোর দিয়ে বলেছেন যে, চাঁদাবাজির অভিযোগে অভিযুক্ত কাউকে দল আড়াল করবে না। দলের অভ্যন্তরীণ সূত্র জানিয়েছে যে, কেন্দ্রীয় নেতৃত চাঁদাবাজির অভিযোগ ও সাংগঠনিক শৃঙ্খলার বিষয়টি নজরে রেখেছে। পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসার পর বিজেপি যে প্রাথমিক প্রশাসনিক ও সাংগঠনিক চ্যালেঞ্জগুলোর মুখোমুখি হয়েছিল। তার মধ্যে এগুলোর মোকাবিলা করাই এই পদক্ষেপের লক্ষ্য। নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই বিভিন্ন জেলায় দলের স্থানীয় কর্মীদের বিরুদ্ধে তোলাবাজির অভিযোগ উঠতে শুরু করে।
এর ফলে দলের নেতৃত্বকে প্রকাশ্যে বিষয়টি স্বীকার করতে হয় এবং প্রয়োজনীয় সংশোধনের প্রতিশ্রুতি দিতে হয়। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই বরখাস্তের ঘটনা কেবল মুষ্টিমেয় কর্মীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবেই দেখা উচিত নয়; বরং এর মাধ্যমে দলের কাছে একটি বৃহত্তর বার্তা পৌঁছে দেয়া হচ্ছে যে, এ ধরনের অভিযোগ চলতে থাকলে তার যে রাজনৈতিক মাশুল গুনতে হতে পারে, সে বিষয়ে দল সচেতন।
