পরিবর্তিত বিশ্বে বাংলাদেশের সফট পাওয়ার পুনর্বিবেচনা: একটি কৌশলগত অপরিহার্যতা

পরিবর্তিত বিশ্বে বাংলাদেশের সফট পাওয়ার পুনর্বিবেচনা: একটি কৌশলগত অপরিহার্যতা

ফন্ট সাইজ:

২০২২ সালে আর্জেন্টিনা যখন ফিফা বিশ্বকাপ জয় করে, তখন বাংলাদেশের লাখো মানুষ সেই বিজয় উদযাপন করেছিল। আর্জেন্টিনার প্রতি বাংলাদেশের মানুষের সমর্থনের মাত্রা অনেককে বিস্মিত করে এবং আন্তর্জাতিক মনোযোগ আকর্ষণ করে। দীর্ঘদিনের ফুটবলপ্রেম হঠাৎ করেই একটি কূটনৈতিক সুযোগে পরিণত হয়। এর কিছুদিন পরই আর্জেন্টিনা ৪০ বছরেরও বেশি সময় পর ঢাকায় তাদের দূতাবাস পুনরায় চালু করে। এরপর থেকে দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং সহযোগিতার ক্ষেত্রও সম্প্রসারিত হয়েছে। এই পরিবর্তন কোনো পরিকল্পিত সরকারি প্রচেষ্টার কূটনৈতিক (পাবলিক ডিপ্লোমেসি) প্রচারণার ফল ছিল না। বরং এটি দুই দেশের জনগণের মধ্যে গড়ে ওঠা গভীর সম্পর্ক থেকে স্বাভাবিকভাবেই বিকশিত হয়েছে। এটি প্রমাণ করেছে যে, অভিন্ন সংস্কৃতি এবং জনগণের সঙ্গে জনগণের সম্পর্কও কূটনৈতিক সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করতে পারে। সফট পাওয়ার ধারণাটি প্রথম উপস্থাপন করেন রাজনৈতিক বিজ্ঞানী জোসেফ নাই। তিনি সফট পাওয়ারকে এমন একটি দেশের সক্ষমতা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন, যার মাধ্যমে বলপ্রয়োগের বদলে আকর্ষণের মাধ্যমে অন্যদের প্রভাবিত করা যায়।

সামরিক শক্তি বা অর্থনৈতিক চাপের ওপর নির্ভর করার পরিবর্তে সফট পাওয়ারের উৎস হলো একটি দেশের সংস্কৃতি, মূল্যবোধ এবং কূটনীতি। বড় শক্তিধর দেশগুলোর ক্ষেত্রে সফট পাওয়ার সাধারণত তাদের সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তির পরিপূরক হিসেবে কাজ করে। এটি তাদের প্রভাবকে অন্যদের কাছে আরও গ্রহণযোগ্য করে তোলে। কিন্তু বাংলাদেশের মতো দেশের বাস্তবতা ভিন্ন। সীমিত সামরিক ও অর্থনৈতিক সক্ষমতার কারণে বাংলাদেশ শুধু হার্ড পাওয়ারের ওপর নির্ভর করতে পারে না। বরং সফট পাওয়ারের মাধ্যমে বৈশ্বিক পরিসরে নিজের প্রভাব বাড়ানোর সুযোগ বেশি। এর অর্থ হলো, ধারাবাহিক উন্নয়ন, কার্যকর জাতীয় ব্র্যান্ডিং এবং প্রযুক্তি, উদ্ভাবন ও যোগাযোগে আরও বেশি বিনিয়োগের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি গড়ে তোলা। সীমিত হার্ড পাওয়ারসম্পন্ন দেশের জন্য এটি কেবল একটি বিকল্প নয়। বরং জাতীয় স্বার্থ রক্ষা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও শক্তিশালী অবস্থান গড়ে তোলার অন্যতম কার্যকর ও ব্যয়-সাশ্রয়ী উপায় হতে পারে সফট পাওয়ার।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সফট পাওয়ারের গুরুত্ব শুধু মর্যাদা অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি দেশের কূটনৈতিক পরিসর সম্প্রসারণের সম্ভাবনা তৈরি করে। উন্নয়নের সাফল্য, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে অবদান, জলবায়ু নেতৃত্ব, সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং সক্রিয় প্রবাসী জনগোষ্ঠী ইতিমধ্যেই বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিকভাবে আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
এখন চ্যালেঞ্জ হলো- এ পর্যন্ত বিচ্ছিন্নভাবে থাকা এই শক্তিগুলোকে একত্রিত করে একটি সুসংহত ও কার্যকর প্রভাবের উৎসে পরিণত করা। বাংলাদেশ এবং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা উভয়ই যখন গভীর পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন এই কাজটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশ্ব রাজনীতির দ্রুত পরিবর্তন এবং প্রভাব বিস্তারের ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতার এই সময়ে একটি দেশের সংস্কৃতি, মূল্যবোধ এবং জনগণের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক তার অর্থনৈতিক বা সামরিক শক্তির মতোই গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। সুতরাং, বাংলাদেশের জন্য সফট পাওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত হাতিয়ার, যা জাতীয় স্বার্থ রক্ষা, নতুন কূটনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি এবং বিশ্বে দেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে সহায়তা করতে পারে।

পরিবর্তিত বিশ্ব: কেন সফট পাওয়ার এখন আগের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ
বাংলাদেশের সফট পাওয়ারকে নতুনভাবে মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তার পেছনে দুটি বড় কারণ রয়েছে- বিশ্বব্যবস্থার পরিবর্তন এবং দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তন। বাংলাদেশ তার ইতিহাসের অন্যতম বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান বিশ্ববাসীর চোখে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে নতুনভাবে তুলে ধরেছে। বিক্ষোভ দমনে সহিংসতা, বেসামরিক মানুষের মৃত্যুর খবর, ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয়া এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক মনোযোগ আকর্ষণ করে। জাতিসংঘ, কয়েকটি পশ্চিমা সরকার এবং বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে। ফলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বাংলাদেশের উন্নয়নের সাফল্যের চেয়ে সহিংসতা, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং মানবাধিকার পরিস্থিতিই বেশি গুরুত্ব পায়। এতে সুশাসন, গণতন্ত্র এবং আইনের শাসন নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়। যদিও পরবর্তী রাজনৈতিক রূপান্তর অনেক আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকের মধ্যে ইতিবাচক পরিবর্তনের আশা জাগিয়েছিল, তবুও এটি দেখিয়ে দিয়েছে যে আজকের ডিজিটাল ও পারস্পরিকভাবে সংযুক্ত বিশ্বে একটি দেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি কত দ্রুত বদলে যেতে পারে।

২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্টে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা গণআন্দোলনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের টানা ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটে। এরপর একটি অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে এবং ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনের পর নতুন একটি নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসে। এই রাজনৈতিক পরিবর্তনের পাশাপাশি বাংলাদেশ তার পররাষ্ট্রনীতিতেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ সমন্বয় এনেছে। এখন দেশটি একদিকে বৃহৎ শক্তিগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখছে, অন্যদিকে আরও বিস্তৃত পরিসরের দেশের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়েও বিশ্বব্যবস্থা দ্রুত পরিবর্তিত হয়ে আরও প্রতিযোগিতামূলক ও বহুমেরুকেন্দ্রিক রূপ নিচ্ছে। বৃহৎ শক্তিগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। এই প্রতিযোগিতা বাংলাদেশের জন্য কোনো দূরবর্তী বা তাত্ত্বিক বিষয় নয়; বরং এটি সরাসরি বাংলাদেশের ওপর প্রভাব ফেলছে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ ক্রমবর্ধমান আঞ্চলিক প্রতিযোগিতার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছে। স্বাধীনতার পর থেকেই দেশটিকে বৃহৎ শক্তিগুলোর স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে এগোতে হয়েছে।

দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে, বঙ্গোপসাগরের উত্তর প্রান্তে বাংলাদেশের অবস্থান দেশটিকে সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত গুরুত্ব দিয়েছে। এ কারণেই বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার অংশ হয়ে আছে। জাতীয় স্বার্থ রক্ষার জন্য বাংলাদেশ ঐতিহ্যগতভাবে বিভিন্ন অংশীদারের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে এসেছে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা মোকাবিলা করা বাংলাদেশের জন্য নতুন কোনো চ্যালেঞ্জ নয়। তবে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর যে বিষয়টি বদলেছে, তা হলো- এই ভারসাম্য রক্ষার সামগ্রিক পরিবেশ। সরকার পরিবর্তনের ফলে অনেক বিদেশি অংশীদার বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক নতুনভাবে মূল্যায়ন করতে শুরু করে। এর ফলে যেমন নতুন কূটনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, তেমনি নতুন ধরনের অনিশ্চয়তাও তৈরি হয়েছে।

ভারত এখনো বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার, বিশেষ করে নিরাপত্তা, বাণিজ্য এবং আঞ্চলিক সংযোগের ক্ষেত্রে। তবে ঢাকার রাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণে দুই দেশকেই তাদের সম্পর্কের কিছু দিক নতুনভাবে সামঞ্জস্য করতে হয়েছে। অন্যদিকে চীন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার এবং অবকাঠামো ও প্রতিরক্ষা খাতে গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বন্দর ও সংযোগ প্রকল্পের মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরে নিজেদের উপস্থিতি আরও সম্প্রসারণেও চীনের আগ্রহ রয়েছে। তবে ভারত এসব উদ্যোগকে এই অঞ্চলে, বিশেষ করে বঙ্গোপসাগরে, চীনের প্রভাব বিস্তারের বৃহত্তর কৌশলের অংশ হিসেবে দেখে। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রও বাংলাদেশের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা আরও জোরদার করেছে। ফলে ভারত, চীন এবং যুক্তরাষ্ট্র- এই তিন প্রধান শক্তির কাছে বাংলাদেশের কৌশলগত গুরুত্ব আগের তুলনায় আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

এ অবস্থায় বাংলাদেশের প্রকৃত চ্যালেঞ্জ হলো- জাতীয় স্বার্থ রক্ষা এবং কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন অক্ষুণ্ন রেখে কীভাবে এই বৃহৎ শক্তিগুলোর সঙ্গে পরিবর্তিত সম্পর্ক দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করা যায়। এই প্রেক্ষাপটে একটি সুস্পষ্ট, কার্যকর এবং দীর্ঘমেয়াদি সফট পাওয়ার কৌশল গড়ে তোলা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এসব পরিবর্তন এমন এক সময়ে ঘটছে, যখন বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিবেশ দিন দিন আরও অনিশ্চিত, জটিল এবং প্রতিযোগিতাপূর্ণ হয়ে উঠছে। বাংলাদেশকে একদিকে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তিগুলোর মধ্যে ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতা সামাল দিতে হচ্ছে, অন্যদিকে আরও বিস্তৃত পরিসরের দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করতে হচ্ছে। তবে এটি সফলভাবে করতে শুধু কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা যথেষ্ট নয়। বাংলাদেশের প্রয়োজন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশ্বাসযোগ্যতা, আস্থা এবং একটি ইতিবাচক ভাবমূর্তি। আর এখানেই সফট পাওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সম্পদ হিসেবে আবির্ভূত হয়।

বাংলাদেশের বিদ্যমান সফট পাওয়ারের সম্পদ
বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক প্রভাবের অন্যতম শক্তিশালী উৎস হলো জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে তার অবদান। ১৯৮৮ সালে প্রথম জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে যোগ দেয়ার পর থেকে বাংলাদেশ ৪০টিরও বেশি দেশে পরিচালিত ৬০টিরও বেশি মিশনে ২ লাখ ৬০ হাজারের বেশি সামরিক ও পুলিশ সদস্য পাঠিয়েছে। বছরের পর বছর ধরে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শান্তিরক্ষী সেনা প্রেরণকারী দেশ হিসেবে অবস্থান ধরে রেখেছে। আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় অবদান রাখার পাশাপাশি এসব মিশন বাংলাদেশের জন্য পেশাদারিত্ব, শৃঙ্খলা এবং মানবিক সেবার একটি শক্তিশালী আন্তর্জাতিক সুনাম তৈরি করেছে। এ ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন ছিল বিশ্বের প্রথম সর্ব-মহিলা ও সম্পূর্ণ মুসলিম ফর্মড পুলিশ ইউনিট হাইতিতে মোতায়েন করা। এই পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে আরও উজ্জ্বল করেছে। সীমিত সামরিক ও অর্থনৈতিক সক্ষমতাসম্পন্ন একটি দেশের জন্য শান্তিরক্ষা কার্যক্রম আজ বাংলাদেশের সবচেয়ে মূল্যবান সফট পাওয়ারের উৎসগুলোর একটি।

উন্নয়নের সাফল্য
বাংলাদেশের উন্নয়নের যাত্রাও এখন তার সফট পাওয়ারের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। একসময় বিশ্বের দরিদ্রতম দেশগুলোর একটি হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের সফল উদাহরণ হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করেছে। ধারাবাহিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, দারিদ্র্য হ্রাস, স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় উন্নতি এবং সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি) অর্জনে অগ্রগতি- সব মিলিয়ে দেশের আন্তর্জাতিক সুনাম আরও শক্তিশালী হয়েছে। এই পরিবর্তনের পেছনে তৈরি পোশাক (আরএমজি) শিল্পের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে বাংলাদেশ বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ শুধু উৎপাদন সক্ষমতার প্রতীক নয়; এটি স্থিতিস্থাপকতা, পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতা এবং শ্রম ও পরিবেশগত মান উন্নয়নের প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।

সংস্কৃতি ও পর্যটনের সম্ভাবনা
বাংলাদেশের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং ক্রমবর্ধমান পর্যটন সম্ভাবনাও দেশের সফট পাওয়ারের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিচয় ফুটে ওঠে তার ভাষা, সাহিত্য, সংগীত, উৎসব, ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্প এবং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের জন্মভূমি হিসেবে স্বীকৃতির মাধ্যমে। একই সঙ্গে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন, বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার এবং অসংখ্য ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন পর্যটনের মাধ্যমে বাংলাদেশের ইতিবাচক আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি গড়ে তোলার বড় সুযোগ তৈরি করেছে।

প্রবাসী বাংলাদেশি
বাংলাদেশের বৈশ্বিক প্রবাসী সম্প্রদায়ও সফট পাওয়ারের আরেকটি মূল্যবান উৎস। মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা এবং এশিয়ার বিভিন্ন দেশে লাখো বাংলাদেশি বসবাস ও কাজ করছেন। তারা বাংলাদেশের সংস্কৃতি পরিচিত করে তুলছেন, ব্যবসা ও শিক্ষা ক্ষেত্রে সংযোগ তৈরি করছেন, বিশ্বের কাছে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি গঠনে ভূমিকা রাখছেন এবং স্বাগতিক দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করছেন।

আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী
বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরাও দেশের সফট পাওয়ার বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে হাজার হাজার বাংলাদেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন। তারা বাংলাদেশ ও স্বাগতিক দেশের মধ্যে সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করছেন। শিক্ষাগত সাফল্য, গবেষণায় সহযোগিতা, সাংস্কৃতিক বিনিময় এবং পেশাগত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে তারা বাংলাদেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি গড়ে তুলছেন এবং দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষা ও জনগণের মধ্যে সম্পর্ক আরও দৃঢ় করছেন। ভবিষ্যতের পেশাজীবী, গবেষক ও নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তি হিসেবে এই শিক্ষার্থীরা বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক প্রভাব ও বৈশ্বিক সম্পৃক্ততা সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।

খেলাধুলা ও জনপ্রিয় সংস্কৃতি
খেলাধুলাও এখন বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক আকর্ষণের একটি ক্রমবর্ধমান গুরুত্বপূর্ণ উৎস হয়ে উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরেই ক্রিকেট বাংলাদেশের বৈশ্বিক ক্রীড়া পরিচয়ের প্রধান ভিত্তি। অন্যদিকে ২০২২ সালের ফিফা বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার প্রতি বাংলাদেশের মানুষের অভূতপূর্ব সমর্থন দেখিয়ে দিয়েছে, কীভাবে জনপ্রিয় সংস্কৃতি অপ্রত্যাশিতভাবে কূটনৈতিক সদিচ্ছা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক জোরদারের একটি কার্যকর মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে। বাংলাদেশের এই সম্পদগুলো সম্মিলিতভাবে দেশের সফট পাওয়ার গড়ে তোলার জন্য একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করেছে। তবে এগুলোকে একটি সুস্পষ্ট জাতীয় কৌশলের অংশ হিসেবে উপস্থাপন না করে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বিচ্ছিন্নভাবে প্রচার করা হয়েছে। ফলে সম্মিলিতভাবে এগুলোর প্রভাব সীমিতই থেকে গেছে। বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক প্রভাব বিস্তারের বহু উৎস থাকলেও সেগুলোকে এখনো একটি সুসংহত সফট পাওয়ার কৌশলের আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। এর ফলে দেশের বৈশ্বিক ভাবমূর্তি বিচ্ছিন্ন রয়ে গেছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে সাফল্যের জন্য বাংলাদেশ স্বীকৃতি পেলেও একটি সুস্পষ্ট, ধারাবাহিক এবং আকর্ষণীয় জাতীয় পরিচিতি বা বয়ান (ন্যারেটিভ) গড়ে ওঠেনি।

সীমাবদ্ধতা: সম্ভাবনা থেকে প্রভাবের পথে
বাংলাদেশের সফট পাওয়ারের মূল্যবান অনেক সম্পদ রয়েছে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে আন্তর্জাতিক প্রভাব তৈরিতে সেগুলোর পূর্ণ ব্যবহার এখনো সম্ভব হয়নি। মূল সমস্যা দেশের সম্পদের অভাব নয়; বরং এই শক্তিগুলোকে তুলে ধরা, সমন্বয় করা এবং সুরক্ষিত রাখার জন্য একটি সুস্পষ্ট ও সমন্বিত কৌশলের অভাব। সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতার একটি হলো সুশাসন। রাজনৈতিক মেরুকরণ, গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা, আইনের শাসন, দুর্নীতি এবং মানবাধিকার নিয়ে দীর্ঘদিনের উদ্বেগ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি গঠনে প্রভাব ফেলছে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানকে ঘিরে সংঘটিত ঘটনাবলি-বিশেষ করে বিক্ষোভ দমনে সহিংসতা, পরবর্তীকালে গণপিটুনির ঘটনা, হেফাজতে মৃত্যু এবং অন্তর্বর্তী সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতা সম্পর্কে আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

ডিজিটাল যুগে, যেখানে আন্তর্জাতিক জনমত প্রায় তাৎক্ষণিকভাবে গড়ে ওঠে, সেখানে এ ধরনের ঘটনা খুব সহজেই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অবদান, মানবিক সহায়তা এবং সামাজিক উদ্ভাবনের মতো সাফল্যগুলোকে আড়াল করে দিতে পারে। শেষ পর্যন্ত সফট পাওয়ারের ভিত্তি হলো বিশ্বাসযোগ্যতা। আর যখন আন্তর্জাতিক আলোচনায় সুশাসনের ঘাটতিই প্রধান বিষয় হয়ে ওঠে, তখন সেই বিশ্বাসযোগ্যতা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা হলো বাংলাদেশের জনকূটনীতির (পাবলিক ডিপ্লোমেসি) প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা। বাংলাদেশের অনেক সফল সফট পাওয়ারের উদাহরণ পরিকল্পিত রাষ্ট্রীয় নীতির ফল নয়; বরং স্বতঃস্ফূর্তভাবে গড়ে উঠেছে। বাংলাদেশ-আর্জেন্টিনা সম্পর্ক তার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। যা শুরু হয়েছিল ফুটবলের প্রতি সাধারণ মানুষের আবেগ থেকে, তা ধীরে ধীরে অর্থবহ কূটনৈতিক সম্পর্কে রূপ নেয়। কিন্তু এই পরিবর্তনের প্রধান চালিকাশক্তি ছিল সাধারণ মানুষ, কোনো সমন্বিত সরকারি উদ্যোগ নয়।

যদিও এই সম্পর্ক পরবর্তীকালে সাংস্কৃতিক বিনিময় এবং দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার নতুন সুযোগ তৈরি করেছে, তবুও এই সদিচ্ছাকে কীভাবে দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুবিধায় রূপান্তর করা যায়, সে বিষয়ে বাংলাদেশ মাত্র সম্প্রতি গুরুত্ব দিতে শুরু করেছে। একই ধরনের চিত্র অন্যান্য ক্ষেত্রেও দেখা যায়। সাংস্কৃতিক কূটনীতি, জাতীয় ব্র্যান্ডিং এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগ এখনো বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বিচ্ছিন্নভাবে পরিচালিত হচ্ছে; সেখানে সমন্বয় ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত দিকনির্দেশনার অভাব রয়েছে। এদিকে বাংলাদেশকে ক্রমেই আরও প্রতিযোগিতাপূর্ণ সফট পাওয়ারের বৈশ্বিক পরিবেশে কাজ করতে হচ্ছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এখন জনকূটনীতি, শিক্ষা বিনিময়, আন্তর্জাতিক সম্প্রচার, ডিজিটাল যোগাযোগ, উন্নয়ন সহযোগিতা এবং সংস্কৃতির প্রসারে ব্যাপক বিনিয়োগ করছে, যাতে তারা নিজেদের ভূরাজনৈতিক স্বার্থ আরও কার্যকরভাবে এগিয়ে নিতে পারে। চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত, সিঙ্গাপুর এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ অনেক দেশ সংস্কৃতি, শিক্ষা, প্রযুক্তি এবং জাতীয় ব্র্যান্ডিংয়ের মাধ্যমে নিজেদের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি শক্তিশালী করতে বড় ধরনের বিনিয়োগ করেছে। বাংলাদেশও এসব ক্ষেত্রে কিছু অগ্রগতি অর্জন করেছে। তবে উদ্যোগগুলো এখনো বিচ্ছিন্ন এবং দীর্ঘমেয়াদি সুস্পষ্ট কৌশলের অভাব রয়েছে।

এ ছাড়া শ্রমিক অধিকার নিয়েও বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি এখনো চ্যালেঞ্জের মুখে। রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির পর কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি হলেও মজুরি, শ্রমিকের অধিকার, সংগঠন করার স্বাধীনতা এবং শ্রমমান নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ এখনো পুরোপুরি দূর হয়নি। এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বাংলাদেশের তৈরি পোশাক (আরএমজি) শিল্প বর্তমানে ভিয়েতনাম, ভারত এবং কম্বোডিয়ার মতো দেশের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতার মুখোমুখি। বিশ্বব্যাপী ক্রেতারা এখন টেকসই উৎপাদন, নৈতিক ব্যবসা এবং দায়িত্বশীল সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর আগের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। ফলে একটি দেশের আন্তর্জাতিক সুনাম নিজেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতামূলক সুবিধায় পরিণত হয়েছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও শক্তিশালী ব্র্যান্ডিং এবং শ্রমমান ও সুশাসনে ধারাবাহিক উন্নতি নিশ্চিত করা না গেলে, বাংলাদেশ এমন প্রতিযোগী দেশগুলোর কাছে পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকবে, যাদের তুলনামূলকভাবে আরও নির্ভরযোগ্য ও দায়িত্বশীল হিসেবে দেখা হয়।

সামনের পথ
সব দিক বিবেচনায় নিলে স্পষ্ট হয়, বাংলাদেশের প্রধান সীমাবদ্ধতা কাঠামোগত নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক। সফট পাওয়ারের ভিত্তি গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, উন্নয়নের সাফল্য, আন্তর্জাতিক সদিচ্ছা এবং জনগণের সঙ্গে জনগণের সংযোগ-এসবই বাংলাদেশের রয়েছে। কিন্তু যা এখনো অনুপস্থিত, তা হলো এমন একটি সুসংহত কাঠামো, যা এই সম্পদগুলোকে একটি ধারাবাহিক জাতীয় বয়ানে (ন্যারেটিভ) রূপ দিতে পারবে এবং দেশের বৃহত্তর পররাষ্ট্রনীতি ও উন্নয়ন লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে যুক্ত করতে সক্ষম হবে। বাংলাদেশের বৈশ্বিক প্রভাব বাড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় অনেক শক্তিই ইতোমধ্যে রয়েছে। এখন দরকার এমন একটি সমন্বিত কৌশল, যা ডিজিটাল কূটনীতি, সাংস্কৃতিক সম্পৃক্ততা, প্রবাসী বাংলাদেশিদের সম্পৃক্ততা, জলবায়ু নেতৃত্ব এবং সুশাসনকে একই কাঠামোর আওতায় নিয়ে আসবে। তবে বর্তমান বাস্তবতায় শুধু এসব উদ্যোগই যথেষ্ট নয়।

কারণ বাংলাদেশ একই সময়ে দুটি বড় পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে দেশের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক রূপান্তর চলছে, অন্যদিকে আঞ্চলিক ভূরাজনীতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে, যেখানে বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা ক্রমেই বাড়ছে। শুধু দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা কোনো সফট পাওয়ার কৌশল এই পরিবর্তনের ফলে সৃষ্টি হওয়া তাৎক্ষণিক সুযোগ ও চ্যালেঞ্জগুলোকে উপেক্ষা করতে পারে। বর্তমান বাস্তবতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো-বাংলাদেশের রাজনৈতিক রূপান্তর নিজেই এখন দেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির অংশ হয়ে উঠেছে। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক সংকটের পর থেকে বিদেশি সরকার, বিনিয়োগকারী, উন্নয়ন অংশীদার এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে, বাংলাদেশ কোন পথে এগোচ্ছে। তারা বিশেষভাবে নজর রাখছে- ভবিষ্যতের নির্বাচন কতটা বিশ্বাসযোগ্য হয়, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা শক্তিশালী হয়, আইনের শাসন কতটা প্রতিষ্ঠিত থাকে, মানবাধিকার কতটা সুরক্ষিত হয় এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষ কতটা স্বাধীনভাবে জনজীবনে অংশ নিতে পারে। বাংলাদেশ এসব বিষয় কীভাবে মোকাবিলা করে, তা আন্তর্জাতিক জনমত গঠনে যেকোনো জনকূটনৈতিক প্রচারণার মতোই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

অতএব বর্তমান সময়টি বাংলাদেশের জন্য একটি সীমিত কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। এই সময়ে দেশটি অস্থিতিশীলতা ও রাজনৈতিক মেরুকরণের পরিবর্তে গণতান্ত্রিক স্থিতিস্থাপকতা, অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসন এবং প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্গঠনের একটি ইতিবাচক ভাবমূর্তি বিশ্বে তুলে ধরতে পারে। এই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে বাংলাদেশকে এমন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে, যা সরকার পরিবর্তনের পরও দীর্ঘমেয়াদি সফট পাওয়ার কৌশল বাস্তবায়ন অব্যাহত রাখতে সক্ষম হবে। এখন পর্যন্ত জনকূটনীতি ও জাতীয় ব্র্যান্ডিংয়ের উদ্যোগগুলো প্রায়ই রাজনৈতিক নেতৃত্বের পরিবর্তনের সঙ্গে বদলে গেছে। অথচ এগুলোকে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় প্রকল্প হিসেবে গড়ে তোলা প্রয়োজন ছিল। সাংস্কৃতিক কূটনীতি, কৌশলগত যোগাযোগ এবং আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততার সমন্বয় সাধনের জন্য একটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা গেলে সেটি বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিতে ধারাবাহিকতা, বিশ্বাসযোগ্যতা এবং স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে পারে। একই সঙ্গে এই কৌশলকে অবশ্যই নমনীয় হতে হবে। একটি স্থির জাতীয় ব্র্যান্ডিং পরিকল্পনার ওপর নির্ভর না করে বাংলাদেশকে এমন একটি অভিযোজনক্ষম কাঠামো গড়ে তুলতে হবে, যা দেশের অভ্যন্তরীণ পরিবর্তন, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এবং ভূরাজনৈতিক রূপান্তরের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারবে, তবে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থকে কেন্দ্র করেই পরিচালিত হবে।

বিশেষ করে ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতাপূর্ণ আঞ্চলিক পরিবেশে এই অভিযোজনক্ষমতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারত, চীন এবং যুক্তরাষ্ট্র-তিন দেশই যখন ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করতে আগ্রহী, তখন বাংলাদেশকে এই প্রতিযোগিতাকে শুধু কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে নয়, বরং একটি কৌশলগত সুযোগ হিসেবেও দেখতে হবে। এই তিন দেশের সঙ্গেই শিক্ষা, সংস্কৃতি, গবেষণা এবং জনগণের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক আরও সম্প্রসারণের মাধ্যমে বাংলাদেশ তার আন্তর্জাতিক অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে পারে, একই সঙ্গে নিজের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনও বজায় রাখতে পারে। বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত কোনো একক শক্তির সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠ হওয়া নয়; বরং একযোগে একাধিক শক্তির কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা। এ ছাড়া বাংলাদেশের হাতে এখনো পুরোপুরি কাজে না লাগানো একটি গুরুত্বপূর্ণ সফট পাওয়ারের সম্পদ রয়েছে-দেশের তরুণ জনগোষ্ঠী।

বাংলাদেশের তরুণরা ডিজিটালভাবে সংযুক্ত, বৈশ্বিক বাস্তবতা সম্পর্কে সচেতন এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনের সঙ্গে ক্রমেই বেশি সম্পৃক্ত। তাদের শুধু জনকূটনীতির লক্ষ্যবস্তু হিসেবে না দেখে, সাংস্কৃতিক বিনিময়, উদ্ভাবনী নেটওয়ার্ক, আন্তর্জাতিক গবেষণা সহযোগিতা এবং বৈশ্বিক সংলাপের সক্রিয় অংশীদার হিসেবে গড়ে তোলাই বাংলাদেশের সফট পাওয়ারকে আরও শক্তিশালী করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় হতে পারে।

তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণ বাংলাদেশের একটি আরও গতিশীল, আত্মবিশ্বাসী এবং ভবিষ্যতমুখী আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলো আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তি দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করার সক্ষমতা। তাই বাংলাদেশের সুনাম রক্ষা শুধু সাফল্যের গল্প প্রচারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। রাজনৈতিক বা মানবিক সংকটের সময়ও দেশকে দ্রুত, স্বচ্ছ এবং বিশ্বাসযোগ্যভাবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। একই সঙ্গে ভুল তথ্য (মিসইনফরমেশন), বিভ্রান্তিকর তথ্য (ডিসইনফরমেশন) এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা (প্রপাগান্ডা) শনাক্ত ও মোকাবিলার সক্ষমতা আরও জোরদার করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে যখন ভুল বা বিভ্রান্তিকর বর্ণনা আন্তর্জাতিক জনমত এবং নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে। সবশেষে বলা যায়, বর্তমানে বাংলাদেশের সফট পাওয়ারের প্রধান চ্যালেঞ্জ কেবল দীর্ঘমেয়াদে আন্তর্জাতিক প্রভাব বৃদ্ধি করা নয়।

বরং এটি এমন এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণকে কাজে লাগানোর বিষয়, যার মাধ্যমে উদীয়মান আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ব্যবস্থায় বাংলাদেশকে কীভাবে দেখা হবে, তা নির্ধারিত হতে পারে। এই লক্ষ্য অর্জনের সাফল্য নির্ভর করবে শুধু বাংলাদেশের বিদ্যমান শক্তি ও সাফল্যগুলো বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরার ওপর নয়; বরং এমন কার্যকর প্রতিষ্ঠান ও কৌশল গড়ে তোলার ওপরও, যা দ্রুত পরিবর্তনশীল রাজনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে সক্ষম এবং দীর্ঘমেয়াদে দেশের জাতীয় স্বার্থকে কার্যকরভাবে এগিয়ে নিতে পারে।

(লেখক বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজ (বিআইপিএসএস)-এর একজন গবেষণা সহকারী। তিনি বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি) থেকে ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজে বিএসএস ও এমএসএস সম্পন্ন করেছেন)

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন