হরমুজ প্রণালী সমুদ্রপথে তেল পরিবহনের একটি অত্যন্ত কৌশলগত রুট, যা দীর্ঘদিন ধরে ইরান ভূরাজনৈতিক চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। সংকটের সময়ে তেহরান বারবার এই প্রণালী বন্ধ করার হুমকি দিয়েছে। জানুয়ারির শেষ দিকে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডের এক জ্যেষ্ঠ নৌ-কমান্ডার আবারও হুঁশিয়ারি দেন যে, যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালালে প্রণালী বন্ধ করে দেয়া হতে পারে। সে সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক করে বলেন, ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করতে চুক্তিতে রাজি না হলে সামরিক ব্যবস্থা নেয়া হতে পারে। অবশেষে সেই সামরিক ব্যবস্থাই বেছে নিলেন ট্রাম্প ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। শুধু সামরিক অভিযান চালিয়েই ক্ষান্ত দেননি, পাশাপাশি ইরানি জনগণকে উসকে দিয়েছেন। বলেছেন, আমাদের যা করার তা করবো। আমরা যেখানে শেষ করবো, তখন তোমরা সরকার দখল করবে। একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে তার জনগণকে ক্ষেপিয়ে তোলার ক্ষেত্রে অন্য দেশের, বিশেষ করে সরকার প্রধানের উস্কানির খবর খুব বিরল। তবে ট্রাম্পের এমন অভিব্যক্তির বিরুদ্ধে কথা বলেছেন রাশিয়ার দমিত্রি মেদভেদেভ। তিনি বলেছেন, ইরানে হামলার মাধ্যমে ‘শান্তির দূত তার আসল চেহারা প্রদর্শন করেছেন’।
বার্তা সংস্থা এএফপি বলছে, যদিও ইরান প্রায়ই অবরোধের হুমকি দেয়, বাস্তবে কখনও পুরো প্রণালী বন্ধ করেনি। তবে সাম্প্রতিক সামরিক মহড়ার সময় নিরাপত্তার কারণে অল্প সময়ের জন্য আংশিকভাবে বন্ধ করা হয়েছিল। নিচে এই জলপথ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরা হলো- হরমুজ প্রণালী হলো পারস্য উপসাগরকে ভারত মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এটি ইরান এবং ওমানের মুসান্দাম উপদ্বীপের মাঝখানে অবস্থিত। প্রস্থ প্রায় ৫০ কিলোমিটার (৩০ মাইল)। গভীরতা সর্বোচ্চ প্রায় ৬০ মিটার (২০০ ফুট)। এই পানিপথ সংকীর্ণ ও তুলনামূলকভাবে অগভীর হওয়ায় সামরিকভাবে অবরুদ্ধ করা সম্ভব তা। প্রণালীতে কয়েকটি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপ রয়েছে। তা হলো ইরানের হরমুজ, কেশম ও লারাক দ্বীপ। এছাড়া গ্রেটার টুনব, লেসার টুনব ও আবু মুসা নামে বিতর্কিত দ্বীপ রয়েছে, যা সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইরানের মধ্যে বিরোধপূর্ণ এবং ১৯৭১ সাল থেকে ইরানের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
হরমুজ প্রণালী বিশ্বের তেলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চেকপয়েন্ট। মার্কিন জ্বালানি তথ্য প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে ব্যবহৃত মোট তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্যের প্রায় একপঞ্চমাংশ, যা প্রায় ২০ মিলিয়ন ব্যারেল প্রতিদিন, এই প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়। বৈশ্বিক তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি)-এরও প্রায় এক-পঞ্চমাংশ ২০২৪ সালে এই পথ দিয়ে গেছে, যার বড় অংশ এসেছে কাতার থেকে। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের কাছে বিকল্প পাইপলাইন অবকাঠামো রয়েছে, যা প্রণালী এড়িয়ে তেল পরিবহন করতে পারে। তবে সেই সক্ষমতা সীমিত, প্রতিদিন প্রায় ২.৬ মিলিয়ন ব্যারেল। আন্তর্জাতিক আনবিক শক্তি সংস্থা ইআইএ সতর্ক করেছে, এই প্রণালী দিয়ে বিপুল পরিমাণ তেল যায় এবং এটি বন্ধ হয়ে গেলে বিকল্প পথ খুবই সীমিত। এই প্রণালী দিয়ে যাওয়া তেল ও গ্যাসের ৮০ শতাংশের বেশি এশিয়ার বাজারে যায়। বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান কেপলার বলছে, ইরানের তেল রপ্তানির ৯০ শতাংশের বেশি কেনে চীন। ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড (আইআরজিসি) পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালীতে নৌ-অভিযান নিয়ন্ত্রণ করে। তেহরান দীর্ঘদিন ধরে এ অঞ্চলে বিদেশি শক্তির উপস্থিতির সমালোচনা করে আসছে। এখানে রয়েছে বাহরাইনে যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম নৌবহর, কাতারে মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় মার্কিন সামরিক ঘাঁটি। ২০২৩ সালে উপসাগরে টহলরত পশ্চিমা নৌবাহিনী জাহাজগুলোকে ইরানি জলসীমার কাছাকাছি না যেতে সতর্ক করে, যাতে আটক হওয়ার ঝুঁকি এড়ানো যায়। ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে ঐতিহাসিক পারমাণবিক চুক্তি থেকে সরে এসে কঠোর নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল করার পর থেকে উত্তেজনা বাড়তে থাকে এবং একাধিক নৌ-সংক্রান্ত ঘটনা ঘটে।
১৯৮৪ সালে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় উভয় পক্ষ একে অপরের জাহাজে হামলা চালায়। ‘ট্যাঙ্কার যুদ্ধ’ নামে পরিচিত এই সংঘাতে ৫ শতাধিক জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়। ১৯৮৮ সালের এপ্রিলে ইরান এই প্রণালীতে মাইন পেতে রাখার পর মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস স্যামুয়েল বি. রবার্টস একটি মাইনে আঘাত করে এবং প্রায় ডুবে যায়। একই বছরের জুলাইয়ে ইরান এয়ারের একটি এয়ারবাস এ৩০০, যা বন্দর আব্বাস থেকে দুবাই যাচ্ছিল, মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস ভিনসেন্স থেকে ছোড়া দু’টি ক্ষেপণাস্ত্রে ভূপাতিত হয়। এতে ২৯০ জন নিহত হন। জাহাজের ক্রুরা দাবি করেন, তারা বিমানটিকে শত্রুভাবাপন্ন ইরানি যুদ্ধবিমান মনে করেছিলেন।
হরমুজ প্রণালী প্রায়ই জাহাজ আটক ও হামলার ঘটনার কেন্দ্রস্থল। ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক চুক্তি থেকে সরে যাওয়ার পর এসব ঘটনা বেড়ে যায়। ২০১৯ সালে উপসাগরীয় অঞ্চলে একাধিক অজ্ঞাত হামলা, একটি ড্রোন ভূপাতিত হওয়া এবং ট্যাঙ্কার জব্দের ঘটনায় তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে উত্তেজনা তীব্র হয়। ২০২১ সালের ২৯শে জুলাই ওমান উপসাগরে একটি তেলবাহী জাহাজে হামলায় দুইজন নিহত হন। জাহাজটি এক ইসরাইলি ধনকুবেরের মালিকানাধীন কোম্পানি পরিচালনা করছিল। ইসরাইল, যুক্তরাষ্ট্র, বৃটেন ও রোমানিয়া এ হামলার জন্য ইরানকে দায়ী করে, যদিও তেহরান জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করে। ২০২৪ সালের এপ্রিলে রেভল্যুশনারি গার্ড পর্তুগিজ পতাকাবাহী কনটেইনার জাহাজ এমএসসি অ্যারিস জব্দ করে, মালিককে ‘ইসরাইলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট’ বলে অভিযোগ তোলে।
এ বছরের ফেব্রুয়ারির শুরুতে একটি মার্কিন পতাকাবাহী ট্যাঙ্কারকে প্রণালীতে ইরানি গানবোট ঘিরে ফেলে ও চ্যালেঞ্জ জানায়, তবে পরে সেটি যাত্রা অব্যাহত রাখে বলে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে।
