যশোরে ২৭ শহীদ: হতাশা আর অপ্রাপ্তির যোগফল দীর্ঘ হচ্ছে

যশোরে ২৭ শহীদ: হতাশা আর অপ্রাপ্তির যোগফল দীর্ঘ হচ্ছে

ফন্ট সাইজ:

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে যশোরের শহীদ পরিবারের সদস্যরা ভালো নেই। হতাশা আর অপ্রাপ্তির যোগফল তাদের কাছে দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। বছর ঘুরে বছর আসছে কিন্তু শহীদদের স্বপ্ন পূরণ হচ্ছে না বলে মনে করেন যশোরের ২৭ শহীদ পরিবারের প্রায় সকলেই। তাদের দাবি জুলাই বিপ্লবের মূল স্পিরিট ছিল রাষ্ট্র তথা সমাজের সকল সেক্টর থেকে বৈষম্য, লাঞ্ছনা আর দুর্নীতি দূর করে একটি ইনসাফ ও ন্যায়বিচারভিত্তিক সমাজ কাঠামো গড়ে তোলা। মানুষের জান-মালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। চাঁদাবাজি, দখলবাজি, টেন্ডারবাজি, তোলাবাজি সব বন্ধ করে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রার মান নিশ্চিত করা। গত ১৭ বছরে দেশে চলমান হত্যা, খুন, গুম এবং লাখ লাখ কোটি টাকার বিদেশে পাচারের সঙ্গে যারা বা যে চক্র জড়িত ছিল তাদের আইন আমলে নিয়ে বিচার করতে হবে।

জুলাই আন্দোলনে যারা যারা ছাত্র-জনতা হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত তাদের গ্রেপ্তার করে বিচারের মুখোমুখি করা। রাষ্ট্র থেকে কি বৈষম্য দূর হয়েছে। চাকরির বাজার কি সকল প্রকার অন্যায় আর অনিয়ম থেকে মুক্ত হতে পেরেছে, সত্যিকারের মেধার কি মুল্যায়ন হচ্ছে? এমন বহু প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে শহীদ পরিবারের সদস্যদের মধ্যে। তবে এতো কিছুর পরও মানুষের ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হওয়াকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন যশোরের শহীদ পরিবারের সদস্যরা। তারা চান তাদের সন্তানদের জীবনের বিনিময়ে যে নতুন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটেছে তা রক্ষার্থে জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত সকল রাজনৈতিক দল ও তাদের মিত্র ছাত্র-জনতার ঐক্য। কারণ, এই ঐক্য বিনষ্ট হলে রাষ্ট্রে ফের ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে। যা শহীদের রক্তের সঙ্গে বেঈমানির শামিল।

সারা দেশের ন্যায় যশোরেও জুলাই বিপ্লবের ঢেউ লেগেছিল সেই জুলাইয়ের ১৬ তারিখে রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদ আর চট্টগ্রামে কলেজছাত্র ওয়াসিম, ফয়সাল আহমেদ শান্ত, ঢাকার মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধসহ সারা দেশে ৬-৭ জন ছাত্র পুলিশের গুলিতে নিহত হন। এই খবর ছড়িয়ে পড়লে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি এমএম কলেজ, সরকারি সিটি কলেজ, সরকারি মহিলা কলেজসহ জেলা শহর ও শহরতলীতে অবস্থিত সরকারি-বেসরকারি স্কুল-কলেজের হাজার হাজার ছেলে মেয়ে রাস্তায় নেমে পড়ে। সঙ্গে ছিল তাদের অনেকের অভিভাবকসহ সর্বস্তরের পেশাজীবী জনতা। ৩৬ দিনের সেই আন্দোলনে যশোরের রাজপথে গুলিবিদ্ধ হয়ে বা অন্য কোনো কারণে রক্তাক্তের কোনো ঘটনা না ঘটলেও ৫ই আগস্ট পতিত স্বৈরাচার ফ্যাসিস্ট হাসিনার সরকারের পতন এবং দেশ থেকে পালিয়ে যাওয়ার আনন্দের মধ্যে ঘটে যশোরের ইতিহাসে এক লোমহর্ষক বেদনাদায়ক ঘটনা। আর সেই ঘটনা ইতিহাসের পাতায় জাবের ট্র্যাজেডি নামে পরিচিত।

যশোর শহরের চিত্রা মোড়ে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক দোর্দণ্ড প্রতাপশালী শাহীন চাকলাদার গড়ে তোলেন জাবের ইন্টারন্যাশনাল নামের একটি পাঁচতারকা হোটেল। বার, ড্যান্স ক্লাব, স্প্যা সেন্টার থেকে শুরু করে আধুনিক সব সুযোগ-সুবিধা সংবলিত সেই জাবের হোটেল আওয়ামী দুঃশাসনের স্মৃতিচিহ্নে পরিণত হয়। জুলাই বিপ্লবের বিজয়ের মুহূর্তে আন্দোলনসহ হাজার হাজার ছাত্র-জনতা এবং উৎসুক মানুষ বিজয় মিছিল নিয়ে চিত্রা মোড় অতিক্রম করার সময় আকস্মিকভাবে বহু মানুষ ওই হোটেলে প্রবেশ করেন বিনা বাধায়। কিছুক্ষণ পরেই কে বা কারা হোটেলের ৩য় তলায় গান পাউডার ছিটিয়ে তাতে অগ্নিসংযোগ করেন। মুহূর্তে হোটেলের বিভিন্ন ফ্লোরে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। উৎসুক ছাত্র-জনতা অগ্নিকাণ্ডের ফলে বিভিন্ন ফ্লোরে আটকা পড়েন। খবর পেয়ে জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত সকল পক্ষই উদ্ধার অভিযানে ঝাঁপিয়ে পড়েন। খুলনা বিভাগের সকল জেলার দমকল বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট এবং বিমান বাহিনীর হেলিকপ্টার গানশিপ এই উদ্ধার অভিযানে অংশ নেন।

দীর্ঘ প্রায় ১৮ ঘণ্টা চেষ্টার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে ঠিকই কিন্তু ততক্ষণে এক বিদেশিসহ ২৩ জনের প্রাণ প্রদীপ নিভে যায়। রক্তাক্ত জুলাইয়ের সঙ্গে যোগ হয় অগ্নিকাণ্ডে নিহত ২৩ শহীদের নাম। তবে এই শহীদি তালিকা নিয়ে এখনও রয়েছে নানা বিভক্তি আর দ্বন্দ্ব। যা এখনও তদন্তনাধীন। তবে জাবের ট্র্যাজেডিতে নিহত ও আহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো মামলা রুজু না করা হলেও হোটেল কর্তৃপক্ষ কিন্তু ঠিকই অগ্নিকাণ্ড, লুটপাট ও ক্ষতিগ্রস্ত সংক্রান্ত একাধিক মামলা করেন যশোর কোতোয়ালি মডেল থানায়। যার বর্তমানে তদন্ত চলমান।

এদিকে দেশজুড়ে জুলাই বিপ্লবে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুলিতে এবং অগ্নিদগ্ধ হয়ে ঢাকা ও বরগুনায় শহীদ হন যশোরের ৪ সূর্য সন্তান। ফলে সর্বশেষ সরকারী গেজেট ভূক্ত যশোরের ২৭ শহীদের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের রক্তাক্ত ইতিহাসে। এর মধ্যে ১৯শে জুলাই ঢাকার বনশ্রী বি-ব্লকের সড়কে গুলিবিদ্ধ হন সাউথইস্ট ইউনির্ভাসিটির বিবিএ ক্লাসের ছাত্র ইমতিয়াজ আহমেদ জাবির। তিনি যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার হাজীরবাগ ইউনিয়নের দেউলি গ্রামের কৃষক রওশান আলীর একমাত্র ছেলে। দীর্ঘ প্রায় এক সপ্তাহ ঢাকা মেডিকেল পড়ে থেকে বিনা চিকিৎসায় ২৬শে জুলাই জাবির মৃত্যুবরণ করেন। পুলিশি প্রহরায় কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে ওইদিন রাতেই তার লাশ বিনা জানাজায় পুলিশ দেউলি পারিবারিক গোরস্থানে দাফন করে। ৫ই আগস্ট সরকার পতনের পর শেখ হাসিনা পালিয়ে গেলেও ঢাকার অদূরে আশুলিয়া এলাকায় ছাত্র-জনতার ওপর লেলিয়ে দেওয়া পুলিশের গুণ্ডাবাহিনী ও ছাত্রলীগ-যুবলীগের সশস্ত্র ক্যাডাররা আক্রমণ অব্যাহত রাখে।

এই সম্মিলিত আক্রমণেই গুলিবিদ্ধ হন আন্দোলনের গার্মেন্টস শ্রমিক তৌহিদুর রহমান। তিনি যশোরের কেশবপুর উপজেলার ভাল্লুকঘর গ্রামের কৃষক আব্দুল জব্বার মোল্যার ছেলে তৌহিদুর রহমান। তৌহিদুর রহমানদের- মিছিলটি যখন আশুলিয়া থানায় সামনে পৌঁছায়, তখন আশুলিয়া থানা পুলিশের গুলিতে তৌহিদুর রহমানসহ বেশ কয়েকজন আন্দোলকারী শহীদ হন। এ সময় কয়েক জনের লাশ পুড়িয়ে ফেলা হলেও গুলিতে আহত তৌহিদুর রহমানকে গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করে ঢাকার একটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। এসময় কর্মরত ডাক্তার তাতে মৃত্যু ঘোষণা করেন। এরপর ৭ই আগস্ট তৌহিদুর রহমানের স্ত্রী নাসরিন আক্তার বাদী হয়ে শেখ হাসিনাসহ ৫২ জনের নাম উল্লেখসহ আরও অজ্ঞাত ৪শ’ জনকে আসামি করে আশুলিয়া থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলাটি আজও আলোর মুখ দেখেনি। শহীদ তৌহিদুর রহমানের পিতা মো. জব্বার মোল্যা বলেন, তার সংসারের একমাত্র আয়ের উৎস ছিল তার ছোট ছেলে তৌহিদুর রহমান। সে দেশের জন্য জীবন দিয়েছে। কিন্তু যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে তার মতো হাজার মায়ের সন্তানদের জীবন দান আজ বৃথা হতে চলেছে। রাষ্ট্র তাদের ত্যাগের কি মূল্যায়ন করবে তা জানি না।

কিন্তু স্থানীয় ভাবে যা হচ্ছে তা তো রীতিমতো হতাশ করছে আমাদের। হত্যা, খুন, গুম, রাহাজানি, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি সবই তো হচ্ছে আগের মতোই। এই কেশবপুরে পতিত স্বৈরাচার আর গণতান্ত্রিক বিএনপি মিলেমিশে একাকার। শহীদ জাবিরের পিতা রওশন আলী বলেন, আমার একমাত্র পুত্রসন্তান জাবির যে স্বপ্ন নিয়ে স্বৈরাচার পতনের আন্দোলনে গিয়ে শহীদ হয়েছে, তার সেই স্বপ্ন বৈষম্যহীন রাষ্ট্র তো আমরা কায়েম করতে পারছি না। সব কিছুই চলছে সেই আগের মতোই। ফলে এসব দেখে হতাশায় বুক ভরে যাচ্ছে। ৫ই আগস্ট পুরাতন ঢাকায় পুলিশের গুলিতে আহত হন শহীদ সোহ্‌রাওয়ার্দী কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অনার্স তৃতীয়বর্ষের ছাত্র এম আব্দুল্লাহ। তিনি যশোরের বেনাপোল পোর্ট থানার বড় আঁচড়া গ্রামের আব্দুল জব্বারের ছেলে। আব্দুল্লাহ ঢাকার সিএমএইচ হাসপাতালে দীর্ঘদিন লড়াই করে ১৪ই নভেম্বর মৃত্যুবরণ করেন। গতকাল সকালে নিজ বাড়িতে বসে কথা হয় আব্দুল জব্বারের সঙ্গে। অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে বৃদ্ধ আব্দুল জব্বার বলেন, বুক ভরা আশা নিয়ে ছেলেকে ঢাকায় পাঠিয়েছিলাম লেখাপড়া শিখে সে অনেক বড় হবে। ভালো চাকরি করে সংসারের অভাব দূর করবে। বৃদ্ধ বয়সে একটু আরাম আয়েশ করে মরবো। কিন্তু হাজারো রোগ-শোক নিয়ে আমি এখনো জীবিত থাকলাম আর আমার বুকের ধন মানিককে আল্লাহ্‌ নিয়ে গেলেন।

এদিকে জাবের ট্র্যাজেডি দাগ কেটে রয়েছে যশোরবাসীর মনে। ট্র্যাজেডিতে ২৪ জন নানা বয়সের ছাত্র-জনতা অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা যান। যার মধ্যে একজন বিদেশি, ১৩ জন ছাত্রসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ ছিলেন। এর মধ্যে বিশেষ ভাবে স্কুলছাত্র আবরার মাসনুন নীল (১০), ইউ ল্যাব ইউনিভার্সিটির ছাত্র সোহানুর রহমান শিহাব (২১) আঃ আজিজ চান (১৬), কলেজছাত্র সিফাত হোসেন (২২), দোকান কর্মচারী হাফিজ উদ্দিন (৩০),কলেজ ছাত্র রাকিব (২২), মিথুন মোর্শেদ (২৭), কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফয়সাল হোসেন (২৫), সরকারি সিটি কলেজের ছাত্র শাওয়ান্তা মেহেতাব প্রিয় (১৮), স্কুলছাত্র মেহেদী হাসান (১৩), যশোর শিক্ষা বোর্ড সরকারি মডেল স্কুলের শিক্ষার্থী সামিউর রহমান সাদ (১৭), রুহান ইসলাম (১৭), তারেক রহমান (২৮), আলামিন বিশ্বাস (২০), ইউছুফ আলী (১৫), সাকিবুল হাসান মাহি (১৫), মেহেদী হাসান আলিফ (১৫), রাসেল রানা (২১) উল্লেখযোগ্য। এদের অনেকেই অগ্নিদগ্ধ হয়ে আবার অনেকে উদ্ধার কাজে অংশ নিতে গিয়ে শ্বাসকষ্টে মারা যান। কথা হয় যশোর বিএফ শাহীন কলেজের ৪র্থ শ্রেণির ছাত্র আবরার মাসনুন নীলের মায়ের সঙ্গে। জেসমিন আক্তার সন্তান হারা হয়ে পাগল প্রায় অবস্থা।

তিনি বলেন, সরকার আমাদের সন্তানদের রক্তের সঙ্গে বেঈমানি করছে। আমরা কোনো অর্থ বিত্ত সরকারের কাছে চাই না। আমরা চাই আমাদের সন্তানদের শহীদি মর্যাদা। শুরুতে জাবের ট্র্যাজেডি অগ্নিকাণ্ডে নিহত ২৩ জনকে শহীদি মর্যাদা দিয়ে সরকার প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করেছিলো। কিন্তু রহস্যজনক কারণে সেই প্রজ্ঞাপন স্থগিত করে এই হত্যাকাণ্ডে নিহত শহীদদের বিষয়ে অধিকতর তদন্ত করার নির্দেশনা দেয়। জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় সেই তদন্ত এখনো চলমান। তিনি বলেন, প্রথম দফায় ৫ লাখ ও দ্বিতীয় দফায় ২ লাখ টাকার সরকারি অনুদান পেয়েছিলাম। এরপর সব বন্ধ রয়েছে। আমরা শহীদ পরিবারের সদস্যরা বারবার জেলা প্রশাসকের দপ্তরে যাচ্ছি, কথা বলছি, তবে কোনো সমাধান পাচ্ছি না। এই কারণে সন্তান হারা মা-বাবারা এখন চরম হতাশ হয়ে পড়েছি।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন