গোলাপগঞ্জের রক্তে লেখা ইতিহাস, একদিনেই ঝরে যায় ৬ প্রাণ

ফন্ট সাইজ:

৪ঠা আগস্ট। সিলেটের গোলাপগঞ্জের ইতিহাসের এক বেদনাবিধুর, রক্তাক্ত ও শোকাবহ দিন। একটি দিন, যেদিন একসঙ্গে নিভে গিয়েছিল ছয়টি তাজা প্রাণ। যে দিনের স্মৃতি আজও বুকের ভেতর রক্তক্ষরণ ঘটায় হাজারো মানুষের। দুই বছর পেরিয়ে গেলেও শহীদ পরিবারের আহাজারি, মায়ের বুকফাটা কান্না, বাবার নিঃশব্দ দীর্ঘশ্বাস, স্ত্রী-সন্তানের অপেক্ষা আর স্বজনদের ন্যায়বিচারের আকুতি আজও থামেনি। ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের উত্তাল সময়ে, সরকার পতনের মাত্র একদিন আগে ৪ঠা আগস্ট গোলাপগঞ্জ রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, সেদিন পুলিশ, বিজিবি ও আওয়ামী লীগের সশস্ত্র কর্মীদের গুলিতে গোলাপগঞ্জে একই দিনে শহীদ হন ছয়জন। পরদিন ৫ই আগস্ট সিলেট নগরীতে গুলিবিদ্ধ হয়ে আরও একজন প্রাণ হারান।

সবমিলিয়ে আন্দোলনে গোলাপগঞ্জের ৭ জন জীবন উৎসর্গ করেন। শহীদরা হলেন- মো. নাজমুল ইসলাম, তাজ উদ্দিন, সানি আহমদ, জয় আহমদ, গৌছ উদ্দিন, মিনহাজ আহমদ এবং মো. পাবেল আহমদ কামরুল। তাদের আত্মত্যাগ গোলাপগঞ্জের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। সেদিন সকাল থেকেই উপজেলা সদর, ঢাকাদক্ষিণ বাজার, ভাদেশ্বরসহ বিভিন্ন স্থানে ছাত্র-জনতার বিক্ষোভ চলছিল। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সংঘর্ষ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং পরে গুলির ঘটনা ঘটে। বারকোট ও ধারাবহর এলাকায় গুলিতে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান তিনজন। গুরুতর আহত জয় আহমদকে হাসপাতালে নেয়ার পর তিনি মারা যান। পরে উপজেলা সদর এলাকায় আরও সংঘর্ষে প্রাণ হারান গৌছ উদ্দিন ও মিনহাজ আহমদ। আজও সেই রক্তাক্ত দিনের স্মৃতি ভুলতে পারেনি গোলাপগঞ্জ।

যে মায়ের বুকের ধন হারিয়েছে, তার কাছে ৪ঠা আগস্ট মানেই নতুন করে শোকের দিন। যে সন্তান বাবাকে হারিয়েছে, তার কাছে এই দিন মানেই শূন্যতার আরেকটি বছর। যে স্ত্রী স্বামীকে হারিয়েছেন, তার কাছে প্রতিটি ৪ঠা আগস্ট ফিরে আসে অশ্রুসিক্ত স্মৃতি হয়ে। এদিকে দুই বছর পেরিয়ে গেলেও বিচারপ্রক্রিয়া শেষ হয়নি বলে নিহত পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ করেছেন। তাদের প্রত্যাশা প্রকৃত দায়ীদের দ্রুত বিচারের মুখোমুখি করা হবে এবং শহীদদের আত্মত্যাগের যথাযথ মূল্যায়ন নিশ্চিত করা হবে। জানা গেছে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটররা ইতিমধ্যে দুই দফা গোলাপগঞ্জে এসে তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন। দ্বিতীয় শাহাদতবার্ষিকীতে গোলাপগঞ্জের আকাশ-বাতাস যেন একটাই প্রশ্ন উচ্চারণ করছে স্বজন হারানোর এই কান্নার ন্যায়বিচার কবে মিলবে।

৪ঠা আগস্ট শুধু একটি দিন নয়, এটি গোলাপগঞ্জের ইতিহাসে রক্তে লেখা এক কালো অধ্যায়। শহীদদের আত্মত্যাগ, স্বজনদের অশ্রু আর ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন