শহীদ রফিকের পরিবারে এখনো শোকের মাতম

শহীদ রফিকের পরিবারে এখনো শোকের মাতম

ফন্ট সাইজ:

১৪ মাসের রাইসা এখন ৪ বছরে পা দিয়েছে। বাবার আদর, স্নেহ আর ভালোবাসা ছাড়াই বড় হচ্ছে শিশুটি। বাবার শূন্যতায় রাইসার একমাত্র অবলম্বন তার মা। ১৯ বছর বয়সে স্বামীকে হারানোর শোককে শক্তিতে পরিণত করে মেয়ের আলোকিত ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখছেন তিনি। অল্প বয়সে স্বামীহারা এই মায়ের পুরো পৃথিবী জুড়েই এখন শুধুই তার মেয়ে। অন্যদিকে, পরিবারের উপার্জনের একমাত্র অবলম্বন ছেলেকে হারিয়ে দিশাহারা কৃষক বাবা-মায়ের চোখের জল এখনো শুকায়নি। চরম কষ্টের মধ্যদিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে পরিবারটি। ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট ছাত্র-জনতার স্বৈরাচারবিরোধী একদফা আন্দোলনের শেষ দিনে মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার পাটুরিয়া ফেরিঘাট এলাকায় পুলিশের গুলিতে নিহত হন যুবক রফিকুল ইসলাম। শহীদ রফিকুল ইসলামের অসহায় পরিবারটি আজ কেমন আছে, সেই চিত্র নিয়ে মানবজমিন-এর আজকের প্রতিবেদন।

৫ই আগস্ট সকালে শিবালয় উপজেলার রূপসা নালী গ্রামের ২৪ বছরের টগবগে যুবক রফিকুল ইসলাম তার ১৪ মাসের অবুঝ কন্যা, তরুণী স্ত্রী ও মা-বাবাসহ কারও মুখের দিকে না তাকিয়ে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। পুলিশের বন্দুকের সামনে নতি স্বীকার না করা সেই সাহসী যোদ্ধা সেদিনই পাটুরিয়া ফেরিঘাটের রাস্তা রক্তে রঞ্জিত করে শহীদ হন। দেশের গণতন্ত্রের জন্য জীবন বিসর্জন দেয়া শহীদ রফিকের স্মৃতি আঁকড়ে ধরে বেঁচে আছেন পরিবারের সদস্যরা। দুই বছর পার হলেও পরিবারটিতে এখনো কাটেনি শোকের মাতম।

শহীদ রফিকের স্ত্রী শাবনুর আবেগাপ্লুত কণ্ঠে মানবজমিনকে বলেন, পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষ ছিল রফিক। সংসারের পুরো দায়িত্বই ছিল তার কাঁধে। ৫ই আগস্ট সকালে আন্দোলনে যোগ দিতে বের হওয়ার সময় বলেছিল-দেশের জন্য জীবন দিতে প্রস্তুত, তাও আন্দোলন থেকে পিছপা হবো না। সেকথা বলেই বের হলো, আর ফিরে এলো লাশ হয়ে। পুলিশ আমার স্বামীকে বাঁচতে দিলো না, আমাকে করলো বিধবা, আর অবুঝ মেয়েটিকে করলো পিতৃহারা। তিনি আরও বলেন, স্বামী হারানোর যন্ত্রণা একমাত্র সেই বোঝে যার স্বামী নেই। মাত্র ১৪ বছর বয়সে আমরা পছন্দ করে বিয়ে করি। বেশ সুখের সংসার ছিল আমাদের। ঘর আলো করে কন্যা সন্তান রাইসা এলো। কিন্তু মেয়ের বয়স ১৪ মাস পার হতে না হতেই আমার সব শেষ হয়ে গেল। সরকারের পক্ষ থেকে কিছু সহযোগিতা পেলেও স্বামী হারানোর শূন্যতা আমাকে প্রতিদিন কুরে কুরে খাচ্ছে।” প্রতিবাদী কণ্ঠে শাবনুর দাবি জানান, যারা আমার স্বামীকে গুলি করে হত্যা করেছে এবং যাদের নির্দেশে এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, তাদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার ও ফাঁসি চাই।

পাশাপাশি আমার স্বামীর ত্যাগকে স্মরণীয় করে রাখতে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত। মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি বলেন, এখন আমার পৃথিবী জুড়ে শুধু আমার মেয়ে। ওকে নিয়েই আমি বেঁচে আছি। ওকে মানুষের মতো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাই আমার জীবনের মূল লক্ষ্য।

শাবনুর বলেন, বর্তমান বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা আপার প্রতি আমি চিরঋণী। আমার স্বামীর মৃত্যুর পর তিনি আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। তিনি আমার মেয়ের দায়িত্ব নিয়েছেন এবং প্রতিমাসে মেয়ের খরচের টাকা পাঠাচ্ছেন। পক্ষান্তরে, ঘটনার পর অনেকেই পাশে দাঁড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিলেও পরে আর কেউ খোঁজ নেয়নি।

এদিকে পাটুরিয়া ঘাট সংলগ্ন রূপসা গ্রামে শহীদ রফিকুল ইসলামের পৈতৃক বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় নিস্তব্ধতার ছাপ। একমাত্র উপার্জনক্ষম ছেলেকে হারানোর শোক আর ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তা প্রতিনিয়ত কুরে কুরে খাচ্ছে বাবা-মাকে। শহীদ রফিকের মা চায়না বেগম ছেলের স্মৃতি আঁকড়ে ধরে কেঁদে ব্যাকুল হয়ে বলেন, “একটিমাত্র ছেলে ছিল আমার। ও নাই-ভাবলেই বুকটা ফেটে যায়। মনে হয় এখনো ও এসে আমাকে ‘মা’ বলে ডাকছে। আমার ছেলে হত্যার বিচার না দেখে আল্লাহ যেন আমার মৃত্যু না দেন।” শহীদ রফিকের কৃষক বাবা রহিজ উদ্দিন বলেন, ছেলের মৃত্যুর পর কোনো কাজেই আর মন বসে না। নিজেকে বোঝাতে পারি না যে, ছেলে আর নেই। বাবা হয়ে সন্তানের লাশ কাঁধে নিতে হয়েছে-এর চেয়ে বড় যন্ত্রণার আর কিছু হতে পারে না। এই কষ্টের বোঝা আমাকে আমৃত্যু বইতে হবে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন