জুলাই অভ্যুত্থান একটি গণতান্ত্রিক বিপ্লব। এই বিপ্লবের সূচনা হয়েছিল দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে। স্বৈরাচার শেখ হাসিনা তিনটি একতরফা নির্বাচন করে জনগণকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করেছিল। দীর্ঘ ১৭ বছর ধরেই এই ক্ষোভ দানা বাঁধতে থাকে। যার বহিঃপ্রকাশ ঘটে কোটা আন্দোলনের মাধ্যমে। সফল জুলাই অভ্যুত্থানে পতন হয় দীর্ঘদিনের ফ্যাসিবাদী শাসনের। এই সফলতার ক্রেডিট একা কারও নয়, অভ্যুত্থানে অংশ নেয়া প্রতিটি মানুষের। জুলাই অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে মানবজমিনকে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও বিএনপি’র সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। দীর্ঘদিন ধরে বিএনপি’র দপ্তরের দায়িত্ব পালন করা দলটির এই সিনিয়র নেতা জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে গণতান্ত্রিক বিপ্লব বলে আখ্যায়িত করেন।
তিনি বলেন, এটা ১৭ বছরের যে গণতান্ত্রিক সংগ্রাম। যার শুরু হয়েছিল দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে। পরবর্তীতে ২০১৮ সাল থেকে তারেক রহমানের নেতৃত্বে গণ-আন্দোলনটা তীব্র হয়। কিন্তু শেখ হাসিনা নিষ্ঠুরভাবে সেই আন্দোলন দমনের চেষ্টা করেছেন, এর মধ্যে দিয়ে জনগণের মধ্যে ক্ষোভ, বিক্ষোভ দানা বাঁধতে থাকে। এটারই বহিঃপ্রকাশ হচ্ছে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান। সুতরাং এটা ১৭ বছরের গণতান্ত্রিক যে সংগ্রামগুলো হয়েছে, নানা ইস্যুতে নানা বিষয়ে-প্রত্যেকটিতেই ছিল নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করা। এটা যেতে যেতে ছাত্রদের কোটা সংস্কার আন্দোলন, এই আন্দোলন যুক্ত হয়েছে, যুক্ত হয়ে এটা একদফার আন্দোলন হয়ে ফ্যাসিবাদের পতন ঘটেছে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ক্রেডিট আন্দোলনে অংশ নেয়া সবার মন্তব্য করে রিজভী বলেন, মূল ক্রেডিট তো কিছু নেই। মূল ক্রেডিট সবার, যারা গণতান্ত্রিক আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছেন-বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সাধারণ ছাত্রছাত্রী, স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রী, শ্রমিক, রিকশাওয়ালা- এটা হচ্ছে সবারই রক্তস্নাত আন্দোলনের মধ্য দিয়ে তাদের জীবন উৎসর্গ করার মধ্য দিয়ে এই আন্দোলনটা পরিণতি লাভ করেছে। সুতরাং এখানে যারা অংশগ্রহণ করেছেন, প্রত্যেকেরই এখানে কৃতিত্ব রয়েছে।
তিনি বলেন, আমি সেই আন্দোলনের একজন শরিক কর্মী ছিলাম, এটাই আমার গর্ব। আমি কোনো ক্রেডিট নিতে চাই না, আমি এটা নিয়ে কোনো ধরনের বাগাড়ম্বর করতে চাই না। তবে আমি ওইটুকু গর্ব করি যে, আমি এই আন্দোলনের সঙ্গে থাকতে পেরেছি। সেটাই হচ্ছে আমার একমাত্র গৌরব। আর অন্য কোনো গৌরব নাই। আমি এই আন্দোলনের বড় অবদান রেখে ফেলেছি, সেটা আমি বলবো না। তবে আমি এই আন্দোলনের সঙ্গে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছি।
রিজভী জানান, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে বিএনপি এবং এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের প্রায় ৪৫০ জনের মতো। তার মধ্যে ছাত্রদলের প্রায় ১৪২ জন। আর শ্রমিক দলের আছে প্রায় ৯৫ জনের মতো। আর আহতদের পুনর্বাসন ও চিকিৎসার কার্যক্রম দলীয় অব্যাহতভাবে চলেছে। ৫ই আগস্টের পর থেকে ‘আমরা বিএনপি পরিবার’ একটা সংগঠন তৈরি করে বিএনপি’র চেয়ারম্যান এই সংগঠনের অন্তর্ভুক্ত সদস্যদেরকে ঢাকা শহরসহ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে তিনি পাঠিয়েছেন। সুতরাং প্রতিনিয়ত তিনি খোঁজ নিয়েছেন এবং এই সংগঠনের মাধ্যমে নানা ধরনের সাহায্য ও সহযোগিতা করেছেন। তখন তো আমরা বিরোধী দলে ছিলাম। সরকার যতটুকু যা করার নানাভাবে করেছেন।
৫ মাসে একটি সরকারের সফলতা ও বিফলতা নির্ণয় করা যায় না মন্তব্য করে রিজভী বলেন, ১২ই ফেব্রুয়ারির পর থেকে গণতান্ত্রিক সরকার গঠিত হয়েছে। এই ৫ মাসে একটি সরকারের সফলতা ও বিফলতা নির্ণয় করা যায় না। এটা সময়ের সঙ্গে স্পষ্ট হবে যে সরকার কতোটুকু সার্থক হয়েছে। তবে এই ৪-৫ মাসে সরকার পরিচালনায় যে সহনশীলতার উদাহরণ তৈরি করেছে আমার বিশ্বাস যে, বিএনপি তারেক রহমানের নেতৃত্বে রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক বিকাশ এবং সমাজে গণতন্ত্রের চর্চা তার নেতৃত্বে আরও বেশি সুদৃঢ় হবে। তিনি বলেন, গত ৫ মাসে দেশে গুম ও খুনের ভয় নেই। বিচারবহির্ভূত হত্যার ভয় কেটে গেছে। মানুষ নির্ভয়ে চলাচল করতে পারছে। ব্যাংক থেকে টাকা পাচার হচ্ছে না, ব্যাংক লুট হচ্ছে না এবং গুপ্ত হত্যা থেমে গেছে। ভয়ের যে সংস্কৃতি চালু হয়েছিল, সেটা এখন আর নেই। ৫ই আগস্টের পর এটা একটা বড় অর্জন।
ঘুষ ও দুর্নীতির সঙ্গে কেউ জড়িত থাকলে রেহাই পাবে বলে সাফ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা বলেন, ঘুষ, দুর্নীতি বা লুটপাট যেটাই বলি না কেন, যেহেতু গণতন্ত্রের চর্চা আছে, গণতন্ত্রের আরেকটি অপরিহার্য শর্ত হচ্ছে গণমাধ্যম। কিন্তু গণমাধ্যমের তো চোখ এড়ায় না। সুতরাং কোনো গণতান্ত্রিক সরকারই ঘুষ ও দুর্নীতি এটাকে অ্যাড্রেস না করে পারবে না, কারণ এটার বিষয়ে তাকে পদক্ষেপ গ্রহণ করতেই হবে। সেই ক্ষেত্রে ইতিমধ্যে সরকারের এবং রাষ্ট্রের দ্বারা যে সমস্ত জায়গায়, যেখান থেকে ঘুষের কথা, দুর্নীতির কথা বা যেকোনো বিষয়ের কথা উঠেছে, অভিযোগ এসেছে, সেগুলো সরকার খতিয়ে দেখেছে, প্রধানমন্ত্রী খতিয়ে দেখেছেন এবং প্রধানমন্ত্রী এগুলোর বিষয়ে একবারে জিরো টলারেন্স দেখাচ্ছেন। কেউ এর সঙ্গে ইনভলভ হলে রেহাই পাবে না বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস।
গণ-অভ্যুত্থানের শক্তিগুলো বিভক্ত নয় দাবি করে রিজভী বলেন, এখন একটি গণতান্ত্রিক চর্চার মধ্যে আমাদের সবাইকে থাকতে হবে। এখানে সরকারি দল আলোচনা করবে, তারা নীতি প্রণয়ন করবে, সেটা বাস্তবায়ন করবে। সেটার ভুল ও ত্রুটি আলোচনা করবে বিরোধী দল। এটাই হচ্ছে গণতন্ত্রের নিয়ম। সেই ক্ষেত্রে কেউ যদি মাত্রার বাইরে গিয়ে ব্যক্তিগত আক্রমণ, কুৎসা রটানো, অসভ্য কথা বলা- এগুলো নিয়ে যদি ব্যস্ত থাকে- এগুলো তো শেখ হাসিনার কাজ। শেখ হাসিনা এই সমস্ত দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। সেখান থেকে সরে আসতে হবে এবং সত্যিকার অর্থেই যে অ্যাকাউন্টেবল, বিরোধী দলও জনগণের কাছে অ্যাকাউন্টেবল। বিরোধী দল যদি লাগামহীন, খাপছাড়া এবং তাদের সীমা অতিক্রম করে, তাহলে তাদেরও জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হবে; বরং সেটি না করে বিরোধী দলের উচিত হবে যে, গঠনমূলক সমালোচনা করা এবং সেই ক্ষেত্রে সেটা তীব্র সমালোচনা হতে পারে, সেটা কঠোর সমালোচনা হতে পারে। কিন্তু সেটা ঘৃণা ছড়ানো, কুৎসা রটানো নয়।
গণ-অভ্যুত্থানের পক্ষের শক্তিগুলোর যে সংঘর্ষ হচ্ছে তা মীমাংসা হয়ে গেছে দাবি করে রিজভী বলেন, এটা আমি মনে করি বড় সংঘর্ষ কিছু নয়। স্থানীয় পর্যায়ে এই সংঘর্ষগুলো হয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে ওইসব মীমাংসা হয়ে গেছে। এটা জাতীয় বিষয় না যে, কাউকে মদত দিয়ে বা উস্কানি দিয়ে এই কাজগুলো করানো হচ্ছে। কর্মীদের মধ্যে, তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে এরকম উস্কানিমূলক কেউ বক্তব্য রাখলে, পরে সেখানে একটা পাল্টা প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। এরকম টুকটাক হয়েছে হবিগঞ্জে ও সিলেটে। আমি মনে করি না যে, এগুলো কোনো পক্ষেরই বাড়তে দেয়া উচিত। যারা উস্কানিমূলক কথা বলছেন, যারা ঘৃণা ছড়াচ্ছেন, যারা একটি দলের প্রধান নেতৃত্বের বিরুদ্ধে এবং তাদের পরিবারের বিরুদ্ধে অশ্রাব্য ভাষায়, নোংরা কথা বলছেন- সেটাও তাদের পরিহার করা উচিত।
