নিহতদের পরিবারে ক্ষোভ বাড়ছে

কুমিল্লায় জুলাই আন্দোলন

নিহতদের পরিবারে ক্ষোভ বাড়ছে

ফন্ট সাইজ:

২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ঘটনায় কুমিল্লা বিভিন্ন থানায় ৪২টি মামলা হয়। এর মধ্যে ১২টি হত্যা মামলা। এ ছাড়া হত্যাচেষ্টা, অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর ও অস্ত্র বিস্ফোরকসহ বিভিন্ন অভিযোগ মামলা ৩০টি। এসব মামলায় আসামি প্রায় ৩ হাজার ৫৬৫ এবং অজ্ঞাত আসামি প্রায় সাড়ে ৬ হাজার। ময়নাতদন্ত হয়নি রাফসান ও সাব্বিরের মরদেহের। পুলিশ বলছে, ‘দীর্ঘ প্রায় দুই বছর আদালতে দুটি হত্যা মামলার অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করা হয়েছে।’ তদন্ত ঝুলছে আরও ৪০টি মামলার। এতে হতাশা ও ক্ষোভ বাড়ছে নিহতদের পরিবারের। তবে তদন্ত সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন ‘প্রতিটি মামলা গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত চলছে। অধিক আসামি হওয়ায় তাদের বিষয় তথ্য ও পর্যাপ্ত সাক্ষ্য প্রমাণ না পাওয়ায় তদন্ত জটিলতার মুখে পড়তে হয়েছে। তাই তদন্ত প্রক্রিয়ায় কিছুটা সময় লাগছে।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, দুটি হত্যাসহ ১৮টি মামলা হয়েছে কোতোয়ালি মডেল থানায়।

এসব মামলায় সদর আসনের সাবেক এমপি আ ক ম বাহাউদ্দিনকে আসামি করা হয়েছে। মামলার মধ্যে গুলিতে নিহত আইনজীবী আবুল কালাম হত্যা মামলায় গত বছরের আগস্টে সাবেক এমপি আ ক ম বাহাউদ্দিনসহ ৩৫ জনকে অভিযুক্ত করে চার্জশিট দিয়েছে পুলিশ। এ থানায় দায়ের করা ময়নামতি এলাকার একটি হোটেলের কর্মচারী হবিগঞ্জের মামুন আহমেদ রাফসান (১৮) হত্যার ঘটনায় তার মরদেহের ময়নাতদন্ত করা হয়নি। কোতোয়ালি মডেল থানার ওসি তৌহিদুল আনোয়ার বলেন, প্রতিটি মামলায় অনেক আসামি। তাই ঘটনার সাক্ষ্য প্রমাণসহ অন্যান্য তথ্য বের করতে হচ্ছে, তাই চার্জশিট দিতে বিলম্ব হচ্ছে। নিহত রাফসানের পরিবার আগ্রহী না হওয়ায় তার মরদেহ কবর থেকে তুলে ময়নাতদন্ত হয়নি।

এ মামলার বাদী নিহত রাফসানের বড় ভাই রানু মিয়া বলেন, ‘মামলা করার সময় কুমিল্লা গিয়েছিলাম। পরে আর যাওয়া হয়নি। সাক্ষী
দিতে পুলিশও যোগাযোগ করেনি। ঘটনার ১০ মাস পর গত বছরের ২৮শে মে মামলা করি। এত দেরি হওয়ায় ভাইয়ের ময়নাতদন্ত করতে পরিবার থেকে রাজি হইনি। পুলিশের পরিসংখ্যান অনুসারে
জুলাই আন্দোলনের অপর মামলাগুলোর মধ্যে দাউদকান্দি মডেল থানায় ৩টি হত্যাসহ ৪টি মামলা, দেবিদ্বার থানায়ও ৩টি হত্যা মামলাসহ ৪টি, সদর দক্ষিণ মডেল থানায় ১টি হত্যাসহ ৬টি, বরুড়া, নাঙ্গলকোট ও চান্দিনা মডেল থানায় একটি করে হত্যা মামলা। এর মধ্যে বরুড়া থানায় একটি হত্যা মামলার চার্জশিট হয়েছে। এ ছাড়াও চান্দিনা, মনোহরগঞ্জ, বুড়িচং ও বাংগরা বাজার থানায় রয়েছে হত্যাচেষ্টার আরও ৭টি মামলা। জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ সদর দক্ষিণ উপজেলার আলোচিত মাছুম হত্যাসহ ৪টি মামলা তদন্ত করছে।

দেবিদ্বার উপজেলা সদরে গুলিতে নিহত হন স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা আবদুর রাজ্জাক রুবেল (৩৫)। এ ঘটনায় স্থানীয় বিএনপি নেতা আবুল কাশেম আদালতে মামলা করেন। একই ঘটনায় থানায় আরেকটি মামলা করেন নিহতের মা হাছনা আরা বেগম। এসব মামলায় স্থানীয় সাবেক এমপি রাজী মোহাম্মদ ফখরুল, আবুল কালামসহ ১৪০ নেতাকর্মীকে আসামি করা হয়েছে। নিহত রুবেলের স্ত্রী হ্যাপী আক্তার বলেন, তার স্বামী বিএনপি করতেন। প্রথম দিকে বিএনপি নেতারা খোঁজখবর নিলেও এবার কোরবানির ঈদে বিএনপি’র কেউ খোঁজ নেয়নি। রুবেলের মৃত্যুর পর (৯ই সেপ্টেম্বর) জন্ম নেয়া ছেলে আবদুল্লাহ আল রায়ানের বয়স এখন প্রায় দুই বছর। তার ভাষ্য মামলার তদন্ত কি পর্যায়ে আছে তা পুলিশ বলছে না। স্বামী হত্যায় জড়িতদের তিনি বিচার দাবি করেন। অপর ঘটনায় দেবিদ্বার উপজেলা সদরে মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান সাব্বির (১৮)। এ ঘটনায় তার মামা নাজমুল হাসান বাদী হয়ে দেবিদ্বারের সাবেক দুই এমপিসহ ৯৯ জনকে আসামি করে একটি মামলা দায়ের করেন। তবে মামলার তদন্ত জটিলতায় পড়েছে পুলিশ। ওই ঘটনায় পুলিশ আদালতে আবেদন করেও ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ কবর থেকে উত্তোলন করতে পারেনি।

দেবিদ্বার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান বলেন, আমরা (পুলিশ) আদালতে একাধিক আবেদন করেও পরিবার রাজি না থাকায় ময়নাতদন্ত করতে পারিনি, মামলা চলছে। আন্দোলন চলাকালে সদর দক্ষিণ নিহত মাছুম মিয়ার হত্যা ঘটনায় জেলায় প্রথম হত্যা মামলা হয়। বিলম্ব চার্জশিট নিয়ে হতাশা প্রকাশ করছেন মাছুম মিয়ার বাবা শাহীন মিয়া। তিনি বলেন, ‘ঘটনার পর ভয়ে মামলা করিনি, তখন বিএনপি নেতারা মামলা করেন, আমি থানায়ও যাইনি। আসামি কারা তা আমি পরে জেনেছি এবং পুলিশের কাছে সাক্ষ্য দিয়েছি। আমার ছেলেকে যারা হত্যা করেছে সকলের বিচার চাই। জুলাই আন্দোলন দাউদকান্দিতে নিহত হন স্কুলছাত্র রিফাত হাসান (১৭), দিনমজুর বাবু মিয়া (২৩) ও অটোরিকশাচালক সুলতান আহমেদ। ৩টি মামলা হত্যা মামলার তদন্ত অগ্রগতির বিষয় থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাজ্জাদুর রহমান মামলার গুলির তদন্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ, ভিডিও ফুটেজসহ বেশ কিছু প্রমাণ সংগ্রহ করা হয়েছে। তদন্ত শেষ পর্যায়ে আছে। তদন্ত সংশ্লিষ্ট পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, অধিকাংশ মামলায় ঢালাও আসামি থাকায় অধিকাংশ মামলার বাদী আসামি চেনেন না, জানেন না ঘটনার বিবরণ।

তাই তদন্ত পাওয়া যাচ্ছে না যথাযথ সাক্ষী। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা নিয়েও অনেক আসামির ঘটনাস্থলে উপস্থিতি নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান বলেন, ‘স্পর্শকাতর এই মামলাগুলোর সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে পুলিশ নিবিড়ভাবে কাজ করছে। দুটি মামলার চার্জশিট হয়েছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে বাকি মামলাগুলোরও তদন্ত শেষ করে আদালতে চার্জশিট জমা দেয়া হবে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন