সাভার-আশুলিয়ায় জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবারের স্বজনরা বিচারের অপেক্ষায়। জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে এখানে ৭১ জন শহীদ হয়েছেন। আহত হয়েছেন কয়েক হাজার। তাদের মধ্যে ৫ শতাধিক মানুষ হারিয়েছেন কর্মক্ষমতা। আন্দোলনের শেষ পর্যায়ে সাভার-আশুলিয়া হয়ে ওঠে গণহত্যার হটস্পট। গণ-আন্দোলনের দুই বছর পূর্ণ হলেও এখনো শেষ হয়নি তদন্ত। কান্না থামেনি শহীদ পরিবারের। কবে পাবেন বিচার- এমন আক্ষেপে দিন কাটছে স্বজনদের। সাভারের প্রথম শহীদ শাইখ আসহাবুল ইয়ামিন ও আশুলিয়ায় ৬ জনকে পুড়িয়ে মারার ঘটনা ছিল দেশ-বিদেশে ব্যাপক আলোচিত। মামলা দু’টির তদন্ত চলছে। ২০২৪-এর ১৮ই জুলাই বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের কমপ্লিট শাটডাউন কর্মসূচিতে
উত্তাল সাভার ও আশুলিয়ার রাজপথ।
ছাত্রদের ডাকা অবরোধে সেদিন অংশ নিয়েছিলেন বিভিন্ন প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসহ সাধারণ জনতা। তখন নির্বিচারে ছাত্র-জনতাকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়লে সাভারে পুলিশের গুলিতে প্রথম শহীদ হন রাজধানীর মিরপুরের মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির (এমআইএসটি) কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী শাইখ আসহাবুল ইয়ামিন। গুলি করে হত্যার পর আধমরা দেহ পুলিশের সাঁজোয়া যানে ঘুরিয়ে আন্দোলনকারীদের মধ্যে ভয় সৃষ্টির একপর্যায়ে বর্বরভাবে নিক্ষেপ করা হয় ঢাকা-আরিচার রাজপথে। সেই দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিক্ষোভে ফেটে পড়েন আন্দোলনকারীরা। এদিন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর চড়াও হয় পুলিশ এবং আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীরা।
পিস্তল, লাঠি, হকিস্টিক ও দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে সরকারদলীয় কর্মীরা মহাসড়কে আন্দোলনবিরোধী স্লোগান দিলে শুরু হয় তীব্র ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও ত্রিমুখী সংঘর্ষ। পাকিজা সংলগ্ন সাভার মডেল মসজিদ এলাকা রূপ নেয় রণক্ষেত্রে। মুহুর্মুহু গুলির শব্দ আর টিয়ারশেলের ধোঁয়ায় অন্ধকার হয়ে আসে চারপাশ। গুলিবিদ্ধসহ আহত হন শতাধিক শিক্ষার্থীসহ আন্দোলনকারী। ইয়ামিনসহ দেশব্যাপী যখন আরও শহীদের সংখ্যা বাড়তে থাকে, তখন শুরু হয় শেখ হাসিনার পদত্যাগের একদফা দাবিতে আন্দোলন। এ আন্দোলনে যোগ দেন শিক্ষক, অভিভাবক, রিকশাওয়ালাসহ সাধারণ মানুষ। ইয়ামিনের বাবা সাবেক ব্যাংক কর্মকর্তা মো. মহিউদ্দিন বলেন, ছেলের অনেক স্মৃতি মনে পড়ে। আমার ছেলে তো শহীদ, তাই আমি তাকে গোসল ছাড়াই দাফন করেছি। আপনারা সবাই আমার ছেলের জন্য দোয়া করবেন। ছেলে হত্যার বিচার চেয়ে তিনি বলেন, আমি আমার ছেলে হত্যার বিচার চাই।
ঘাতকের বুলেটের আঘাতে যেন আর কোনো বাবা-মায়ের কোল খালি না হয়। আর যেন কোনো বাবা-মা এভাবে আমার মতো কষ্ট না পায়। আমার ছেলে রাজনীতিকে পছন্দ করতো না। আমার শ্বশুর একজন মুক্তিযোদ্ধা। সেই হিসেবে আমার ছেলেও একজন মুক্তিযোদ্ধার নাতি হিসেবে কোটা সুবিধা ভোগ করতে পারতো। কিন্তু সে চেয়েছে ছাত্রদের মধ্যে কোনো বৈষম্য না থাকুক। সে তার আহত বন্ধুদের নিয়ে খুব চিন্তিত এবং বিমর্ষ থাকতো। আর সেজন্যই সে সেদিন তার আহত বন্ধুদের বিচারের দাবি নিয়ে রাস্তায় নেমেছিলেন।
মায়ের কষ্ট দূর করতে চেয়েছিলেন নাফিসা: গাজীপুরের টঙ্গীর নাফিসা হোসেনের বয়স ছিল ১৯ বছর। উচ্চমাধ্যমিকের পরীক্ষার্থী ছিলেন। পড়তেন টঙ্গীর সাহাজউদ্দিন সরকার উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ে।
কোটা সংস্কার আন্দোলন যখন সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছড়িয়ে পড়ে, তখন নাফিসা ও তার কয়েকজন বান্ধবী মেসেঞ্জারে গ্রুপ খুলে আলোচনা করে প্রতিদিন রাস্তায় বের হতো। রাজপথে নেতৃত্ব দিতো নাফিসা। নাফিসার বাবা চা দোকানদার। পরিবার নিয়ে থাকেন টঙ্গীতে একরুমের ছোট্ট ভাড়া বাসায়। বাসা থেকে একটু দূরে দোকান। প্রতিদিন ভোরে চলে যান দোকানে, ফেরেন রাত ১০-১১টায়। বাবা বাসায় ফেরার আগেই নাফিসা চলে আসতো বলে আন্দোলনে যাওয়া নিয়ে কিছুই জানতেন না নাফিসার বাবা। এরপর স্কুল বন্ধের অজুহাতে বাবার নিষেধ অমান্য করে সাভারে মামার বাসায় বেড়াতে আসে নাফিসা। সাভারে এসে ৩রা আগস্ট থেকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বয়কদের সঙ্গে আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন নাফিসা হোসেন মারওয়া (১৯)। ৫ই আগস্ট সকালে সাভারে মামার বাসা থেকে বেরিয়ে আন্দোলনে যোগ দেন তিনি। বিকালে সাভার মডেল মসজিদ এলাকায় গুলিবিদ্ধ হলে হাসপাতালে নেয়ার পর তার মৃত্যু হয়। সেদিন রাত ৯টায় প্রথম জানাজা শেষে মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় টঙ্গীতে নিজেদের এলাকায়।
এরশাদনগরে পৈতৃক ভিটা-মাটিতে দাফন করা হয় নাফিসাকে। নাফিসার মা কুলসুম বেগম (৪৪) কুয়েতে পরিচ্ছন্নতাকর্মীর কাজ করেন। নাফিসা তার দ্বিতীয় সন্তান। প্রথম সন্তান ছেলে, জন্মের পরপরই মারা যায়। নাফিসার ছোট বোন সাফা হোসেন রাইসা সপ্তম শ্রেণিতে পড়েন। নাফিসার বাবা আবুল হোসেন (৫৪) ও তিনি আলাদা থাকতেন। নাফিসার বাবা আরেক স্ত্রী ও সন্তান নিয়ে টঙ্গীতে থাকেন। ছোট বোন সাফা মামার বাড়িতে থাকলেও নাফিসা মামা ও বাবা দুজনের বাড়িতেই আসা-যাওয়া করতেন। মেয়ের কথা বলতে গিয়ে অঝোরে কাঁদছিলেন মা কুলসুম। বলেন, প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে দেখতাম মেয়ে মুঠোফোনে মেসেজ দিয়ে রাখছে। দুপুরে কল দিতো। এখন সেই সময়গুলো আর নেই শুধু মনের ভেতর হাহাকার লাগে। মেয়েটা বলতো, মা, আমি বড় হয়ে তোমার সব কষ্ট দূর করবো। একই মিছিলে অংশ নিয়ে পুলিশের গুলিতে শহীদ হয়েছিল মো. শ্রাবণ গাজী (২০)। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন আশুলিয়ার গেরুয়া এলাকার মো. মান্নান গাজী ও শাহনাজ বেগম দম্পতির একমাত্র ছেলে।
দুই ভাইবোনের মধ্যে শ্রাবণ ছিল বড়। শহীদ শ্রাবণ গাজীর বাবা মান্নান গাজী বলেন, আমার ছেলে মালয়েশিয়ায় পড়তো। ইয়ামিন নিহতের খবর দেখে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে যোগ দিতে এবং স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করার জন্য সে চলে আসে। আন্দোলনের সময় প্রতিদিন রাতে বাসা থেকে বের হতো, এভাবেই চলছিল। ৫ই আগস্ট লংমার্চ টু ঢাকায় যোগ দেয়ার জন্য রওনা হয়ে সাভার নিউমার্কেটের সামনে আসলে স্বৈরাচার সরকারের পুলিশ বাহিনী ও আওয়ামী লীগের গুন্ডা বাহিনী এলোপাতাড়ি গুলি করে আমার ছেলেকে হত্যা করে। প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমার একটাই দাবি দয়া করে তাদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা হোক।
হাতজোড় করে জীবন ভিক্ষা চেয়েছিলেন: রাজবাড়ীর কালুখালী উপজেলার রতনদিয়া গ্রামের প্রতিবন্ধী কুরবান শেখ (৪৯) সাভার বাজার বাসস্ট্যান্ডের রাজ্জাক কাঁচাবাজারে মুরগির ব্যবসা করতেন।
মাছবাজারের পেছনে ভাড়া বাসায় স্ত্রী শিল্পী খাতুন, ছেলে রমজান শেখ ও মেয়ে মিতু আক্তারকে নিয়ে এক যুগেরও বেশি সময় ধরে বাস করতেন তিনি। পুলিশের গুলিতে নিহত কুরবান শেখের মৃত্যুর ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তার স্ত্রী ও সন্তানেরা। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী কুরবান শেখের মেয়ে মিতু আক্তার বলেন, ‘আমার আব্বুর কী দোষ ছিল? আব্বু শারীরিকভাবে অসুস্থ। সংঘর্ষ দেখে দোকান বন্ধ করে তিনি বাসায় ফিরছিলেন। বারবার দুই হাতজোড় করে জীবন ভিক্ষা চেয়ে আকুতি করেছিলেন পুলিশের কাছে। তিনি সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারেন না, স্বাভাবিকভাবে চলাচল করতেও পারেন না। অসুস্থ বলা সত্ত্বেও তাকে কেন গুলি করে মারলো পুলিশ? আমার আব্বুরে এখন কই পাবো?’
