‘প্রিয়জন হারানোর শূন্যতা পূরণ হওয়ার নয়’

‘প্রিয়জন হারানোর শূন্যতা পূরণ হওয়ার নয়’

ফন্ট সাইজ:

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে গুলিতে নিহত সুনামগঞ্জের তিন তরুণের আত্মত্যাগের দুই বছর পূর্ণ হলেও তাদের পরিবারের বেদনা এতটুকুও কমেনি। কেউ হারিয়েছেন ভাই, কেউ সন্তান আবার কেউ স্বামী। বিচার প্রক্রিয়ায় অগ্রগতি হলেও শহীদ পরিবারের একটাই প্রত্যাশা দ্রুত রায় কার্যকর করে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা। এছাড়া শহীদদের আত্মত্যাগের যথাযথ মূল্যায়ন করা। সূত্রে জানা যায়, সুনামগঞ্জের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ হন জেলার ধর্মপাশা উপজেলার জয়শ্রী ইউনিয়নের দুর্গাপুর গ্রামের মোহাম্মদ হৃদয় মিয়া (২৭)। ২০২৪ সালের ২০শে জুলাই নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে নিহত হন তিনি। পরে তাকে নারায়ণগঞ্জেই দাফন করা হয়। পরিবারের অন্যতম ভরসা হৃদয়ের মৃত্যুর পর স্ত্রী ও দুই শিশুসন্তানকে নিয়ে তার পরিবারটি চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে।

এরপর ৫ই আগস্ট রাজধানীর বাড্ডা এলাকায় বিজয় মিছিলে পুলিশের গুলিতে নিহত হন জামালগঞ্জ উপজেলার ভীমখালী ইউনিয়নের গোলামীপুর গ্রামের সোহাগ মিয়া (২৩)। ছয় ভাই-বোনের মধ্যে তৃতীয় সোহাগ একটি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন। পুরো পরিবারের দায়িত্ব ছিল তার উপর। তার উপার্জনের টাকায়ই চলতো সংসার, ঋণের কিস্তি ও অসুস্থ বাবার চিকিৎসা। একই ঘটনায় তার ছোট ভাই শুভ মিয়াও গুলিবিদ্ধ হন। অর্থাভাবে এখনও তার পা থেকে ছররা গুলি অপসারণ করা সম্ভব হয়নি। ঘটনার পরদিন ৬ই আগস্ট তার মরদেহ গ্রামের বাড়িতে এনে দাফন করা হয়। সোহাগ হত্যার ঘটনায় রাজধানীর বাড্ডা থানায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১৯৩ জনকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়। মামলাটি বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে।

আদালতের নির্দেশে ময়নাতদন্তের জন্য ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে দাফনের প্রায় ১৫ মাস পর সোহাগের মরদেহ কবর থেকে উত্তোলন করা হয়। এদিকে একই দিনে ৫ই আগস্ট গাজীপুরের সফীপুরে আনসার-ভিডিপি একাডেমির সামনে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন মধ্যনগর উপজেলার জলুষা গ্রামের মাদ্রাসা শিক্ষার্থী আয়াতুল্লাহ। তার মৃত্যুতে পরিবার ও এলাকাজুড়ে নেমে আসে শোকের ছায়া। তিন শহীদের পরিবার জানায়, রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও আর্থিক সহায়তা পেলেও প্রিয়জন হারানোর শূন্যতা কখনও পূরণ হওয়ার নয়। তাদের দাবি, বিচারিক কার্যক্রম দ্রুত শেষ করে রায় কার্যকর করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো পরিবারকে এমন বেদনা বহন করতে না হয়। শহীদ সোহাগের বড় ভাই বিল্লাল হোসেন বলেন, বিজয় মিছিলে পুলিশের গুলিতে আমার ভাই মারা যায়। আরেক ভাই শুভর পায়ে এখনও গুলি রয়েছে। জেলা প্রশাসন থেকে সোহাগের কবর পাকা করে নামফলক স্থাপনের কথা বলা হয়েছিল, কিন্তু তা বাস্তবায়ন হয়নি। পরে এলাকাবাসী ও নিজেদের অর্থায়নে আমরা কবরটি পাকা করেছি।

জুলাই ফাউন্ডেশন থেকে ৩০ লাখ টাকা সহায়তা পেয়েছি। আমার ভাইয়ের হত্যার বিচার চেয়ে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মামলা করেছি। আমি সেই বিচারের বাস্তবায়ন দেখতে চাই। শহীদ হৃদয়ের স্ত্রী শিরিনা আক্তার বলেন, আমার দুই শিশুসন্তান এখনও তাদের বাবার জন্য অপেক্ষা করে। তাদের নিয়ে অনেক কষ্টে দিন পার করছি। পরিস্থিতি অনুকূলে না থাকায় আমার স্বামীকে ধর্মপাশা না নিয়ে তড়িঘড়ি করে নারায়ণগঞ্জে দাফন করা হয়। তিনি বলেন, আমি তেমন সরকার থেকে সহযোগিতা বা অনুদান পাইনি। সিলেট বিভাগীয় ‘জুলাই-২৪ শহীদ পরিবার সোসাইটি’র সভাপতি এবং শহীদ আয়াতুল্লাহর বড় ভাই সোহাগ বলেন, আমার সামনেই আমার ছোট ভাইকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

পরে তাঁর মরদেহ গুম করা হয়। শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার ১১ দিন পর ভাইয়ের মরদেহ উদ্ধার করে রাত ১১টার দিকে মধ্যনগর নিজ গ্রামে দাফন করি। ২০২৪ সালের ২৮ আগস্ট সরকারি গেজেটে নামকরণের জন্য আবেদন করা হলেও এখনও সেটির কোনো অগ্রগতি হয়নি। বারবার সংশ্লিষ্ট দপ্তরে গিয়েও কোনো সুফল পাইনি। তিনি আরও বলেন, সিলেট বিভাগের ৩২ জন শহীদের মধ্যে সুনামগঞ্জের তিন শহীদের কবর এখনও পাকা করা হয়নি এবং নামফলকও স্থাপন করা হয়নি। জুলাই ফাউন্ডেশনের অনুদান পাওয়ার পর থেকে আর কেউ আমাদের খোঁজ নেয়নি।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন