দুই বছর পরও ফারহান ফাইয়াজের ঘরে থেমে আছে সময়

দুই বছর পরও ফারহান ফাইয়াজের ঘরে থেমে আছে সময়

ফন্ট সাইজ:

আমার ফারহান ফাইয়াজকে ওরা মেরে ফেলেছে, ও তো ১৮ বছরও পার করেনি। ২০২৪ সালের ১৮ই জুলাই বিকালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ফেসবুক পোস্টে ফারহান ফাইয়াজের ফুপুর এই বুকফাটা আর্তনাদ মুহূর্তেই আলোড়ন তোলে দেশ জুড়ে। একটি পরিবারের অসহনীয় শোক ছুঁয়ে যায় অসংখ্য মানুষকে। সেই সময়ের আন্দোলন, সংঘর্ষ ও প্রাণহানির ঘটনাগুলো দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় গভীর প্রভাব ফেলে। দুই বছর কেটে গেছে। ক্যালেন্ডারে নতুন দিন এসেছে, ঋতু বদলেছে, কিন্তু ফারহানের পরিববারে সময় যেন থেমে আছে ২০২৪ সালের ১৮ই জুলাইয়ে। ফারহানের ঘরে আজও যত্নে রাখা আছে বই, পড়ার টেবিল, প্রিয় জিনিসপত্র আর অসংখ্য স্মৃতি।

মোহাম্মদ ফারহানুল ইসলাম ভূঁইয়া সবার কাছে ফারহান ফাইয়াজ। ২০০৬ সালের ১২ই সেপ্টেম্বর নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার বরপা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা শহীদুল ইসলাম ভূঁইয়া, মা ফারহানা রহমান দিবার একমাত্র ছেলে। ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজের বিজ্ঞান বিভাগের মেধাবী শিক্ষার্থী ছিলেন। ২০২৫ সালে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়ার কথা ছিল। স্বপ্ন ছিল বিজ্ঞানী কিংবা জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ার হয়ে দেশের মানুষের জন্য কাজ করার। স্বপ্নগুলো আর পূরণ হয়নি। মৃত্যুর আগে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টের পরিচিতিতে ইংরেজিতে লিখেছিলেন-ঙহব ফধু ুড়ঁ যধাব ঃড় ষবধাব ঃযরং ড়িৎষফ. ইঁরষফ ংঁপয ধ ষরভব ঃযধঃ ঢ়বড়ঢ়ষব রিষষ ৎবসবসনবৎ ুড়ঁ ধভঃবৎ ুড়ঁৎ ফবধঃয. বাংলায় যার অর্থ- ‘একদিন পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হবে। এমন জীবন গড়ো, যাতে মৃত্যুর পর মানুষ তোমাকে মনে রাখে।’ তখন হয়তো এটি ছিল একজন কিশোরের জীবনদর্শন। আজ সেটিই হয়ে উঠেছে তার পরিচয়ের সবচেয়ে শক্তিশালী বাক্য। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, আন্দোলনের দিন মা বারবার তাকে বাইরে যেতে নিষেধ করেছিলেন। চারদিকে উত্তেজনা, সংঘর্ষ আর অনিশ্চয়তার খবর শুনে উদ্বিগ্ন ছিলেন তিনি।

কিন্তু সহপাঠীদের পাশে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেননি ফারহান। ধানমণ্ডির ২৭ নম্বর এলাকায় সংঘর্ষের মধ্যে তিনি গুলিবিদ্ধ হন। সহপাঠীরা দ্রুত তাকে লালমাটিয়ার একটি হাসপাতালে নিয়ে গেলেও চিকিৎসকরা তাকে বাঁচাতে পারেননি। সেদিন রাতেই রূপগঞ্জের বরপা সামাজিক কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয় তাকে। দুই বছর পরও প্রায় প্রতিদিন ছেলের কবরের পাশে গিয়ে দাঁড়ান বাবা শহীদুল ইসলাম ভূঁইয়া। কথা বলতে গিয়ে বারবার থেমে যান। তিনি বলেন, আমি কাঁদলে আমার স্ত্রী আর মেয়ে আরও ভেঙে পড়ে। তাই অনেক সময় কাঁদতেও পারি না। মা ফারহানা রহমান দিবা আজো ছেলের ব্যবহৃত অনেক জিনিস আগের জায়গাতেই রেখে দিয়েছেন। তিনি বলেন, আমার ছেলের স্বপ্ন ছিল বিজ্ঞানী হওয়া, দেশের জন্য কাজ করা। উচ্চ শিক্ষার জন্য গ্রাম ছেড়ে শহরে উঠেছিলাম। সেই শহরের রাস্তায় পড়েছিল আমার ছেলের রক্তমাখা দেহ। ছোট বোন ফারিনের কাছে ভাই শুধু একটি স্মৃতি নয়, প্রতিদিনের শূন্যতা। বাবা শহীদুল ইসলাম স্মৃতিচারণ করে বলেন, মৃত্যুর আগের রাতেও সবকিছু ছিল একেবারে স্বাভাবিক।

ফারহান অনলাইনে পিৎজা অর্ডার করেছিল। তিনি নিজেই দরজা খুলে খাবারটি নিয়ে ছেলের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। কে জানতো, সেটিই হবে বাবা-ছেলের শেষ রাতের স্মৃতি। ফারহানের স্মৃতি ধরে রাখতে ধানমণ্ডির পুরোনো ২৭ নম্বর সড়কের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয়েছে ‘শহীদ ফারহান ফাইয়াজ সড়ক’। রূপগঞ্জের বরপা এলাকার একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নামও করা হয়েছে তার নামে। তবে বাবা শহীদুল ইসলামের কাছে স্মৃতিফলকের চেয়ে বড় বিষয় হলো ছেলের স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখা। সেই লক্ষ্যেই তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘ফারহান ফাইয়াজ স্মৃতি ফাউন্ডেশন’। এই ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে বেকার তরুণ-তরুণীদের জন্য একটি ভোকেশনাল প্রশিক্ষণ কেন্দ্র পরিচালনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তিনি এই উদ্যোগ এগিয়ে নিতে সরকারি ও বেসরকারি সহায়তা কামনা করেন।

আলাপচারিতায় শহীদুল ইসলাম জানান, ২০২৪ সালের ২৮শে জুলাই তাকে ও আরও কয়েকটি শহীদ পরিবারের সদস্যকে গণভবনে ডাকা হয়েছিল। সে সময়ের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, তিনি আর্থিক সহায়তা নিতে নয়, ছেলের হত্যার বিচার চাইতেই সেখানে গিয়েছিলেন। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর সামনে প্রত্যাখ্যান করেছেন অনুদানের অর্থ। তার ভাষায়, আমার জীবনের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য, আমার সন্তানসহ জুলাই আন্দোলনে নিহত সব মানুষের হত্যার বিচার দেখে যাওয়া। বর্তমান বিচারপ্রক্রিয়া নিয়েও তিনি হতাশা প্রকাশ করেন। ফারহান ফাইয়াজের মৃত্যুর ঘটনায় দায়ীদের বিচারের দাবিতে তার পরিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ দায়ের করেছে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন