গুলির সামনে বুক পেতে আবু সাঈদ বিশ্ব কাঁপিয়ে দেন

গুলির সামনে বুক পেতে আবু সাঈদ বিশ্ব কাঁপিয়ে দেন

ফন্ট সাইজ:

আগস্ট মাস ইতিহাসের আর এক নতুন সূচনা। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের দুঃশাসনে অতিষ্ঠ ছাত্র-জনতার আন্দোলনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে মারমুখী হয়ে ওঠে পুলিশ বাহিনী। ব্যাপক সংঘর্ষ, সহিংসতায় ঘটে হতাহতের ঘটনা। লোমহর্ষক ঘটনা ঘটে ২০২৪ সালের ১৬ই জুলাই বিশ্ব কাঁপানো ঘটনা পুলিশের গুলিতে নিহত রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ। আবু সাঈদের রক্তই বিগত আওয়ামী লীগ সরকার ও শেখ হাসিনার পতনের টার্নিং পয়েন্ট ছিল। রংপুরের ইতিহাসে এ ঘটনা ছিল বিশ্ব জুড়ে আলোচিত। মানুষের মনে দিয়েছিল ব্যাপক নাড়া। কোটা সংস্কার আন্দোলনের মহানায়ক, রংপুরের আবু সাঈদ বুক চিতিয়ে পুলিশের গুলি বরণ করার দৃশ্য যেন বৃটিশবিরোধী কৃষক নেতা নুরলদীনের মতো করে বলছিল ‘জাগো বাহে কোনঠে সবায়’।

এরপরই দেশের ছাত্র-জনতা জেগে ওঠে নতুন আশা, নতুন উদ্যমে। শেখ হাসিনার দমননীতি ও রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে হাজার হাজার আবু সাঈদ যখন রাজপথে দাঁড়িয়ে বলে মহা-বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত, আমি সেই দিন হবো শান্ত, যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দল-রোল, আকাশে-বাতাসে ধ্বনিবে না, অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে না-বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত আমি সেইদিন হবো শান্ত! বেজে যায় হাসিনার বিদায় ঘণ্টা। রংপুরে পুলিশের গুলিতে আবু সাঈদ নিহতের পর মারমুখী আন্দোলনে ৪ঠা আগস্ট পর্যন্ত একে একে পুলিশের গুলিতে ছাত্র-জনতাসহ ২৪ জন নিহত হন। পাল্টাপাল্টি বিক্ষুব্ধ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার হাতে রংপুর সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর ও আওয়ামী লীগের হারাধন রায় হারাসহ দলটির ৪ নেতাকর্মী মারা যান। বিক্ষোভে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয় রংপুর মেট্রোপলিটন উপ-পুলিশ কমিশনার ও ডিবি কার্যালয় তাজহাট থানা, আওয়ামী লীগের জেলা ও মহানগর কার্যালয়সহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তর।

যা ছিল ব্যাপক আলোচিত। আবু সাঈদ হত্যা মামলা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার লক্ষ্যে পুলিশের ছলচাতুরি ও কারসাজির কারণে আসামি করা হয় নাবালক শিশু মাহিমকে। যা ব্যাপক সমালোচনা ও তোলপাড়ের সৃষ্টি হয়। এ ঘটনায় রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি ও মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। তৎকালীন কোটা সংস্কার আন্দোলনে জুলাই মাসের ১৬ তারিখ রংপুর ছিল উত্তাল। রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন দমাতে কঠোর অবস্থানে পুলিশ। ‘কোটা না মেধা, মেধা-মেধা’ স্লোগানে মুখরিত নগরীর পার্কের মোড় এলাকা। পুলিশের একাধিকবার লাঠিচার্জ, রাবার বুলেটের সামনে থেকে কিছুটা পিছু হটে শিক্ষার্থীরা।

তখন পরিস্থিতি সম্পূর্ণ পুলিশের নিয়ন্ত্রণে। এমতাবস্থায় শিক্ষার্থীরা অসহায়। হয়তো, এই কোটা সংস্কার রংপুরের আন্দোলনের ইতি এখানেই ঘটতে পারতো। কিন্তু কে জানতো এ আন্দোলনের স্ফুলিঙ্গ এখনো জ্বলা বাকি। বেলা আড়াইটার সূর্যের তাপে উত্তপ্ত হওয়া রাস্তার পিচ দিয়ে হেঁটে আসছে এক তরুণ যুবক। সামনে বন্দুক হাতে পুলিশ। তবুও নেই কোনো ভয়। যুবকটিকে হেঁটে আসতে দেখে সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটের সামনে অবস্থানরত পুলিশ বন্দুক হাতে তৈরি। পুলিশের ১৫ মিটার সামনে গিয়ে নির্ভয়ে দু’হাত প্রসারিত বুক পেতে দাঁড়িয়ে গেল নিরস্ত্র যুবকটি। ‘বুকের ভেতর অনেক ঝড়, বুক পেতেছি গুলি করো’- এ কথাটির বাস্তব উদাহরণ সেদিন দেখেছে রংপুরবাসী। পুলিশের প্রথম ফায়ার গিয়ে লাগলো যুবকটির শরীরে, তবুও সে সরে দাঁড়ালো না। দ্বিতীয়বার বুক পেতে দিলো সে। আবারো পুলিশের গুলি। তবে এবার আর দাঁড়াতে পারলো না সে। কিছুদুর পিছিয়ে সড়কের উত্তপ্ত পিচে পড়ে গেল। সহযোদ্ধারা এগিয়ে এসে দ্রুত নিয়ে গেল হাসপাতালে। কিন্তু বাঁচানো গেল না সেই আবু সাঈদকে। বন্দুকের নলের সামনে দু’হাত প্রসারিত করে বুকে গুলি বরণ করে নেয়ার দৃশ্য গণমাধ্যমে দেখেছে পুরো দেশ পুরো বিশ্ব। আবু সাঈদের বীরত্বপূর্ণ সে দৃশ্য যেন দেশবাসীর রক্তে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিল। জুন-জুলাইয়ের প্রথম পক্ষে রংপুরে বিচ্ছিন্নভাবে কোটা সংস্কার আন্দোলন চললেও ১৬ই জুলাই আবু সাঈদ শহীদের পর ফুঁসে ওঠে রংপুরসহ দেশবাসী।

‘হামার ব্যাটাক মারলু ক্যানে’-এমন ক্ষোভ নিয়ে রাজপথে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগ দেয় বিভিন্ন পেশার মানুষ। তখন এ ছাত্র আন্দোলন হয়ে ওঠে ছাত্র-জনতার আন্দোলন। তৎকালীন ফ্যাসিস্ট স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ সরকারের দুঃশাসনের প্রতিবাদ করতে গিয়ে ১৮ই জুলাই ২০২৪ সালে রাজপথে পুলিশের গুলিতে অটোচালক মানিক মিয়ার মৃত্যু হয়। এ ঘটনার প্রতিবাদে বিক্ষুব্ধ জনতা আওয়ামী কার্যালয়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ, তাজহাট থানা ভাঙচুর, মেট্রোপলিটন ডিবি কার্যালয়ে ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগসহ ব্যাপক সহিংসতার ঘটনা ঘটে। এরপর দিন বেপরোয়া পুলিশের গুলিতে সাজ্জাদ হোসেন (২৯), মোসলেম উদ্দিন মিলন (৩৫), মেরাজুল ইসলাম (৩৭) আর আব্দুল্লাহ আল তাহির (২৮) নিহত হন। প্রিয় মুখের নিথর দেহ থেকে রাজপথে ঝরছিল উষ্ণ রক্ত। আর প্রতিবাদীদের চোখের জল যেন হয়েছিল শ্রাবণের বৃষ্টি। সড়কে পড়ে থাকা জুতা-স্যান্ডেল সাক্ষী দিয়েছিল বৈষ্যমের বিরুদ্ধে তাদের বজ্রকণ্ঠের উচ্চারণ। দাউ দাউ করে জ্বলে উঠেছিল দাবানলের আগুন। ১৮তম বিবাহবার্ষিকীর দিনে স্বামীকে হারান নাজমিন ইসলাম। রংপুর নগরীর জুম্মাপাড়ার বাবার বাড়িতে দুই ছেলে সন্তানকে নিয়ে বসবাস করছেন শহীদ মেরাজুল ইসলামের স্ত্রী নাজমিন।

শ্রমিক মোসলেম উদ্দিনের স্ত্রী দিলরুবা আক্তার বলেন, আমার স্বামীর শহীদ হওয়ার দুই বছর পেরিয়ে গেছে। সবসময় তার কথা মনে পড়ে। তিনি আমাদের মাথার উপরে ছাদ হয়ে ছিলেন। এখন আমার সন্তানকে নিয়ে কীভাবে জীবন পার করবো সেই চিন্তায় রয়েছি। আমি আমার স্বামী হত্যার বিচার চাই। শহীদ সাজ্জাদের মা ময়না বেগম বলেন, আমার ছেলে পুরো সংসার খরচ চালাতো। ছেলে হারানোর শোক আমরা ভুলতে পারি না। সরকারসহ বিভিন্ন মানুষ আমাদের অর্থ দিয়ে সহযোগিতা করেছে। কিন্তু ছেলে হারানোর শূন্যতা কেউ পূরণ করতে পারবে না। রংপুর নগরীর জুম্মাপাড়ার শহীদ আব্দুল্লাহ আল তাহিরের বাবা আব্দুর রহমানের ছেলে হারানোর কষ্টে দিন পার করছেন।

তিনি ছেলে হত্যাকারীদের বিচার দাবি করেছেন। জুলাই আন্দোলনে চোখ হারানো আবেদুল ইসলাম আবেদের জীবন যেন থমকে গেছে। ছেড়ে গেছেন স্ত্রী-সন্তানও। একমাত্র মায়ের সেবা যত্নে যেন কোনোভাবে বেঁচে আছেন তিনি। পুলিশের রাবার বুলেটের আঘাতের ক্ষত নিয়ে আজও যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মিঠু।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন