লক্ষ্মীপুরে নিহত চার শিক্ষার্থীর পরিবারের আর্তনাদ থামেনি

লক্ষ্মীপুরে নিহত চার শিক্ষার্থীর পরিবারের আর্তনাদ থামেনি

ফন্ট সাইজ:

৪ঠা আগস্ট ২০২৪। রোববার। সকাল সাড়ে ৭টা। শহরের অলিগলি থেকে বাগবাড়ি কৃষি অফিসের সামনে আন্দোলনকারীরা জড়ো হতে চেষ্টা করে। এ সময় ছাত্রলীগ নেতা বাবু, সেবাব নেওয়াজ, জুয়েল, যুবলীগের ইমন, সেলিম ও রায়হানসহ ছাত্রলীগ ও যুবলীগের ৪০ থেকে ৫০ জন অস্ত্রধারী নেতাকর্মী আন্দোলনরত শিক্ষার্থীকে ব্যাপক মারধর করে। এ ঘটনায় অন্দোলনকারীরা পিছু না হটে মোকাবিলার চেষ্টা করে। হামলার খবর ছড়িয়ে পড়লে ছাত্র-জনতা বাগবাড়িতে একত্রিত হয়ে মিছিল বের করে। পরে আন্দোলনকারীরা ঝুমুর এলাকায় অবস্থান নেয়। এ সময় উত্তর তেমুহনীতে একত্রিত হতে থাকে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা।

সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি কবির পাটওয়ারী, সাইফুল হাসান পলাশ, পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি সৈয়দ আহমদ পাটওয়ারী ও জেলা যুবলীগের সাবেক সভাপতি একেএম সালাউদ্দিন টিপু, যুবলীগ নেতা বায়োজিদ ভূঁইয়া, শাখায়াত হোসেন আরিফ, ছাত্রলীগের সভাপতি সাইফুল ইসলাম রকি ও সাধারণ সম্পাদক শাহাদাত হোসেন ভূঁইয়া, নজরুল ইসলাম ভুলু, সাবেক পিপি জসিম, রাসেল মাহুমদ মান্না, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা বাবর ও রাকিব হোসেন লোটাস, শাহজাহান মেম্বার, জাবেদ, তাজু, মেম্বার সোহেল, চন্দ্রগঞ্জের ছাত্রলীগ নেতা মাসুদ, আবু তালেব, বাংগাখাঁর মিজানুর রহমান ভূঁইয়ার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা উত্তর তেমুহনীতে জড়ো হয়। এ ছাড়া সাবেক পৌর মেয়র মোজাম্মেল হায়দার মাসুম ভূঁইয়ার নেতৃত্বে হ্যাপী সড়ক থেকে একটি মিছিল নিয়ে বের হয়।

সকাল ৯টায় হঠাৎ লাঠি ও অস্ত্রসহ উত্তর তেমুহনী থেকে মিছিল নিয়ে ঝুমুরের দিকে এগিয়ে যায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। মিছিলটি বাগবাড়িতে পৌঁছালে আওয়ামী লীগের হামলায় কয়েকজন শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হয়। বেশ কয়েকটি ককটেল ফাটিয়ে এলাকায় চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। হামলার খবর পেয়ে ঝুমুর এলাকা থেকে শিক্ষার্থীরা মিছিল নিয়ে বাগবাড়ির দিকে আসতে থাকে। মিছিলটি মাদাম ব্রিজের পূর্বপ্রান্তে পৌঁছলে টিপু, বায়োজিদ ভূঁইয়া ও হেলমেট পরা কয়েকজন সন্ত্রাসী শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি ছুঁড়তে থাকে। এ সময় প্রথম গুলিবিদ্ধ হয়ে কলেজ শিক্ষার্থী সাদ আল আফনান ঘটনাস্থলে নিহত হন। আহত হয় অর্ধশতাধিক। আফনান নিহতের খবর ছড়িয়ে পড়লে হাজারো ছাত্র-জনতা জড়ো হয়ে আওয়ামী বাহিনীকে ধাওয়া করে। এইভাবে চলতে থাকে একের পর এক ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া। আর পিছু হটতে থাকে আওয়ামী সন্ত্রাসীরা। এক পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের তোপের মুখে রাস্তা ছেড়ে টিপু ও তার লোকজন তমিজ মার্কেট, তার বাসা ও ছাদে অবস্থান নেয়।

শিক্ষার্থীরা উত্তর তেমুহানী ও দক্ষিণ দিক থেকে দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে টিপুর বাসার চার দিকে ঘিরে রাখে। এ সময় টিপু ও তার লোকজন বাসার ছাদ থেকে এলোপাতাড়ি গুলি ছুঁড়তে থাকে শিক্ষার্থীদের ওপর। টিপুর আরেকটি গ্রুপ নিচে শাঁখারি পাড়া মোড় ও তিতা খাঁ মসজিদ এলাকায় আন্দোলনকারীদের উপর কয়েক দফা হামলা করে। এখানে দীর্ঘক্ষণ চলে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া ও ককেটল বিস্ফোরণ। টিপুর গুলিতে আরও তিন আন্দোলনকারী ছাত্র নিহত হন। তারা হলেন, সাব্বির হোসেন, কাউছার হোসেন বিজয় ও ওসমান পাটওয়ারী। এ নিয়ে ৪ঠা আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের চার শিক্ষার্থী নিহত হন। প্রায় দুই শতাধিক গুলিবিদ্ধসহ আহত হয় তিনশ’র বেশি মানুষ। এতে টিপুর বাসভবনে হামলা ও অগ্নিসংযোগ করে আন্দোলনকারীরা। এদিন বিক্ষুব্ধ জনতার হাতে গণটিপুনিতে টিপুর ৮ কর্মী নিহত হয়। অবরুদ্ধ অবস্থায় আটকা পড়ে টিপুর বাসার ভিতরে অনেক আওয়ামী লীগ নেতা।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা গভীর রাতে তাদের উদ্ধার করে নিরাপদে পৌঁছে দেয়। লক্ষ্মীপুর জেলা সদর থানা সূত্রে জানা যায়, সাদ আল আফনান হত্যার ঘটনায় আফনানের মা নাছিমা আক্তার বাদী হয়ে, টিপু ও মাসুম ভূঁইয়াসহ ৭৫ জনের নাম উল্লেখ করে আরও ৬০০ জনকে অজ্ঞাত আসামি করে সদর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। অপরদিকে সাব্বির হোসেন হত্যার ঘটনায় পৃথক আরও একটি মামলা দায়ের করা হয়। এসব মামলায় ৯১ জনের নাম উল্লেখ ও অজ্ঞাত ২০০ জনকে আসামি করা হয়। গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত আবদুল মতিন একটি মামলা করেন। ওই মামলায় জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক এমপি গোলাম ফারুক পিংকুসহ ৭৬ জনের নাম উল্লেখ করে আরও দেড়শ’ জনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়। এ ছাড়া গুলিবিদ্ধ আল সবুজ আরও একটি মামলা করেন। সবুজের মামলায় জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক এমপি নুরউদ্দিন চৌধুরী নয়নসহ ১৬২ জন ও অজ্ঞাত ৩০০ জনকে আসামি করে মামলা করা হয়।

অপর দিকে পুলিশের পক্ষ থেকেও আরও একটি মামলা দায়ের করা হয়। এসব মামলায় জেলা, উপজেলা, পৌরসভা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডসহ বিভিন্ন ইউনিটের আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগের অনেক নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়। কিছুদিন কারাভোগের পর অনেক নেতা জামিনে বের হয়ে আসেন। নিহত সাদ আল আফনানের মা নাছিমা বেগম, সাব্বিরের বাবা ও বিজয়ের মা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমরা আমাদের সন্তান হারিয়েছি। আমরা মামলা করেছি আমরা মামলার বাদী। কিন্তু পুলিশ মামলার প্রতিবেদন আদালতে জমা দিয়েছে আমরা জানি না।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন