মাত্র দশ ইভেন্ট, সীমিত বাজেট, অসংখ্য ফাঁকা আসন আর শীর্ষ তারকাদের বড় অংশের অনুপস্থিতিÑএসব নিয়েই শেষ হলো গ্লাসগো কমনওয়েলথ গেমস। সংক্ষিপ্ত পরিসরে হলেও গেমসটি সফলভাবে আয়োজন করে গ্লাসগো আপাতত এই দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যবাহী আসরটিকে টিকিয়ে রাখল বটে, তবে শতবর্ষের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে কমনওয়েলথ গেমসের দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গেলো।
১৯৩০ সালে ব্রিটিশ এম্পায়ার গেমস নামে যাত্রা শুরু হওয়া এই আসর সবচেয়ে বড় সংকটের মুখে পড়ে ২০২৩ সালে। মাত্রাতিরিক্ত খরচের অজুহাত দেখিয়ে আয়োজক হওয়া থেকে সরে দাঁড়ায় অস্ট্রেলিয়ার ভিক্টোরিয়া রাজ্য। ফলে পুরো আয়োজনটাই পড়ে যায় অনিশ্চয়তায়। শেষ পর্যন্ত ত্রাতার ভূমিকায় এগিয়ে আসে গ্লাসগো। ২০১৪ সালে একবার সফলভাবে গেমস আয়োজনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বিদ্যমান অবকাঠামো ব্যবহার করেই স্বল্প ব্যয়ে এবারের আসর সম্পন্ন করে তারা। তুলনা করলেই পার্থক্যটা স্পষ্ট হয়। চার বছর আগের বার্মিংহাম গেমসে খরচ হয়েছিল প্রায় ৭৮ কোটি পাউন্ড। সেখানে গ্লাসগো পুরো আয়োজন সারে মাত্র ১৬ কোটি পাউন্ডে।
বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ৮৭ কোটি ৭০ লাখ মালয়েশিয়ান রিঙ্গিতের সমান। গ্লাসগো থেকে এবার গেমসের ব্যাটন যাচ্ছে ভারতের আহমেদাবাদে। ২০৩০ সালের সেই আসরে গেমস পা রাখবে শততম বছরে। আর তখন খেলার সংখ্যাও বাড়িয়ে ১৫ থেকে ১৭টিতে নেয়ার পরিকল্পনা করছে আয়োজকরা। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে-শতবর্ষ পেরিয়েও কি এই গেমস ধরে রাখতে পারবে আগের গুরুত্ব? এই প্রশ্নের জবাবে ইতিবাচক কমনওয়েলথ স্পোর্টের সভাপতি ডক্টর ডোনাল্ড রুকারে। তিনি বলেন, ‘কমনওয়েলথ গেমস হলো এমন একটি জায়গা, যেখানে চ্যাম্পিয়নরা তৈরি হয়।’
অলিম্পিকের মাঝামাঝি সময়ে অনুষ্ঠিত হওয়ায় বহু তরুণ ক্রীড়াবিদের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সূচনা হয় এই মঞ্চ থেকে। তার জ্বলন্ত উদাহরণ ক্যামেরুনের স্প্রিন্টার ইমানুয়েল এসেমে। গ্লাসগোতে ১০০ মিটারে ৯.৮৩ সেকেন্ড টাইমিং করে সোনা জেতা এই অ্যাথলেট বলেছেন, চার বছর আগের কমনওয়েলথ গেমসই বদলে দিয়েছিল তার ক্যারিয়ারের মোড়। তিনি বলেন, ‘কমনওয়েলথ গেমস আমার জন্য একটি দুয়ার উন্মোচনকারীর মতো কাজ করেছে। গত কমনওয়েলথ গেমসে ১০.০৮ সেকেন্ডের জাতীয় রেকর্ড গড়ার মাধ্যমেই সবকিছু গতি পেতে শুরু করে। ক্যামেরুনের কেউ যে এত দ্রুত দৌড়াতে পারে, তা আমার দেশের কেউ কখনো ভাবেনি। বিষয়টি দারুণ ছিল, আর তারপর থেকে সবকিছু বেশ ভালোই চলছে।’ পদক তালিকায় এবারও শীর্ষে অস্ট্রেলিয়া। ৭০টি সোনাসহ মোট ১৭০টির বেশি পদক জিতে আধিপত্য তাদের। এরপরের অবস্থানে ইংল্যান্ড, কানাডা ও ভারত।
তবে বড় দেশগুলোর পাশাপাশি এই গেমস সুযোগ করে দেয় ছোট ও অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত দেশগুলোকেও। এবার জার্সি, ডমিনিকা ও ব্রিটিশ ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জের মতো দেশও সোনা জিতে দেশে ফিরেছে। ডমিনিকার অলিম্পিক ট্রিপল জাম্প চ্যাম্পিয়ন থিয়া লাফন্ড বলেন, ‘এখান থেকেই আমার সবকিছুর শুরু হয়েছিল, আর সম্ভবত এখানেই সবকিছুর শেষ হবে। ডমিনিকার একজন পথপ্রদর্শক হতে পেরে দারুণ লাগছে।’ এই গেমসের আরেকটি বিশেষত্ব হলো, অলিম্পিকে যেসব ক্রীড়াবিদ একীভূত দলের হয়ে অংশ নেন, এখানে তারা নিজের দেশ বা অঞ্চলের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পান। স্কটল্যান্ডের জশ কের যেমন এক মাইল দৌড়ে ২৭ বছরের পুরোনো বিশ্ব রেকর্ড ভাঙার পরপরই সোনা জিতে হয়ে ওঠেন ঘরের মাঠের পোস্টার বয়। ৬০ বছর পর প্রথমবারের মতো কমনওয়েলথ গেমসে ফেরা এই ইভেন্টে জয়ের পর কের বলেন, ‘গ্রেট ব্রিটেনের জাতীয় সংগীতের বদলে ‘ফ্লাওয়ার অব স্কটল্যান্ড’ বাজতে শোনা-এটা সম্পূর্ণ আলাদা এক অনুভূতি। আমার ক্যারিয়ারে খুব কম সময়ই এমন সৌভাগ্য হবে।’
এসব ইতিবাচক দিকের বিপরীতে উদ্বেগের কারণও কম নয়। অলিম্পিক ও প্যারালিম্পিকের বিভাজন ভেঙে রেকর্ডসংখ্যক ছয়টি খেলাকে পুরোপুরি একীভূত করে এবার বৃহত্তম প্যারা-স্পোর্টস কর্মসূচি চালু করা হলেও মাঠের বাইরের চিত্রটা ছিল একেবারেই ভিন্ন। গ্লাসগোতে অনুপস্থিত ছিলেন বেশ কয়েকজন তারকা অ্যাথলেট। ব্রিটিশ অ্যাথলেটিকসের বড় নাম কিলি হজকিনসন প্রাধান্য দেন আসন্ন ইউরোপীয় অ্যাথলেটিকস চ্যাম্পিয়নশিপকে। একইভাবে গেমস বয়কট করেছেন নারীদের ১০০ মিটার অলিম্পিক চ্যাম্পিয়ন জুলিয়েন আলফ্রেড এবং কানাডার সাঁতার সেনসেশন সামার ম্যাকইনটোশের মতো তারকারাও। তারকাদের এই অনুপস্থিতির প্রভাব সরাসরি পড়েছে গ্যালারিতে। বহু আসন ছিল ফাঁকা। ঠিক ১২ বছর আগে একই শহরে অনুষ্ঠিত গেমসে প্রায় ১৩ লাখ টিকিট বিক্রি হলেও এবার দেখা গেছে বিপরীত দৃশ্য। আয়োজক-সংকটও কমনওয়েলথ গেমসের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। ২০২২ সালের আয়োজক হওয়ার পর দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছিল ডারবান।
আর ভিক্টোরিয়ার প্রত্যাহারের কারণে টানা দ্বিতীয়বার আয়োজক বদলাতে হয়েছে। যদিও কমনওয়েলথ স্পোর্টের প্রধান নির্বাহী ক্যাটি স্যাডলিয়ার আশাবাদী। তিনি বলেন, ‘নিউজিল্যান্ডসহ বেশ কয়েকটি দেশ ২০৩৪ ও তার পরবর্তী আসর আয়োজনে আগ্রহ দেখিয়েছে। তবে অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, বিড জেতার পরও শেষ পর্যন্ত আয়োজন বাস্তবায়িত না হওয়ার নজির কম নয়।’ আয়োজনের ক্রমবর্ধমান ব্যয়, অলিম্পিকসহ অন্যান্য বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং শীর্ষ ক্রীড়াবিদদের আগ্রহ কমে যাওয়াÑএই তিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে কমনওয়েলথ গেমস। আহমেদাবাদের শতবর্ষী আসর হয়তো এই ঐতিহ্যবাহী প্রতিযোগিতায় নতুন প্রাণ ফিরিয়ে আনার একটা সুযোগ এনে দেবে। তারপরও এর দীর্ঘমেয়াদি টিকে থাকা নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তা মিলিয়ে যাওয়ার নয়।
