স্মার্টফোন আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভিড়ে যখন নতুন প্রজন্ম বই থেকে ক্রমেই দূরে সরে যাচ্ছে, ঠিক তখনই বইয়ের প্রতি আগ্রহ ফিরিয়ে আনতে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছে শ্রীমঙ্গল উপজেলা প্রশাসন। ‘বই পড়ি, মন গড়ি’ এই সেøাগানকে সামনে রেখে গত ২১শে জুলাই থেকে শুরু হওয়া ‘শ্রীমঙ্গল বইপড়া উৎসব ২০২৬’ এখন বইপাঠে এক নতুন জাগরণ সৃষ্টি করেছে। পাঠ্য বইয়ের গণ্ডি পেরিয়ে গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ ও কাব্যের জগতে শিক্ষার্থীদের আগ্রহী করে তুলতে সরাসরি শ্রীমঙ্গল উপজেলা প্রশাসন যাচ্ছে শিক্ষার্থীদের কাছে। আয়োজন করা হচ্ছে উদ্বুদ্ধকরণ সমাবেশ। উৎসবের প্রথম ধাপ ‘মুকুল পর্ব’-এ ইতিমধ্যে উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চলছে এই কার্যক্রম।
এরই অংশ হিসেবে দিনব্যাপী কর্মসূচিতে শ্রীমঙ্গলের ১০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অনুষ্ঠিত হয়েছে উদ্বুদ্ধকরণ সমাবেশ। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও উপজেলা প্রশাসক মো. জিয়াউর রহমান নিজে উপস্থিত থেকে ভিক্টোরিয়া উচ্চ বিদ্যালয়, সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, উদয়ন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, দি বাডস রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, নটর ডেম স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ভৈরবগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়, সিরাজনগর জে.এস.এস.আর মাদ্রাসা, শ্রীমঙ্গল আনোয়ারুল উলুম ফাযিল মাদ্রাসা, সেন্ট মার্থাস হাইস্কুল এবং ভূনবীর দশরথ স্কুল অ্যান্ড কলেজ পরিদর্শন করেন। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রাণবন্ত আলাপচারিতায় তিনি বইপড়ার গুরুত্ব তুলে ধরেন।
ছাত্র-ছাত্রীদের আগ্রহ, উদ্দীপনা সৃষ্টি, উৎসাহ প্রদান এবং তাদেরকে অনুপ্রাণিত করতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, বইয়ের কোনো বিকল্প নেই। আমরা চাই শিক্ষার্থীরা পাঠ্য বইয়ের পাশাপাশি বিভিন্ন বই পড়ে নিজেদের চিন্তা ও মননকে সমৃদ্ধ করুক। উপজেলা প্রশাসন প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে গিয়ে বইপড়ার এই আনন্দ সবার সঙ্গে ভাগাভাগি করতে চায়। এ সময় উপস্থিত ছিলেন শ্রীমঙ্গল বইপড়া উৎসবের সমন্বয়ক ও শ্রীমঙ্গল আবৃত্তি উৎসবের নির্বাহী পরিচালক দেবাশীষ দাশ এবং উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা প্লাবন পাল। জানা গেছে, তিন ধাপে আয়োজিত এ উৎসবের প্রথম ধাপ ‘মুকুল পর্ব’-এ উপজেলার মাধ্যমিক ও তদূর্ধ্ব ৩৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রায় ২৫ হাজার শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করছে। তাদের জন্য নির্ধারিত ১৪টি বই ইতিমধ্যে পড়া শুরু হয়েছে।
আগামী ১৭ই আগস্ট এসব বইয়ের ওপর শ্রেণিভিত্তিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে প্রতিটি শ্রেণি থেকে সেরা ১০ জনকে নিয়ে শুরু হবে দ্বিতীয় ধাপ ‘ফুল পর্ব’। সেখানে নতুন বইপড়া ও পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের বাছাই করা হবে। পরবর্তীতে প্রতিটি শ্রেণির সেরা ৩ জন করে শিক্ষার্থী অংশ নেবে উপজেলা পর্যায়ের চূড়ান্ত ‘ফল পর্ব’-এ। এ পর্বে আবার নতুন বইয়ের ওপর পরীক্ষার মাধ্যমে উপজেলার শ্রেণিভিত্তিক সেরা ১০ জন নির্বাচিত হবে। উৎসবের প্রতিটি ধাপে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের ন্যূনতম তিনটি বই পড়তে হবে, যা তাদের পাঠাভ্যাসকে আরও সমৃদ্ধ করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এবারের উৎসবে যুক্ত হয়েছে ‘উন্মুক্ত বিভাগ’Ñ যেখানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাইরের যেকোনো বয়সী মানুষ নিবন্ধনের মাধ্যমে অংশ নিতে পারবেন।
ফলে বইপড়া উৎসবটি এখন শুধু শিক্ষার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং সমাজ জুড়ে বইপড়ার সংস্কৃতি ছড়িয়ে দেয়ার এক প্রয়াসে পরিণত হয়েছে। ভূনবীর দশরথ স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ ঝলক চক্রবর্তী বলেন, শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল নয়, একজন সৃজনশীল ও মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে বই পড়ার বিকল্প নেই। উপজেলা প্রশাসনের এই উদ্যোগ শিক্ষার্থীদের মধ্যে পাঠাভ্যাস গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সিরাজনগর গাউছিয়া সুন্নী ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা শিব্বির আহমেদ বলেন, ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি জ্ঞান-বিজ্ঞান, সাহিত্য ও ইতিহাসভিত্তিক বই পড়লে শিক্ষার্থীদের চিন্তাশক্তি ও মূল্যবোধ সমৃদ্ধ হবে। বইপড়া উৎসবের এই আয়োজন সময়োপযোগী এবং প্রশংসনীয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ ধরনের উদ্যোগ শিক্ষার্থীদের মধ্যে সৃজনশীলতা, মননশীলতা ও জ্ঞানচর্চার আগ্রহ বাড়াবে। বইয়ের সঙ্গে নতুন প্রজন্মের এই সংযোগই গড়ে তুলতে পারে একটি আলোকিত সমাজ। উপজেলা প্রশাসন শ্রীমঙ্গলের আয়োজনে অনুষ্ঠিত এ উৎসবে সমন্বয় সহযোগী হিসেবে রয়েছে শ্রীমঙ্গল আবৃত্তি উৎসব এবং পাঠ সহযোগী হিসেবে কাজ করছে ‘উত্তরণ’।
