কূটনীতির ভাষা, ব্রিকসের বার্তা এবং দক্ষিণ এশিয়ার নতুন বাস্তবতা

কূটনীতির ভাষা, ব্রিকসের বার্তা এবং দক্ষিণ এশিয়ার নতুন বাস্তবতা

ফন্ট সাইজ:

আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে কখনও কখনও একটি শব্দ, একটি সম্বোধন কিংবা একটি আনুষ্ঠানিক বাক্যও বহন করে গভীর রাজনৈতিক ও কৌশলগত তাৎপর্য। রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সম্পর্ক শুধু যৌথ বিবৃতি, চুক্তি বা রাষ্ট্রপ্রধানদের বৈঠকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং কূটনৈতিক প্রোটোকল, আনুষ্ঠানিক চিঠিপত্র এবং ভাষার সূক্ষ্ম ব্যবহারও পারস্পরিক আস্থা, মর্যাদা এবং রাজনৈতিক বার্তার প্রতিফলন ঘটায়। সে কারণেই আন্তর্জাতিক কোনো সম্মেলনের আমন্ত্রণপত্রে ব্যবহৃত ভাষা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তা নিছক আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

সম্প্রতি আগামী সেপ্টেম্বরে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের ‘আউটরিচ’ পর্বে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ এবং আমন্ত্রণপত্রের সম্বোধন নিয়ে যে আলোচনা তৈরি হয়েছে, তা শুধু একটি কূটনৈতিক ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিষয়টি দক্ষিণ এশিয়ার বর্তমান ভূরাজনীতি, আঞ্চলিক নেতৃত্ব, বহুপাক্ষিক কূটনীতি এবং পরিবর্তিত বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ এনে দিয়েছে। যদিও এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা এখনও সম্পূর্ণ স্পষ্ট নয়, তবুও ঘটনাটি আন্তর্জাতিক কূটনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে এসেছে। কূটনীতিতে ভাষাও এক ধরনের শক্তি।

বিশ্ব রাজনীতি আজ দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। একক পরাশক্তিনির্ভর আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার পরিবর্তে বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা ক্রমশ দৃশ্যমান হচ্ছে। এই পরিবর্তনের অন্যতম প্রতীক ব্রিকস। শুরুতে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকার অর্থনৈতিক সহযোগিতার প্ল্যাটফর্ম হিসেবে যাত্রা শুরু করলেও বর্তমানে এটি বৈশ্বিক অর্থনীতি, উন্নয়ন অর্থায়ন এবং বিকল্প বহুপাক্ষিক সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চে পরিণত হয়েছে। সম্প্রসারিত সদস্যপদ এবং উন্নয়নশীল বিশ্বের প্রতি বাড়তি মনোযোগ ব্রিকসকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে।

অন্যদিকে বিমসটেকও দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগ, বাণিজ্য, জ্বালানি, নৌ-নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ক্রমেই গুরুত্ব পাচ্ছে। বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক এই উদ্যোগ এমন এক ভৌগোলিক অঞ্চলে কার্যকর, যেখানে বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল অর্থনীতিগুলোর অবস্থান। ফলে ব্রিকস এবং বিমসটেককে প্রতিযোগী নয়, বরং পরস্পর-পরিপূরক সহযোগিতার ক্ষেত্র হিসেবে দেখাই অধিক বাস্তবসম্মত।

বাংলাদেশ এই দুই বাস্তবতার সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম দ্রুত বিকাশমান অর্থনীতি, অন্যদিকে বঙ্গোপসাগরভিত্তিক আঞ্চলিক সংযোগের কেন্দ্রীয় অবস্থান এই দুই কারণে আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর কাছে বাংলাদেশের গুরুত্ব ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ভারত, চীন, জাপান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো সবাই বিভিন্ন মাত্রায় বাংলাদেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক আরও গভীর করতে আগ্রহী। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ভারসাম্য রক্ষা করা এবং প্রতিটি সম্পর্ককে জাতীয় উন্নয়নের স্বার্থে কাজে লাগানো।

ভারতের জন্যও দক্ষিণ এশিয়ার বর্তমান বাস্তবতা নতুন বার্তা বহন করছে। আঞ্চলিক নেতৃত্ব কেবল ভৌগোলিক আকার বা অর্থনৈতিক সক্ষমতার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় না; এর জন্য প্রয়োজন প্রতিবেশীদের আস্থা অর্জন, পারস্পরিক সম্মান প্রদর্শন এবং সংবেদনশীল কূটনৈতিক আচরণ। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক যত বেশি বিশ্বাস ও পারস্পরিক মর্যাদার ভিত্তিতে গড়ে উঠবে, ততই আঞ্চলিক সহযোগিতা শক্তিশালী হবে। একইভাবে প্রতিবেশী দেশগুলোরও উচিত প্রতিটি কূটনৈতিক ইস্যুকে আবেগের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থের আলোকে মূল্যায়ন করা।

বর্তমান বিশ্বে অর্থনীতি ও ভূরাজনীতি একে অপরের পরিপূরক। সরবরাহ শৃঙ্খল পুনর্বিন্যাস, প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা, জ্বালানি নিরাপত্তা, খাদ্য সংকট এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে আরও ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। আঞ্চলিক বাণিজ্য বৃদ্ধি, সীমান্ত-সংযোগ উন্নয়ন, ডিজিটাল অর্থনীতি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং অবকাঠামো বিনিয়োগ এসব ক্ষেত্রেই যৌথ উদ্যোগ আগামী দশকের প্রবৃদ্ধির ভিত্তি হতে পারে।

বাংলাদেশের জন্য এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বহুমাত্রিক কূটনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি। কোনো একটি আন্তর্জাতিক জোট বা শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না হয়ে সবার সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানোর নীতি ভবিষ্যতের জন্য অধিক কার্যকর হতে পারে। কারণ বর্তমান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় সফল রাষ্ট্রগুলো সেই দেশই, যারা প্রতিযোগিতার মাঝেও সহযোগিতার সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে এবং বৈচিত্র্যময় অংশীদারিত্বের মাধ্যমে নিজেদের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অবস্থান শক্তিশালী করে।

একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, কূটনীতিতে প্রতীকী বিষয়ের গুরুত্ব থাকলেও শেষ পর্যন্ত একটি দেশের মর্যাদা নির্ধারণ করে তার অর্থনৈতিক শক্তি, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, নীতির ধারাবাহিকতা, সুশাসন এবং আন্তর্জাতিক বিশ্বাসযোগ্যতা। আনুষ্ঠানিক সম্বোধন নিয়ে বিতর্ক কয়েক দিনের সংবাদ হতে পারে; কিন্তু একটি দেশের দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান নির্ধারিত হয় তার সক্ষমতা, নীতি এবং আন্তর্জাতিক অবদানের মাধ্যমে।

দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে এই অঞ্চলের দেশগুলো কতটা দূরদর্শিতার সঙ্গে নিজেদের পারস্পরিক সম্পর্ক পরিচালনা করতে পারে তার ওপর। ইতিহাস বলছে, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্ভব। ইউরোপ তার উদাহরণ। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আসিয়ানও দেখিয়েছে, বৈচিত্র্যের মধ্যেও একটি কার্যকর অর্থনৈতিক ও কৌশলগত প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা যায়। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোরও সেই বাস্তববাদী পথ অনুসরণ করা প্রয়োজন।

ব্রিকস, বিমসটেক, সার্ক কিংবা ভারত মহাসাগরকেন্দ্রিক অন্যান্য উদ্যোগ সবগুলোর মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত আঞ্চলিক সমৃদ্ধি, সংযোগ, বিনিয়োগ এবং স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা। রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা থাকবে, কৌশলগত স্বার্থও থাকবে; কিন্তু সেই প্রতিযোগিতা যেন উন্নয়নের পথে অন্তরায় না হয়ে ওঠে, সেটিই হবে প্রকৃত কূটনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয়।

আজকের বিশ্বে কূটনীতির ভাষা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ সেই ভাষার অন্তর্নিহিত বার্তা বোঝার সক্ষমতা। পারস্পরিক সম্মান, সংলাপ এবং বাস্তববাদী সহযোগিতাই দক্ষিণ এশিয়াকে একটি স্থিতিশীল, সমৃদ্ধ ও প্রভাবশালী অঞ্চলে পরিণত করতে পারে। বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতির জন্যও এটিই সবচেয়ে কার্যকর পথ সব পক্ষের সঙ্গে গঠনমূলক সম্পর্ক বজায় রেখে জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া।

শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের সাফল্য নির্ধারিত হয় না একটি আমন্ত্রণপত্রের সম্বোধনে; বরং নির্ধারিত হয় সে রাষ্ট্র কতটা দক্ষতার সঙ্গে বৈশ্বিক পরিবর্তনকে নিজের উন্নয়নের সুযোগে রূপান্তর করতে পারে। দক্ষিণ এশিয়ার সামনে এখন সেই সুযোগই উপস্থিত। প্রয়োজন কেবল দূরদর্শী নেতৃত্ব, পরিণত কূটনীতি এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতাকে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ঊর্ধ্বে তুলে ধরার সাহস।

লেখক: সহিদুল আলম স্বপন, সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ কলামিস্ট ও কবি
ইমেইল: [email protected]



কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন