বাংলাদেশের নির্বাসিত লেখিকা তসলিমা নাসরিন ১৯ বছর পর কলকাতায় এসে সংবর্ধনা পেলেন। শনিবার রবীন্দ্র সদনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তসলিমাকে সংবর্ধিত করেছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
কলকাতায় ফিরে তসলিমা বলেছেন, ‘‘নির্বাসিত মানুষের ক্যালেন্ডারে বছর শুধু সময় নয়, প্রতিটি বছর একটি বন্ধ দরজা। প্রতি মাস অপেক্ষার। প্রতিটি দিন নিজের ঠিকানা হারানোর দুঃখের। সেই দীর্ঘ অপেক্ষার পর কলকাতার মাটিতে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছে আমি শুধু একটি শহরে ফিরে আসিনি। ফিরে এসেছি একটি অধ্যায়ের কাছে।’’
১৯ বছর আগে তার লেখা দ্বিখন্ডিত প্রকাশকে কেন্দ্র করে প্রবল আন্দোলনের মুখে কলকাতায় থিতু হওয়া তাকে কলকাতা থেকে বিতাড়িত করা হয়েছিল। তারপর থেকে দিল্লিতে নিরাপত্তার ঘেরাটোপে থাকছেন তিনি। এখনো তিনি সুইডিশ নাগরিক।
পশ্চিমবঙ্গে পালাবদলের পরে শুক্রবার কলকাতায় এসে আপ্লুত তসলিমা। কলকাতাতে অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে তাকে ঘিরে ছিল পুলিশি নিরাপত্তা বলয়। সেই নিরাপত্তার বন্দোবস্ত করে দেয়ার জন্য শুভেন্দুকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন তসলিমা। তবে নিরাপত্তার প্রশ্নে তসলিমা বলেছেন, ‘‘একজন লেখককে তার ভাষার শহরে আসতে পুলিশের পাহারার প্রয়োজন হওয়াটাই আমার কাছে বেদনাদায়ক সত্য। আমি এমন একটা দিনের স্বপ্ন দেখি, যে দিন কোনও লেখককে পুলিশের পাহারায় চলতে হবে না। ভিন্ন মত পোষণের জন্য কাউকে দেশ ছাড়তে হবে না।’’
তসলিমা মনে করেন, তার এই প্রত্যাবর্তন প্রমাণ করে ভয়, নিষেধাজ্ঞা চিরস্থায়ী নয়। তিনি বলেছেন, ‘‘বন্ধ দরজাও চিরকাল বন্ধ থাকে না।’’
তসলিমা আরও বলেছেন, ‘আগস্ট আমার জন্মের মাস, আগস্ট আমার নির্বাসনের মাস। আজ থেকে আগস্ট আমার প্রত্যাবর্তনের মাসও।’’ তার কথায়, ‘‘আমাকে বাংলাদেশ ছাড়তে বাধ্য করেছিল তৎকালীন সরকার। রাতের অন্ধকারে স্বদেশের দরজা আমার জন্য বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। তারপর একের পর এক সরকার এসেছে, কিন্তু সেই দরজা আর খোলেনি।’’
কলকাতায় ফিরে আসা নিয়ে তসলিমা বলেছেন, “আজ বলতে এসেছি, আমি ফিরে এসেছি। আমার চোখে জল আছে, মনে অভিমান আছে। কিন্তু দুহাত ভরা ভালোবাসাও আছে। যে শহর আমাকে কাঁদিয়েছে, সেই শহরই আমাকে স্বপ্ন দেখিয়েছে। যে শহর থেকে আমাকে চলে যেতে হয়েছে, সেই শহরে ফিরে আসার স্বপ্ন আমি এতবছর দেখেছি। আমি জানি চলে যাওয়া আর ফিরে আসার মাঝের ১৯ বছর আমাকে কেউ ফিরিয়ে দিতে পারবে না।” এরপরই তিনি বলেছেন, “আজকের দরজা খোলা প্রমাণ করে অন্যায় দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে, চিরস্থায়ী নয়। ইতিহাস মনে রাখে, কারা দরজা বন্ধ করেছিল কারা খুলল।”
মুখ্যমন্ত্রী এদিন তসলিমাকে মুক্ত পশ্চিমবঙ্গে যতবার খুশি আসার আশ্বাস দিয়েছেন।
