দেশের তৈরি পোশাক শিল্পের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র গাজীপুর। এই শিল্পাঞ্চলের হাজারো কারখানার চাকা সচল রাখার প্রধান জ্বালানি গ্যাস। অথচ টানা গ্যাস সংকটে এখন উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। কম গ্যাস চাপের কারণে স্বাভাবিক গতিতে চলছে না বয়লার, স্টিম লাইন ও উৎপাদনের বিভিন্ন ইউনিট। কোথাও ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও বয়লার চালু করা যাচ্ছে না, আবার কোথাও উৎপাদনের মাঝপথেই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে মেশিন। এর ফলে একদিকে যেমন উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে সময়মতো বিদেশি ক্রেতাদের কাছে পণ্য পাঠানো (শিপমেন্ট) নিয়েও দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। একইসঙ্গে উৎপাদনের গতি কমে যাওয়ায় দুশ্চিন্তায় পড়েছেন শ্রমিকরাও। অনেক কারখানায় ওভারটাইম কমে যাওয়ায় তাদের আয়ও কমে এসেছে।
এই ঘাটতির সরাসরি প্রভাব পড়ছে জেলার প্রায় ২ হাজার ৭৬৪টি শিল্পকারখানায়। শুধু শিল্পকারখানা নয়, একই সংকটে ভুগছেন গাজীপুরের সিএনজিচালিত যানবাহনের চালকরাও। বিভিন্ন সিএনজি ফিলিং স্টেশনে ভোর থেকেই দেখা যাচ্ছে দীর্ঘ যানজট। কোথাও কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষা করেও মিলছে না গ্যাস, আবার কোথাও চাপ এত কম যে একটি গাড়িতে গ্যাস নিতে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি সময় লাগছে। গাজীপুরের ভোগড়া, ভবানীপুর, কোনাবাড়ী, টঙ্গী, শ্রীপুর ও চন্দ্রা এলাকার শিল্পকারখানাগুলোতে বর্তমানে গ্যাসের চাপ অত্যন্ত কম। অনেক কারখানায় পর্যাপ্ত গ্যাস না থাকায় বয়লার ও মেশিন বন্ধ রাখতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। ভোগড়া একটি পোশাক কারখানার ইউটিলিটি অপারেটর জানান, গ্যাসের চাপ কম থাকায় ফিনিশিংসহ বিভিন্ন বিভাগে কাজের গতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
মেশিন বন্ধ থাকলে শ্রমিকদেরও বসে থাকতে হয়। এতে উৎপাদন যেমন কমছে, তেমনি ওভারটাইমও কমে যাচ্ছে। কখনো কখনো শূন্যে নেমে আসছে গ্যাসের চাপ। কারখানার শ্রমিকদের ভাষ্য, আগে নির্ধারিত সময়ের পাশাপাশি নিয়মিত অতিরিক্ত সময় কাজের সুযোগ থাকলেও এখন অনেক সময় কাজের অপেক্ষায় বসে থাকতে হচ্ছে। ফলে মাসিক আয় কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। শিল্প মালিকরা বলছেন, গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে গেছে। অনেক কারখানাকে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করতে হচ্ছে, যা ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। একইসঙ্গে নির্ধারিত সময়ে উৎপাদন শেষ না হওয়ায় বিদেশি ক্রেতাদের কাছে পণ্য সরবরাহে বিলম্বের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। কারখানার কর্মকর্তারা বলছেন, এই শিল্পের প্রাণই হচ্ছে গ্যাস।
গ্যাস না থাকলে উৎপাদন স্বাভাবিক রাখা সম্ভব নয়। পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে অনেক কারখানা আর্থিক সংকটে পড়বে, এমনকি কিছু কারখানা বন্ধও হয়ে যেতে পারে। স্টাইলিস্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান ও বিজিএমইএ সদস্য সালাউদ্দিন চৌধুরীর মতে, দেশের শিল্প খাতে দীর্ঘদিনের গ্যাস সংকট এখন আরও প্রকট আকার ধারণ করেছে। তার ভাষায়, শিল্পায়ন, নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে এটি অন্যতম বড় বাধা। তিনি বলেন, শিল্পে গ্যাস সংকটের বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে তুলে ধরা হলেও কার্যকর সমাধান হয়নি। বরং পরিস্থিতির উন্নতি না হয়ে আরও খারাপ হয়েছে। কোথাও প্রয়োজনীয় চাপের তুলনায় গ্যাসের প্রেসার অনেক কম, আবার কোথাও একেবারেই গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। তার মতে, গত কয়েক বছর ধরেই গ্যাস সংকটের কারণে বাংলাদেশ সম্ভাবনাময় বিদেশি বিনিয়োগ হারাচ্ছে।
একইসঙ্গে তৈরি পোশাক শিল্পেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। উৎপাদন কমে যাওয়ায় কিছু বিদেশি ক্রেতা তাদের ক্রয়াদেশ অন্য দেশে স্থানান্তর করছেন। এতে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান আর্থিক সংকটে পড়ছে এবং খেলাপির ঝুঁকিও বাড়ছে। তিতাস গ্যাসের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, টঙ্গী, জয়দেবপুর, চন্দ্রা, মাওনা ও কালীগঞ্জ অঞ্চল মিলিয়ে গাজীপুরে প্রতিদিন প্রায় ৫৯০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা রয়েছে। বর্তমানে সরবরাহ হচ্ছে গড়ে ৩৬০ মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ প্রতিদিন প্রায় ২৩০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি রয়েছে। শিল্প মালিক, শ্রমিক ও পরিবহন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গাজীপুরের গ্যাস সংকট শুধু একটি জেলার সমস্যা নয়।
দেশের রপ্তানি আয়, শিল্প উৎপাদন ও সামগ্রিক অর্থনীতির সঙ্গেও এটি সরাসরি জড়িত। তাদের দাবি, শিল্পাঞ্চলে দ্রুত স্থিতিশীল গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি উভয় ধরনের কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি শিল্পোন্নত দেশগুলোর সফল মডেল অনুসরণ করে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং শিল্পের চাহিদা অনুযায়ী নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহের পরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়ন করা জরুরি। অন্যথায় দেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি খাত আরও বড় সংকটের মুখে পড়তে পারে।
