২০২৪ সালে তীব্র গরমে বাংলাদেশের ক্ষতি ১৮০ কোটি ডলার

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন

২০২৪ সালে তীব্র গরমে বাংলাদেশের ক্ষতি ১৮০ কোটি ডলার

ফন্ট সাইজ:

তীব্র গরমের কারণে বাংলাদেশে শ্রমের উৎপাদনশীলতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাচ্ছে। নষ্ট হয়ে যাচ্ছে বিপুল কর্মঘণ্টা। ঝুঁকিতে ফেলেছে কর্মসংস্থান। বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাপপ্রবাহের কারণে ২০২৪ সালে দেশের অর্থনীতিতে আনুমানিক ১৩০ কোটি থেকে ১৮০ কোটি (১.৩-১.৮ বিলিয়ন) ডলারের ক্ষতি হয়েছে। এর পরিমাণ দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ০.৩ থেকে ০.৪ শতাংশের সমান। স্থানীয় মুদ্রায় এ ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১৫ হাজার ৮৬০ কোটি থেকে ২১ হাজার ৯৬০ কোটি টাকা পর্যন্ত (প্রতি ডলারে ১২২ টাকা ধরে)। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, তাপমাত্রা ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে উঠলে এই ক্ষতির হার আরও দ্রুতগতিতে বাড়তে থাকে। বিশ্বব্যাংকের ‘এ লিভেবল ফিউচার: প্রোটেক্টিং জবস অ্যান্ড গ্রোথ ফ্রম এক্সট্রিম হিট ইন সাউথ এশিয়াস সিটিজ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। ওয়াশিংটন থেকে এটি প্রকাশিত হয়েছে।

প্রতিবেদনে কর্মসংস্থান, উৎপাদনশীলতা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দৃষ্টিকোণ থেকে চরম তাপপ্রবাহের প্রভাব বিশ্লেষণ করেছে। এতে বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপের শহরগুলোর ওপর তীব্র গরমের অর্থনৈতিক প্রভাব বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, তীব্র গরমের কারণে দক্ষিণ এশিয়া প্রতি বছর প্রায় ৩ কোটি ১০ লাখ পূর্ণকালীন চাকরির সমপরিমাণ কর্মঘণ্টা হারাচ্ছে। তাপের কারণে হারানো কর্মঘণ্টাকে পূর্ণকালীন চাকরির সমপরিমাণে হিসাব করলে দক্ষিণ এশিয়ার আটটি শহরের মধ্যে ঢাকার ক্ষতিই সবচেয়ে বেশি। বর্তমানে ঢাকায় বছরে মোট কর্মঘণ্টার প্রায় ৩ শতাংশ তাপজনিত কারণে অপচয় হচ্ছে, যা প্রায় ৪ লাখ ৬৫ হাজার পূর্ণকালীন চাকরির সমপরিমাণ।

২০৫০ সালে এই ক্ষতি বেড়ে দাঁড়াবে ৭ লাখ ৮ হাজার চাকরির সমপরিমাণে, আর ২০৮০ সালে তা পৌঁছাবে প্রায় ১৬ লাখ ৫০ হাজারে, অর্থাৎ কর্মঘণ্টার ক্ষতির হার বেড়ে দাঁড়াবে ৭.৪ শতাংশে। তুলনায় কলকাতায় এই সংখ্যা ২০৮০ সালে দাঁড়াবে প্রায় ৮ লাখ ৩৩ হাজার এবং নয়াদিল্লিতে প্রায় ৬ লাখ ২৯ হাজার- অর্থাৎ ঢাকার ক্ষতি এই দুই শহরের চেয়েও বেশি। তৈরি পোশাক খাতে ক্ষতির আশঙ্কাও উল্লেখযোগ্য।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাপজনিত চাপ মোকাবিলায় কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশের পোশাক খাত ২০৩০ সালের মধ্যে মিলিতভাবে প্রায় ৬৫.৮ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি আয় হারাতে পারে। তবে ইতিবাচক দিক হলো, সরকারের গ্রিন ট্রান্সফরমেশন ফান্ডের সহায়তায় ২০১৬ সাল থেকে শুরু হওয়া উদ্যোগে বাংলাদেশের ২৭০টির বেশি কারখানা ইতিমধ্যে পরিবেশবান্ধব ‘লিডারশিপ ইন এনার্জি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ডিজাইন’ সনদ অর্জন করেছে, যা এই ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বিদ্যুৎ খাতেও গরমের আর্থিক প্রভাব স্পষ্ট। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৬ সালের এপ্রিলের তাপপ্রবাহের সময় দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ২৩৭ মেগাওয়াট, বিপরীতে উৎপাদন হয় মাত্র ১৩ হাজার ৯৮৮ মেগাওয়াট। প্রায় ২ হাজার ২০০ মেগাওয়াটের এই ঘাটতি ও জ্বালানি সরবরাহ সংকটের কারণে দেশ জুড়ে পালাক্রমে লোডশেডিং করতে হয়, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে শিল্পোৎপাদন ও ব্যবসা-বাণিজ্যে। এ ছাড়া ২০২৪ সালের তাপপ্রবাহে দেশের কয়েকটি মহাসড়কে বিটুমিন গলে যাওয়ার ঘটনাও উল্লেখ করা হয়েছে, যা সড়ক অবকাঠামো মেরামতে বাড়তি ব্যয়ের ইঙ্গিত দেয়।

তবে ঝুঁকি মোকাবিলায় খরচ কমানোর পথও দেখানো হয়েছে প্রতিবেদনটিতে। এতে বলা হয়েছে, ভারতের আহমেদাবাদে চালু হওয়া তাপ কর্মপরিকল্পনার মতো আগাম সতর্কতা ব্যবস্থায় প্রতি ১ ডলার বিনিয়োগে প্রায় ৫০ ডলার সমমূল্যের সুফল পাওয়া সম্ভব। বাংলাদেশও একই পথে এগোচ্ছে বলে জানানো হয়েছে প্রতিবেদনে। ২০২৪ সালের এপ্রিলে বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি বিশ্বের প্রথম পূর্বাভাসভিত্তিক তাপপ্রবাহ সহায়তা কর্মসূচি চালু করে, যার আওতায় প্রায় ৪ হাজার ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারকে মুঠোফোন ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে প্রতি পরিবারকে ৫ হাজার টাকা করে সহায়তা দেয়া হয়।

এদিকে গরম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রে (এসি) মানুষের ব্যয়ও বাড়ছে দ্রুতগতিতে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার এসি বিক্রি হয়েছে, যা পাঁচ বছর আগের তুলনায় তিন গুণ বেশি। এই ব্যয় পরিবারের বাজেটে বাড়তি চাপ তৈরি করলেও দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যঝুঁকি ও উৎপাদনশীলতা হ্রাসের ক্ষতি এড়াতে সহায়ক হতে পারে বলে মত বিশেষজ্ঞদের। তারা বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার শহরগুলোই এই অঞ্চলের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু। এখানেই মানুষ, কর্মসংস্থান, অবকাঠামো, ব্যবসা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সবচেয়ে বড় কেন্দ্রীভবন ঘটেছে। কিন্তু উষ্ণায়নের কারণে শহরগুলো এখন সবচেয়ে কঠিন চাপের মুখে রয়েছে এবং চরম তাপমাত্রা একটি জরুরি উন্নয়ন ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে।

ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা, অবকাঠামোর নির্ভরযোগ্যতা, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ব্যবস্থার কার্যকারিতা ব্যাহত করছে এবং পরিবার ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের জ্বালানি চাহিদা বাড়িয়ে দিচ্ছে। তাই তাপপ্রবাহ আর সাময়িক সমস্যা নয়; এটি আবাসন, পরিবহন, বিদ্যুৎ, পানি, স্বাস্থ্য, শিল্প এবং সরকারি অর্থায়নের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ। আজ আবাসন, পরিবহন, স্কুল, হাসপাতাল, শিল্পাঞ্চল, উন্মুক্ত স্থান কিংবা বিদ্যুৎ ব্যবস্থা নিয়ে যে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে, সেটিই আগামী কয়েক দশক মানুষের তাপঝুঁকি নির্ধারণ করবে। উন্নত ভবন নকশা, প্রাকৃতিক শীতলীকরণ, ছায়া, গাছপালা, প্রতিফলক নির্মাণসামগ্রী, জলবায়ু-সহনশীল বিদ্যুৎ ব্যবস্থা এবং দক্ষ কুলিং প্রযুক্তির মাধ্যমে শহরগুলোকে আরও উৎপাদনশীল, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বাসযোগ্য করে তোলা সম্ভব।

প্রতিবেদনে ১৫টি সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে- তাপপ্রবাহের সময় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা, দুর্যোগ ঝুঁকি তহবিলে তাপকে অন্তর্ভুক্ত করা এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য সাশ্রয়ী অর্থায়নের ব্যবস্থা করা। তাপ মোকাবিলায় এখন বিনিয়োগ না করলে ভবিষ্যতে তার আর্থিক মূল্য অনেক বেশি দিতে হবে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন