সিডনির অগ্নিকাণ্ডে স্বপ্নের সমাধি, বাঁচলেন শুধু মা, হারালেন ছেলে-পুত্রবধূ ও নাতিকে

সিডনির অগ্নিকাণ্ডে স্বপ্নের সমাধি, বাঁচলেন শুধু মা, হারালেন ছেলে-পুত্রবধূ ও নাতিকে

ফন্ট সাইজ:

ত্রিশ বছরের প্রবাসজীবন। পরিশ্রম, স্বপ্ন আর পরিবারকে ঘিরে গড়ে ওঠা এক নীরব সংসার। সেই সংসারই মুহূর্তের মধ্যে পরিণত হলো ছাইয়ে। অস্ট্রেলিয়ার সিডনির ওয়াইলি পার্কে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে একই পরিবারের তিন সদস্যের মৃত্যু শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়, প্রবাসজীবনের এক হৃদয়বিদারক ট্র্যাজেডিতে পরিণত হয়েছে।
নিহতরা হলেন চীনা বংশোদ্ভূত ৫২ বছর বয়সী ইউ ইউন থমাস ঝং, তার ৪৩ বছর বয়সী স্ত্রী কাইচান ঝাও এবং তাদের ১৬ বছর বয়সী ছেলে স্যামুয়েল ঝং। পরিবারটি সিডনির ওয়াইলি পার্কের কর্নেলিয়া স্ট্রিটের একটি বাড়ির পেছনের গ্র্যানি ফ্ল্যাটে বসবাস করত। সামনের মূল বাড়িতে থাকতেন ঝংয়ের বৃদ্ধ মা। আগুনের ভয়াবহতা থেকে তিনি অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান, কিন্তু চোখের সামনে হারান ছেলে, পুত্রবধূ ও নাতিকে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, রাতের নীরবতা ভেঙে আগুনের খবর ছড়িয়ে পড়তেই প্রতিবেশীরা ছুটে আসেন। কিন্তু তখন আগুন এতটাই ভয়াবহ রূপ নিয়েছে যে, কেউ ভেতরে প্রবেশ করার সাহস পাননি। অসহায় এক মায়ের আর্তনাদ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। নিজের সন্তানকে বাঁচাতে তিনি আগুনের মধ্যে ঢুকে পড়ার চেষ্টা করলে প্রতিবেশীরা তাকে ধরে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যান। সেই মুহূর্তের দৃশ্য এখনো এলাকাবাসীর চোখে ভাসছে।

নিউ সাউথ ওয়েলস ফায়ার অ্যান্ড রেসকিউ বিভাগের কমিশনার জেরেমি ফিউট্রেল ঘটনাটিকে "একটি ভয়াবহ ট্র্যাজেডি" বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি জানান, গ্র্যানি ফ্ল্যাটে যাওয়ার পথ ছিল অত্যন্ত সংকীর্ণ। দমকলকর্মীরা পৌঁছানোর আগেই আগুন পুরো কাঠামো গ্রাস করে ফেলে। জানালা ও অন্যান্য খোলা অংশ দিয়ে আগুনের লেলিহান শিখা বের হচ্ছিল। এমন পরিস্থিতিতে ভেতরে আটকে পড়াদের উদ্ধার করা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়ে।
ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে নিউ সাউথ ওয়েলস পুলিশ, অগ্নিকাণ্ড তদন্তকারী বিশেষজ্ঞ এবং স্টেট ক্রাইম কমান্ডের অগ্নিসংযোগ তদন্ত দল যৌথভাবে কাজ করছে। প্রাথমিকভাবে বৈদ্যুতিক ত্রুটি থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হলেও তদন্তকারীরা বলছেন, পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হচ্ছে না।
বাংলাদেশি অধ্যুষিত ওয়াইলি পার্ক এলাকায় এই মর্মান্তিক ঘটনা গভীর শোকের ছায়া ফেলেছে। প্রতিবেশীদের ভাষ্য, ঝং পরিবার ছিল অত্যন্ত শান্ত, নিরীহ এবং সবার সঙ্গে আন্তরিক সম্পর্ক বজায় রাখা একটি পরিবার। তাদের এমন করুণ পরিণতি কেউ কল্পনাও করেননি।
একজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, রাতের আগুন শুধু একটি বাড়ি পোড়ায়নি, একটি পরিবারকেই পৃথিবী থেকে মুছে দিয়েছে।
গত ২৯ জুলাই বুধবার দিবাগত রাত প্রায় ১০টার দিকে কর্নেলিয়া স্ট্রিটের একটি বাড়ির পেছনের গ্র্যানি ফ্ল্যাটে আগুন লাগে। দমকল বাহিনী আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার পর সেখান থেকে একই পরিবারের তিন সদস্যের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে ঘটনাস্থলকে অপরাধস্থল ঘোষণা করে তদন্ত শুরু করে নিউ সাউথ ওয়েলস পুলিশ।
এখন পুরো এলাকার মানুষের একটাই প্রশ্ন—কীভাবে এক রাতেই নিভে গেল তিনটি প্রাণ? সেই উত্তর মিলবে তদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে। কিন্তু যে স্বপ্নগুলো আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে, সেগুলো আর কোনো দিন ফিরে আসবে না।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন