রাজধানীর উত্তরায় র্যাব-১ কার্যালয়ের কথিত ‘আয়নাঘর’ বা টর্চার সেল পরিদর্শন করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারপতি, প্রসিকিউটর, তদন্ত সংস্থার সদস্য, ভুক্তভোগী পরিবারের প্রতিনিধি ও মানবাধিকার কর্মীরা।
পরিদর্শন শেষে ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘আয়নাঘর’ কোনো রূপকথা নয়; এটি বিগত সরকারের ‘ফ্যাসিবাদী’ শাসনের নির্মম বাস্তবতার সাক্ষ্য বহন করে। শনিবার সকালে অনুষ্ঠিত এ বিচারিক পরিদর্শনে ট্রাইব্যুনালের তিন বিচারপতি, প্রসিকিউশন টিম, আসামিপক্ষের আইনজীবী এবং গণমাধ্যমকর্মীরাও উপস্থিত ছিলেন।
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিধিমালা এবং রোম স্ট্যাটিউটের সংশ্লিষ্ট বিধান অনুযায়ী এই বিচারিক পরিদর্শন পরিচালিত হয়েছে। সারা বিশ্ব যে ‘আয়নাঘর’ সম্পর্কে শুনে এসেছে, বাস্তবে সেটি কতটা ভয়াবহ নির্যাতনকেন্দ্র ছিল, তা সরেজমিনে দেখতেই এ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
তিনি জানান, পরিদর্শনে ছোট-বড় মিলিয়ে মোট ২৯টি কক্ষ শনাক্ত করা হয়েছে। এসব কক্ষে মানুষকে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর আটকে রাখা হতো। কক্ষগুলো এতটাই ছোট যে একজন মানুষ স্বাভাবিকভাবে সোজা হয়ে শুয়ে থাকতে পারতেন না।
আয়নাঘর সম্পর্কে আমিনুল ইসলাম বলেন, তদন্তের শুরুতে র্যাব-১ কার্যালয়ের টাস্ক ফোর্সেস ইন্টারোগেশন (টিএফআই) সেলের প্রকৃত অবকাঠামো খুঁজে পেতে তদন্তকারীরা বিভ্রান্তির মুখে পড়েন। কারণ, একাধিক কক্ষ নতুন দেয়াল তুলে আড়াল করা হয়েছিল। পরে ভুক্তভোগীদের বর্ণনার সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির অমিল দেখে সন্দেহের ভিত্তিতে ওই দেয়ালগুলো সরানো হলে একে একে গোপন কক্ষগুলোর অস্তিত্ব বেরিয়ে আসে।
তিনি দাবি করেন, প্রাথমিক তদন্তে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ এবং ব্যারিস্টার আরমানকে এই সেলে আটকে রাখার তথ্য পাওয়া গেছে। এছাড়া এখন পর্যন্ত গুম হওয়া প্রায় ২৫০ জনেরও বেশি ব্যক্তির কোনো সন্ধান মেলেনি।
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, কাউকে গ্রেপ্তারের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আদালতে হাজির করার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা এবং ফৌজদারি কার্যবিধির সংশ্লিষ্ট বিধান এই গোপন আটককেন্দ্রগুলোর ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা হয়েছে। এসব ঘটনা স্পষ্টতই মানবতাবিরোধী অপরাধের মধ্যে পড়ে।
তিনি আরও বলেন, শুধু মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা নন, ‘সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটি’র আওতায় থাকা ঊর্ধ্বতন ব্যক্তিরা এবং এই শাসনব্যবস্থাকে সহায়তাকারীদের বিরুদ্ধেও আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে।
আমিনুল ইসলাম জানান, আগামী শনিবার সেনানিবাসের ভেতরে ডিজিএফআইয়ের ইন্টারোগেশন সেল (জিআইসি) পরিদর্শনের পরিকল্পনা রয়েছে।
তদন্তের স্বচ্ছতা নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্রসিকিউশন টিম সার্বক্ষণিক তদন্ত কার্যক্রম তদারকি করছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হচ্ছে। এ পরিদর্শনের ভিত্তিতে একটি বিচারিক স্মারক (মেমোরেন্ডাম) প্রস্তুত করা হবে, যা ট্রাইব্যুনালের বিচারিক কার্যক্রমের অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হবে।
