রাঙামাটিতে ১০ লাখ টাকা চাঁদা না পেয়ে ফলজ পেঁপে বাগান কেটে দিলো পাহাড়ি সন্ত্রাসীরা

ফন্ট সাইজ:

পার্বত্য চট্টগ্রামে দীর্ঘদিন ধরে সশস্ত্র আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে সেই অভিযোগ আরও বেড়েছে বলে দাবি করছেন স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী ও কৃষকরা। অভিযোগ রয়েছে, শুধু বড় ব্যবসায়ী নয়, এখন সাধারণ কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, ঠিকাদার, পরিবহন মালিক, এমনকি পাহাড়ি ও বাঙালি উভয় সম্প্রদায়ের সাধারণ মানুষের কাছ থেকেও বিভিন্ন অঙ্কের চাঁদা দাবি করা হচ্ছে। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে হুমকি, অপহরণ, মারধর, ফসল নষ্ট কিংবা সম্পদ ধ্বংসের মতো ঘটনারও অভিযোগ রয়েছে।

এমন অভিযোগের মধ্যেই এবার রাঙামাটি শহরের উপকণ্ঠে ১০ লাখ টাকা চাঁদা না পেয়ে একটি পেঁপে বাগানের প্রায় ৮০০টি ফলবান গাছ কেটে ধ্বংস করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এতে প্রায় ১০ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করেছেন ক্ষতিগ্রস্ত বাগান মালিক। শুক্রবার ভোরে রাঙামাটি পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের রাঙ্গাপানির নোয়াদাম ব্রাহ্মণটিলা (আসামবস্তী সংলগ্ন) এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। দুর্বৃত্তরা রাতের আঁধারে ধারালো অস্ত্র দিয়ে শত শত ফলধরা পেঁপে গাছ কেটে ফেলে যায়। এতে বাজারজাতের উপযোগী বিপুল পরিমাণ ফল নষ্ট হয়েছে বলে জানা গেছে। শুক্রবার বিকেলে সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বাগানের বিস্তীর্ণ এলাকায় সারি সারি পেঁপে গাছ মাটিতে লুটিয়ে আছে। অধিকাংশ গাছেই কাঁচা ও আধাপাকা পেঁপে ঝুলছিল। আগামী এক মাসের মধ্যে যেসব গাছের ফল বাজারে তোলার কথা ছিল, সেগুলোই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

বাগান মালিক মো. খলিলুর রহমান জানান, প্রায় এক একর জমি লিজ নিয়ে তিনি প্রায় ১ হাজার ৮০০টি পেঁপে গাছ রোপণ করেছিলেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ফলনশীল প্রায় ৮০০টি গাছ বেছে বেছে কেটে দেওয়া হয়েছে। তিনি অভিযোগ করে বলেন, কয়েক মাসের পরিশ্রমে গড়ে তোলা বাগান এক রাতেই ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। যেসব গাছে সবচেয়ে বেশি ফল ধরেছিল, সেগুলোই কেটে দেওয়া হয়েছে। এতে তিনি প্রায় ১০ লাখ টাকার ক্ষতির মুখে পড়েছেন। খলিলুর রহমানের অভিযোগ, পাহাড়ি সশস্ত্র সংগঠন জেএসএসের কথিত কালেক্টর শান্তি রঞ্জন চাকমা তার কাছে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেছিলেন। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয় এবং শেষ পর্যন্ত রাতের আঁধারে বাগান কেটে দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, “কিছুদিন আগে আমাদের লংগদুর বাড়ির পাশের শিবেরআগা এলাকা থেকে জেএসএসের কথিত কালেক্টর শান্তি রঞ্জন চাকমা ও তার সহযোগী দীপেন চাকমা সবজি চাষিদের কাছ থেকে চাঁদা আদায়ের সময় গ্রেপ্তার হয়। এরপর থেকেই শান্তি রঞ্জন আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। সে আমাকে মোবাইল ফোনে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে। দুই দিন আগেও আমার বাগানে এসে শ্রমিকদের সামনে দ্রুত টাকা না দিলে আমাকে হত্যা করা হবে বলে হুমকি দেয়। চাঁদা না পেয়ে রাতের আঁধারে আমার ফলনশীল পেঁপে গাছগুলো কেটে দিয়েছে। আমি মানসিক ও অর্থনৈতিকভাবে ভেঙে পড়েছি। প্রশাসনের কাছে দ্রুত বিচার ও নিরাপত্তা চাই। বাগানের কেয়ারটেকার মো. জাহিদ বলেন, “রাতে খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। সকালে উঠে দেখি বাগানের বিপুল সংখ্যক গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। যেসব গাছ কাটা হয়েছে, সেগুলোর ফল আগামী এক মাসের মধ্যেই বাজারজাত করার কথা ছিল।”

বাগানে কর্মরত কয়েকজন শ্রমিক জানান, ঘটনার কয়েকদিন আগে তিনজন পাহাড়ি যুবক বাগানে এসে মালিকের খোঁজ করেন। তারা চাঁদা না দিলে এই এলাকায় বাগান করতে দেওয়া হবে না বলে হুমকি দিয়ে যান। পরে বৃহস্পতিবার দিবাগত গভীর রাতে দুর্বৃত্তরা বাগানে ঢুকে ফলধরা পেঁপে গাছগুলো কেটে নষ্ট করে দেয় বলে তাদের দাবি। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, পার্বত্যাঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে চাঁদাবাজি একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিভিন্ন সময়ে ব্যবসায়ী, ঠিকাদার, কাঠ ব্যবসায়ী, ইটভাটা মালিক, পরিবহন ব্যবসায়ী, কৃষক এবং বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকেও চাঁদা দাবির অভিযোগ উঠেছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, পার্বত্যাঞ্চলে সশস্ত্র সংগঠনগুলোর অর্থের প্রধান উৎস হিসেবে দীর্ঘদিন ধরেই চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, চাঁদা আদায়ের জন্য কখনো মোবাইল ফোনে হুমকি, কখনো সরাসরি উপস্থিত হয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শন, আবার কখনো অপহরণ কিংবা সম্পদ ধ্বংসের মতো ঘটনাও ঘটে থাকে। এতে সাধারণ মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন এবং কৃষি ও ব্যবসায় বিনিয়োগে অনীহা তৈরি হচ্ছে। এদিকে, ঘটনার পর শুক্রবার বিকেলে নিরাপত্তা বাহিনীর কয়েকটি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। রাঙামাটি কোতয়ালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন বলেন, “লোকমুখে খবর পেয়ে আমরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। এখনো পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক লিখিত অভিযোগ দেননি। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন