পশ্চিমা দেশগুলোতে ‘রাজনীতি’ নিয়ে একটি বহুল প্রচলিত কৌতুক আছে। গলাবাজ লোকগুলো পাবলিককে হাজারো লোভনীয় কথার ফুলঝুরিতে হিপনোটাইজ করে ফেলে। একসময় আমজনতা গলাবাজ লোকদের কথায় বিশ্বাস করে। তাদের কথায় ওঠে-বসে। সুযোগ বুঝে ছলাকলা করে তারা যাত্রীতে ভরপুর ‘খেয়া’ নৌকায় বিষম দোল দেয়। যেন তুফান উঠেছে। অগত্যা দয়া পরবশ হয়ে গলাবাজ জনদরদীরা দুঃসাধ্য কষ্ট করার কসরত দেখায়। কৃত্রিমভাবে সৃষ্ট বিপদসংকুল জনতার বিপুল দাবির মুখে নৌযান কূলে ভিড়িয়ে বিশ্বাস করানো হয়, সত্যিই ঝড় উঠেছিল। আর জনদরদী না থাকলে ঝঞ্ঝা-বিক্ষুব্ধ বিপদ থেকে পরিত্রাণের কোনো উপায়ই ছিল না! এটাই রাজনীতি আর এরকমটাই নেতাদের ভূমিকা।
যুদ্ধ আর প্রেমের বেলায় সবকিছুই নাকি সঠিক। এ তত্ত্ব এখন বৈশ্বিক রাজনীতিকে বেশ ভালোভাবেই নাড়া দিচ্ছে। ‘নেতার’ ইচ্ছা আর খামখেয়াল এখন বিশ্ববাসীকে মুরগির খাঁচায় পুরে রাখা বন্দিশিবিরে পরিণত করছে যেন! যখন তখন জাহাজে করে তুলে নিয়ে খায়েশ পূরণের বয়ান দিলেই আর সব ভড়কে যাবে?
বিশ্বসাহিত্যের ভাষ্যে ‘ন্যাচারাল জাস্টিসের’ দিকেও দৃষ্টি দেয়া যাক। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিকে শাস্তির জন্য ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ বাক্স বাছাই করে নেয়ার বিশেষ সুযোগ দিলেন বিচারক। (উল্লেখ্য, এখানে এবারের গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ বোঝানো হয়নি)। একই চেহারার দু’টি বাক্স দিয়ে বলা হলো বেছে নাও। সারাদিন বাক্স সামনে করে বসে থাকলো দণ্ডপ্রাপ্ত। দিনশেষে বেছে নিলো একটা এবং সেটা ছিল মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তির। আসামি অবশেষে স্বীকার করে নিলো নিজের অপরাধ। অসচেতন আমজনতাও নির্বাচনে নেতা বাছাই করে। নেতার কর্মকাণ্ডের দায় ভোগ করে। সে কি নিজের ভুল স্বীকার করে? না, অত জটিল-কঠিন প্রশ্ন আজকে থাক।
জনসাধারণের চোখে নেতা হলো বক্তৃতার লাউড স্পিকার। আর নেতার চোখে জনসাধারণ শুধুই ভোট, অসংখ্য ব্যালট পেপার।
ব্যালট পেপারের সঙ্গে সঙ্গেই আসে নির্বাচনের কথা। দুনিয়ার সবচেয়ে কঠিন নির্বাচন নাকি স্ত্রী বাছাই করা। না, ঘর বাঁধার স্বপ্নে বিভোর কথাবার্তা আজকে বলা ঠিক হবে না। গোটা জনমণ্ডলির ভাগ্য নির্ধারণী নির্বাচন ঘনিয়ে আসছে। তাই নিয়েই আজকে আলাপ করা যাক।
একসময় নির্বাচনী আইনকানুন অতটা কঠোর ছিল না। ইউনিয়ন, উপজেলা, সংসদ- যেকোনো নির্বাচন এলেই আমার গ্রামের এক লোকের সেই নির্বাচনে দাঁড়ানোর অভ্যাস। বাতিকগ্রস্ত যাকে বলে। অনেক নির্ঘুম রাতের পর নির্বাচন হয়ে গেল। ফলাফল নিয়ে বাড়ি এলেই ঘটলো বিপত্তি। ঝাঁটা নিয়ে তার স্ত্রী তাকে পেটানো শুরু করলো। স্ত্রীর অভিযোগ- সারাজীবন তোমার ভোট অইলো দুইটা। তোমার একটা, আমার একটা। এইবার ভোট তিনটা হইলো কী কইরা? নিশ্চয়ই ভোটের নামে ইটিসপিটিস কইরা বেড়াইছো! মাইয়্যা মানুষ জুটাইয়া লইছো! দেখাই মজা! পরবর্তীতে তিনি আর কোনোদিন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন কিনা, গ্রাম ছেড়ে শহরবাসী হওয়ায় আমি আর সে খবর রাখতে পারিনি।
জেলা শহরে থাকি। আমার ঘনিষ্ঠ সহকর্মীর সঙ্গে অনেক গল্পই হয়, সেখান থেকে নির্বাচনী গল্পটা আপনাদের শুনিয়ে দিই। নির্বাচিত হতে পারলে নির্বাচন সুষ্ঠু, সঠিক। হেরে গেলেই কারচুপির অভিযোগ তুলতে হয়। সূক্ষ্ম কারচুপি, ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং আরও কতো কী! নির্বাচনের ধূম পড়ে গেছে। দিন-রাত পরিশ্রম করতে হচ্ছে নেতাকে। ঘর গেরস্থালির খবর নেয়ার সময় তার নাই। নেতার সন্তানসম্ভবা স্ত্রীকে দলের কর্মীরা হাসপাতালে ভর্তি করেছে। শেষ মুহূর্তের ব্যস্ততায় স্ত্রীর কথা ভুলেই গেছেন। তার মাথায় শুধুই নির্বাচন, নির্বাচন আর নির্বাচন। এদিকে, নির্বাচনের রাত পার হয়ে ভোর হয়ে গেছে। দলের এক কর্মী ছুটে এসে নেতাকে বলছে, হাসপাতালে আপনার স্ত্রীর তিনটি কন্যা সন্তান হয়েছে। ঘুম-ক্লান্তিতে নেতা তখন চিৎকার করে উঠেছে, ‘অসম্ভব! এ হতেই পারে না, আমি আবার গণনার দাবি জানাচ্ছি!’
নির্বাচনী প্রতীক নিয়েও বিড়ম্বনার অন্ত নেই। গ্রাম থেকে আসা দূর সম্পকের্র আত্মীয় এক প্রার্থীর প্রতীক সমস্যা শুনে দুঃখই হচ্ছিল। তার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী নাকি নির্বাচনী প্রতীক বিতরণ করে ফিল্ড ভালো করেছেন। অর্থাৎ নির্বাচনের বৈতরণী পারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করে ফেলেছেন। আমি সহজ উপদেশ দিয়ে দিলাম, আপনিও প্রতীক বিতরণ করলে পারেন। ভদ্রলোক বিনীতভাবে জানালেন, ‘বিষয়টা আমি নিজেই ভেবেছিলাম। তবে কূল-কিনারা পেলাম না। আমার প্রতীক হলো হাতি।’
তার সমস্যার গভীরতা জেনে নিজেই বিব্রতবোধ করছিলাম। কেননা সার্কাস আর চিড়িয়াখানার তাবৎ হাতি জোগাড় করলেও এর সুরাহা হবে না। বরং এতে হাতি দর্শনের সৌভাগ্য থেকে বঙ্গসন্তানদের চিরতরে বঞ্চিত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
টিভিতে চোখ রাখছিলাম। পাঁচমিশালী আয়োজনের ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানে প্রশ্নোত্তর পর্বে জিজ্ঞাসা ছিল- ডাকাত আর নেতার মধ্যে তফাৎ কী? উত্তরদাতা বেশ রঙ্গ করে বলে দিলেন, ‘ডাকাত ডাকাতি করে জেলে যায়। আর নেতা জেল থেকে বের হয়ে নির্বাচিত হয়। নির্বাচনী লাইসেন্স পেয়ে ডাকাতি শুরু করে।’ ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় সেসব বলা না গেলেও গদিহারা হলে ‘ইল নিউজগুলো’ ভার্চ্যুয়াল পাতায় ভেসে বেড়ায়।
আবার দেশের বাইরে দৃষ্টি দেয়া যাক। ১৯৮৯ সাল। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী নিহত হওয়ার পর দিল্লির ক্ষমতায় বসেছিলেন তারপুত্র উড়োজাহাজের পাইলট রাজীব গান্ধী (২০শে আগস্ট, ১৯৪৪-২১শে মে, ১৯৯১)। রাজনীতিতে ক্ষমতা, ক্ষমতার অপব্যবহার, কেলেঙ্কারি এসব কম-বেশি থাকেই। নির্বাচন ঘনিয়ে এলো। রাজীবের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠলো। রাজীব গান্ধী তেহেলকা ডটকম নামের আর্থিক কেলেঙ্কারিতে পড়ে গেলেন। বিরোধী মহল স্লোগান দেয়া শুরু করলো, গলি গলি মে শোর হ্যায় রাজীব গান্ধী চোর হ্যায়। রাজনীতিতে নবীশ রাজীব চুপ থাকলেন না। মুখ খুললেন। ঠারে, ঠোরে উত্তর দিলেন, ওসব ঘেউ ঘেউ শোনার সময় নাই। এতেও রাজীব সামলাতে পারলেন না। রাজনৈতিক বুলিংয়ের চপেটাঘাত খেলেন আরও জোরে। প্রতিপক্ষ পাল্টা জবাব দিল, চোর দেখলেই কুকুর ঘেউ ঘেউ করে। উল্লেখ্য, সেবারের নির্বাচনে রাজীব জিততে পারেননি।
পাকিস্তানের সামরিক শাসক ছিলেন জেনারেল জিয়াউল হক (১২ই আগস্ট, ১৯২৪-১৭শে আগস্ট, ১৯৮৮)। বিরোধী দলগুলোকে মোটেই তোয়াক্কা করতেন না। রাজনীতিকে শিকেয় তুলে দৌর্দণ্ড প্রতাপে শাসন কার্য চালিয়ে যাচ্ছিলেন। নির্বাচন দেয়ার নামটি নেই। বরং নির্বাচনের নাম শুনলে তেলে-বেগুনে জ¦লে ওঠেন। মাথায় তার অল্প চুল লেপ্টে থাকতো। ক্ষৌরকারের সেগুলো ছাঁটতে বেশ ঝামেলা হতো। নরসুন্দর এই সমস্যার এক চমকপ্রদ কৌশল আবিষ্কার করেছিল। চুল ছাঁটতে গেলে ষোলোচুঙ্গার হাজারো গল্পের ঝুরি থেকে অল্প সল্প সেরে নিয়ে কায়দা করে প্রশ্ন করে বসতো, স্যার ইলেকশন কবে দেবেন? অমনি জেনারেল জিয়ার মেজাজ চড়ে যেতো। ক্ষুরের নিচে গলা রেখে ক্ষৌরকারকে কিছু বলতে পারতেন না। তবে চুল সব খাড়া হতো। এই মোক্ষম সুযোগে চুলছাঁটা হয়ে যেতো। এভাবেই ১৯৮৮ সাল থেকে ১০ বছর ক্ষমতা আঁকড়ে ছিলেন। ১৭শে আগস্ট, ১৯৮৮ বিমান দুর্ঘটনায় তার শাসনামলের যবনিকাপাত ঘটেছিল।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী উইন্সটন চার্চিলের গল্পে ফিরে আসি। রাজনীতিবিদ নেতাদের রসবোধ কেমন তাও এখান থেকে উপভোগ করা যাবে। বৃটিশ পার্লামেন্টের ‘ওয়েজ অ্যান্ড মিন্স’ করিডোরের শেষ প্রান্তের পাবলিক টয়লেট থেকে চার্চিলকে বেরিয়ে আসতে দেখে পার্লামেন্টের এক নবাগত সদস্য থমকে দাঁড়ালেন। তাকিয়ে দেখেন, প্রাইম মিনিস্টারের প্যান্টের বোতাম তখনো খোলা, তিনি সেটা খেয়াল করেননি। অনেক ইতস্তত করার পর নবাগত সদস্যটি পেছন থেকে দৌড়ে এসে বললেন, ‘প্রাইম মিনিস্টার, আমি দেখলাম আপনার গার্ডরুম খোলা রয়েছে।’ চার্চিল বিন্দুমাত্র বিব্রত না হয়ে মুখে দুষ্টুমির হাসি ফুটিয়ে জবাব দিলেন, ‘এবং সেন্ট্রি তখন কী করছিল? সে কী এটেনশন পজিশনে ছিল, নাকি দুটো বালির বস্তার ওপর শোয়া ছিল?’
বিকালের আড্ডায় বসেছিলাম তিন বন্ধু। অধ্যাপক বন্ধু একটু-আধটু লেখালেখি করেন। তার আগামী লেখার পরিকল্পনা আর সমস্যার কথা বলছিল। কী সমস্যা? ‘আমি আমার পূর্বপুরুষের ইতিহাস রচনা করতে চাই। কিন্তু নির্ভরযোগ্য তথ্যের অভাবে লিখতে পারছি না।’ আরেক বন্ধু তাকে সহজ পরামর্শ দিলো। ‘এ আর এমন কঠিন কী? তুমি নির্বাচনে দাঁড়াও। তোমার বিপক্ষ প্রার্থীরা তোমার চৌদ্দ পুরুষের ইতিহাস সব বের করে দেবে।’
নির্বাচন আসে। অসচেতন জনতা আশায় বুক বাঁধে।
ঈশপের গল্পে পড়েছিলাম, কূয়ার মধ্যে ঢিল ছুঁড়লে বাচ্চাদের খেলা জমে, মজা পায়। আর সে খেলাই কূয়ার ব্যাঙের জীবননাশের কারণ হয়। নেতা আর রাজনীতিকদের কাছে আমজনতা সব সময়ই খেলার বস্তু। লেখা শেষের প্রতীকী গল্প সে কথাই বলছে। কয়েকটি সন্তান নিয়ে এক বিপত্নীক এবং একাধিক সন্তান নিয়ে আরেক বিধবা পুনরায় ঘর বেঁধেছে। তাদের দু’জনের যৌথ প্রযোজনায়ও আবার দু’টি বাচ্চা জন্মেছে। সে দুটো সবার ছোট। আগের দু’পক্ষেরগুলো সুযোগ পেলেই পুঁচকে দুটোকে বেদম মার দেয়। ভদ্রলোক অফিসে গেছেন। বাচ্চাদের মারামারি বেধে গেছে। বাসা থেকে মহিলা ফোন করে কর্তাকে বলছে, ‘ওগো, তোমারগুলো আর আমারগুলো মিলে আমাদেরগুলোকে মারছে।’ নির্বাচন আর নেতাদের খেলা-খেলা যেন সেই মহিলার টেলিফোন বার্তা হয়ে উঠেছে। এবার কী পরিত্রাণ মিলবে?
লেখক: অধ্যাপক, রাষ্ট্র্রবিজ্ঞান (অব.), সরকারি বিএল. কলেজ, খুলনা।
যোগাযোগের ঠিকানা: ই-মেইল [email protected]
