চলতি বছরের ৩রা মার্চ দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মোমেন এবং দুই কমিশনার মিঞা মুহাম্মদ আলি আকবার আজিজী ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) হাফিজ আহসান ফরিদ পদত্যাগ করেছেন। গত ৪ঠা মার্চ প্রেসিডেন্ট তাদের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করে প্রজ্ঞাপন জারি করেন। সে হিসাবে প্রায় পাঁচ মাস ধরে চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনার ছাড়াই চলছে দুদক। সাংবিধানিক এই প্রতিষ্ঠানে কমিশন না থাকায় আইন অনুযায়ী অনুমোদননির্ভর গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। নতুন অনুসন্ধান শুরু, মামলা দায়ের, চার্জশিট অনুমোদন, সম্পদ জব্দসহ গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আটকে আছে।
দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর ধারা ১১-এ বলা হয়েছে- ‘কোনো কমিশনার মৃত্যুবরণ বা স্বীয় পদ ত্যাগ করিলে বা অপসারিত হইলে, রাষ্ট্রপতি উক্ত পদ শূন্য হইবার ত্রিশ দিনের মধ্যে, এই আইনের বিধান সাপেক্ষে, কোনো উপযুক্ত ব্যক্তিকে শূন্য পদে নিয়োগদান করিবেন।’ কিন্তু এখনো অভিভাবকহীন দুদক। দুদক সংশ্লিষ্টরা বলছে, ইতিপূর্বে দুই সপ্তাহের বেশি কমিশন শূন্য থাকার নজির নেই।
এ বিষয়ে দুদকের সাবেক মহাপরিচালক (লিগ্যাল) মঈদুল ইসলাম মানবজমিনকে বলেন, দুদক কিংবা এর আগের দুর্নীতি দমন ব্যুরোর ইতিহাসে এত দীর্ঘ সময় কমিশনারের পদ শূন্য থাকার নজির নেই। এমনকি ওয়ান-ইলেভেনের সময়ও দুদকে দুই সপ্তাহের বেশি সময় কমিশনারের পদ শূন্য ছিল না। তিনি বলেন, আইনে শূন্যপদে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নিয়োগের বিধান রয়েছে। সার্চ কমিটি গঠন, আবেদন গ্রহণ এবং সেই প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পরও কেন এত সময় লাগছে, সেটি বোধগম্য নয়।
গত ২২শে জুন দুদক কমিশনার গঠনের জন্য আপিল বিভাগের বিচারপতি মো. রেজাউল হককে সভাপতি করে পাঁচ সদস্যের সার্চ কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন- হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি রাজিক আল জলিল, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক এস এম রেজভী, সরকারী কর্ম কমিশনের চেয়ারম্যান মোবাশ্বের মোনেম এবং মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি। দুদক আইন, ২০০৪-এর ৭ ধারা অনুযায়ী গঠিত এই কমিটি আবেদন যাচাই করে প্রেসিডেন্টের কাছে চূড়ান্ত সুপারিশ পাঠাবে।
নিয়ম অনুযায়ী সার্চ কমিটি নতুন চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগের লক্ষ্যে আগ্রহীদের কাছ থেকে জীবনবৃত্তান্ত আহ্বান করেন। গত ১৩ই জুলাই আবেদন জমা দেয়ার সময়সীমা শেষ হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চেয়ারম্যান ও কমিশনার পদে দেড় শতাধিক আবেদন জমা পড়েছে।
থমকে আছে অনুসন্ধান-মামলা-চার্জশিট: এদিকে কমিশন না থাকায় দুদকের নিয়মিত প্রশাসনিক কার্যক্রম চললেও কমিশনের অনুমোদনসাপেক্ষ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কার্যত ধীরগতি দেখা দিয়েছে। নতুন অনুসন্ধানের অনুমোদন, তদন্ত শেষে মামলা দায়েরের সিদ্ধান্ত, চার্জশিট অনুমোদন এবং অন্যান্য কমিশন-সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত নতুন কমিশনের অপেক্ষায় রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অনুসন্ধান, তদন্ত, মামলা রুজু কিংবা চার্জশিট- দুদকের গুরুত্বপূর্ণ এসব সিদ্ধান্ত নেয়ার একমাত্র ক্ষমতা কমিশনের হাতে। দুর্নীতিবিরোধী সংস্থাটিতে গড়ে প্রতিদিন ৮০ থেকে ১০০টি অভিযোগ আসে। সেই হিসাবে কমিশনে প্রায় ৭-৮ হাজারের বেশি অভিযোগ জমা পড়ে আছে। এসব অভিযোগ যাচাই বাছাইয়ের পর অনুসন্ধানের অনুমোদনও নিতে হয় কমিশন থেকে।
ফলে কমিশন নিয়োগ যত বিলম্বিত হবে, অভিযোগের স্তূপ তত উঁচু হবে। এসব অভিযোগের মধ্যে রয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের একাধিক উপদেষ্টাসহ বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী আমলা, রাজনীতিবিদ এবং ব্যবসায়ী। আরও জানা যায়, দুদকের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা চলমান মামলার তদন্ত শেষ করে প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন। অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তিকে আসামি করে সুপারিশ পেশ করা হয়েছে তদন্ত প্রতিবেদনে।
আসামি করা হয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমেদ তৈয়বকেও। তিনি এখন দেশের বাইরে আছেন। এ ছাড়া পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে পাঁচটি মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা পড়ে আছে। কমিশন না থাকায় এসব প্রতিবেদন আদালতে জমা দিয়ে মামলার বিচারকার্য শুরু করা যাচ্ছে না। কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন করে অনুসন্ধান ও তদন্ত শুরু না হওয়ায় পুরনো মামলা ও অনুসন্ধানের কাজ করছেন তারা। অনেক মামলার তদন্ত ও অনুসন্ধান প্রতিবেদন তারা এই সময়ে তৈরি করে রাখছেন, যাতে কমিশন গঠনের সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেয়া যায়।
দুদকের একাধিক সূত্র জানায়, বহুল আলোচিত পি কে হালদার-সংশ্লিষ্ট আরও অন্তত ১৩টি মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেড থেকে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে প্রস্তুত করা এসব মামলার মধ্যে পাঁচ থেকে ছয়টি কমিশনের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। এসব মামলায় প্রায় ৫০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে দুদকের মুখপাত্র ও উপ-পরিচালক মো. আকতারুল ইসলাম মানবজমিনকে বলেন, আইন ও বিধি অনুযায়ী দুদকের নিয়মিত কার্যক্রম চলমান রয়েছে। অভিযোগ গ্রহণ, প্রাথমিক যাচাই, চলমান অনুসন্ধান ও তদন্তের রুটিন কাজ অব্যাহত আছে। তবে যেসব বিষয়ে কমিশনের অনুমোদন প্রয়োজন, সেসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ আপাতত সম্ভব হচ্ছে না। নতুন কমিশন দায়িত্ব গ্রহণের পর কমিশনের অনুমোদনসাপেক্ষ বিষয়গুলো পর্যায়ক্রমে নিষ্পত্তি করা হবে।
