একসময় আমরা ভয় পেতাম ভেজালকে। পরে ভয় পেয়েছি ফরমালিন, মেলামাইন, বিষাক্ত রং, সিসা ও কীটনাশকের অবশিষ্টাংশকে। এখন সেই তালিকায় যুক্ত হয়েছে এমন এক দূষক, যাকে চোখে দেখা যায় না, স্বাদে বোঝা যায় না, কিন্তু প্রতিদিন আমাদের শরীরে প্রবেশ করছে মাইক্রোপ্লাস্টিক। এটি আর কল্পনা নয়; এটি গবেষণায় প্রমাণিত বাস্তবতা।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) ও বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) যৌথ গবেষণায় রাজধানীর বাজার থেকে সংগ্রহ করা সয়াবিন তেলে প্রতি লিটারে গড়ে ৫৩ হাজার ৯২২টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা শনাক্ত হয়েছে। বোতলজাত তেলের চেয়ে খোলা তেলে দূষণ অন্তত ১.২৪ গুণ বেশি। এর কিছুদিন আগে পরিবেশ ও সামাজিক উন্নয়ন সংস্থা (ইএসডিও) বাংলাদেশের বাজারে বিক্রি হওয়া অধিকাংশ টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত করেছিল। সর্বশেষ Journal of Food Composition and Analysis-এ প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেল, দেশের বাজারে বিক্রি হওয়া চিনির ৯৫ শতাংশ নমুনায় মাইক্রোপ্লাস্টিক রয়েছে।
একটি গবেষণা ভুল হতে পারে। দুটি গবেষণায় প্রশ্ন উঠতে পারে। কিন্তু যখন একই দেশে ভিন্ন ভিন্ন গবেষণা, ভিন্ন ভিন্ন খাদ্যপণ্যে একই ধরনের দূষণের চিত্র তুলে ধরে, তখন সেটিকে আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তখন সেটি একটি জনস্বাস্থ্য সতর্কবার্তা। বিশ্বও একই সতর্কবার্তা শুনছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) বলছে, মানুষ খাদ্য, পানি ও বাতাসের মাধ্যমে নিয়মিত মাইক্রোপ্লাস্টিক গ্রহণ করছে। দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যপ্রভাব নিয়ে এখনো গবেষণা চললেও বিষয়টি জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগ। European Food Safety Authority (EFSA) বহু বছর ধরে খাদ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিকের ঝুঁকি মূল্যায়ন করছে। European Chemicals Agency (ECHA) প্রসাধনীসহ বিভিন্ন পণ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে ব্যবহৃত মাইক্রোপ্লাস্টিকের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্লাস্টিক কৌশল (European Strategy for Plastics) এবং Single-Use Plastics Directive-এর লক্ষ্যও একই প্লাস্টিকের উৎস কমানো, যাতে খাদ্য ও পরিবেশে এর বিস্তার কমে।
অর্থাৎ উন্নত বিশ্ব এখন প্রশ্ন করছে না, "মাইক্রোপ্লাস্টিক আছে কি?" তারা প্রশ্ন করছে, "কীভাবে এটি কমানো যায়?"
বিজ্ঞানও দ্রুত এগোচ্ছে। ২০২২ সালে নেদারল্যান্ডসের গবেষকেরা প্রথমবার মানুষের রক্তে মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত করেন। এরপর মানব প্লাসেন্টা, ফুসফুস, হৃদ্পেশি, এমনকি সাম্প্রতিক গবেষণায় মানব মস্তিষ্কেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতির তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। Nature Medicine-এ প্রকাশিত সাম্প্রতিক গবেষণা দেখিয়েছে, মানবদেহের বিভিন্ন অঙ্গে ন্যানোপ্লাস্টিক ও মাইক্রোপ্লাস্টিক জমা হতে পারে। যদিও এগুলো থেকে এখনই নির্দিষ্ট কোনো রোগের কারণ হিসেবে মাইক্রোপ্লাস্টিককে চূড়ান্তভাবে দায়ী করা যায় না, তবু বিজ্ঞানীরা একমত এই প্রবণতাকে অবহেলা করার সুযোগ নেই।
বাংলাদেশের গবেষণাগুলোর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দূষণের উৎস সম্পর্কে ধারণা। তেলে শনাক্ত হয়েছে এলডিপিই, এইচডিপিই, পিপি, পিইটি, পলিইউরেথেন ও নাইলন। চিনিতে পাওয়া গেছে এবিএস, পিভিসি, পিইটি, পিটিএফই, এইচডিপিইসহ আরও কয়েক ধরনের পলিমার। এগুলো খাদ্যে এসেছে সম্ভবত উৎপাদন, পরিশোধন, প্লাস্টিকের পাইপ, কনভেয়ার বেল্ট, প্যাকেজিং, পরিবহন, সংরক্ষণ এবং বাজারজাতকরণের বিভিন্ন ধাপ থেকে। খোলা তেলে দূষণের মাত্রা বেশি হওয়ায় স্পষ্ট যে, আমাদের বাজার ব্যবস্থাপনাও এই সমস্যাকে বাড়িয়ে দিচ্ছে।
এই বাস্তবতায় সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, বাংলাদেশে খাদ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিকের কোনো জাতীয় মানদণ্ড নেই। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ), বিএসটিআই কিংবা সংশ্লিষ্ট কোনো নিয়ন্ত্রক সংস্থা এখনো নিয়মিতভাবে খাদ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক পরীক্ষা করে না। দেশে খাদ্য আমদানি, উৎপাদন কিংবা বাজারজাতকরণের ক্ষেত্রে এ বিষয়ে বাধ্যতামূলক কোনো পরীক্ষাও নেই।
অথচ ইউরোপে REACH Regulation, EU Green Deal, Circular Economy Action Plan এবং প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার একাধিক নীতিমালা ইতোমধ্যে শিল্পকারখানাকে নতুন মানদণ্ডে নিয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রে Food and Drug Administration (FDA) এবং Environmental Protection Agency (EPA) মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ে গবেষণা সম্প্রসারণ করছে। কানাডা ও অস্ট্রেলিয়াও জাতীয় পর্যায়ে পর্যবেক্ষণ কর্মসূচি শুরু করেছে।
বাংলাদেশ কি সেই পথ অনুসরণ করবে?
আমাদের নীতিনির্ধারকদের সামনে এখন তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ।
প্রথমত, খাদ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক পর্যবেক্ষণকে নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থার অংশ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, খাদ্যশিল্পে আন্তর্জাতিক মানের ফিল্টার, খাদ্যগ্রেড পাইপলাইন ও প্যাকেজিং নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, খোলা তেল, খোলা চিনি ও উন্মুক্ত খাদ্য বিক্রির প্রচলিত ব্যবস্থাকে কঠোর নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে।
এর সঙ্গে আরও একটি বিষয় যুক্ত হওয়া জরুরি গবেষণা। বাংলাদেশে মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ে গবেষণা এখনো সীমিত। অথচ দেশের নদী, মাটি, মাছ, চাল, সবজি, ফল, দুধ, লবণ, মধু এবং পানীয় জলেও একই ধরনের সমীক্ষা এখন সময়ের দাবি। কারণ তেল, চিনি ও টুথপেস্ট যদি দূষিত হয়, তাহলে খাদ্যশৃঙ্খলের অন্য অংশগুলোও সম্পূর্ণ নিরাপদ এমন নিশ্চয়তা দেওয়ার সুযোগ নেই।
তবে এখানে অতিরঞ্জনেরও সুযোগ নেই। বিজ্ঞান এখনো বলেনি যে মাইক্রোপ্লাস্টিক মানেই ক্যানসার, বন্ধ্যত্ব বা নির্দিষ্ট কোনো রোগ। কিন্তু এটাও বলেনি যে এটি সম্পূর্ণ নিরাপদ। ইতিহাস বলে, সিসাযুক্ত পেট্রোল, অ্যাসবেস্টস, ট্রান্সফ্যাট কিংবা কিছু কীটনাশকের ক্ষেত্রেও প্রথমদিকে একই ধরনের অনিশ্চয়তা ছিল। পরে বহু বছরের গবেষণায় সেগুলোর ক্ষতিকর প্রভাব স্পষ্ট হয়েছে। তাই সতর্কতা অবলম্বনই বিজ্ঞানের সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত পথ।
নাগরিকেরও দায়িত্ব আছে। অপ্রয়োজনীয় একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক কমানো, গরম খাবার প্লাস্টিকের পাত্রে না রাখা, নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে খাদ্য কেনা এবং প্লাস্টিক বর্জ্য যথাস্থানে ফেলা এসব পদক্ষেপ সমস্যার সম্পূর্ণ সমাধান না হলেও দূষণ কমাতে সহায়ক হতে পারে।
সবশেষে একটি প্রশ্ন থেকেই যায়। বাংলাদেশে যখন একের পর এক গবেষণা খাদ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি প্রমাণ করছে, তখন রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া কোথায়? গবেষণাপত্র আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত হচ্ছে, কিন্তু সেই তথ্য কি নীতিনির্ধারণের টেবিলে পৌঁছাচ্ছে? নাকি গবেষণা শুধু গবেষণাগারেই সীমাবদ্ধ থাকবে?
খাদ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক হয়তো আমাদের চোখে পড়ে না। কিন্তু এর বিরুদ্ধে নীতিগত উদাসীনতা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চোখ এড়াবে না। উন্নত দেশগুলো যখন উৎসে দূষণ কমানোর লড়াই শুরু করেছে, তখন বাংলাদেশের সামনে দুটি পথ অপেক্ষা করা অথবা এখনই পদক্ষেপ নেওয়া। ইতিহাস বলে, জনস্বাস্থ্যের প্রশ্নে দেরি করার মূল্য সবসময়ই সবচেয়ে বেশি দিতে হয় সাধারণ মানুষকেই।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট
email: [email protected]
