সম্প্রতি আয়ারল্যান্ডের প্রভাবশালী গণমাধ্যম দ্য আইরিশ টাইমস-এ প্রকাশিত একটি বিশেষ প্রতিবেদন বিশ্বদরবারে বাংলাদেশের মাদক সমস্যার এক ভয়াবহ ও নির্মম বাস্তবতা নতুন করে উন্মোচিত করেছে। প্রতিবেদনের শিরোনাম—“এটি মানুষকে পশু বানিয়ে দেয়”: বাংলাদেশে ইয়াবা আসক্তির মহামারি।
শিরোনামটি কোনো অতিরঞ্জন নয়; এটি বাংলাদেশের শহর থেকে গ্রামে ছড়িয়ে পড়া এক বিষাক্ত বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে যখন কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ সংকট এভাবে স্থান পায়, তখন তা কেবল বিচ্ছিন্ন অপরাধের সংবাদ থাকে না; বরং একটি দেশের জনস্বাস্থ্য, সামাজিক স্থিতিশীলতা, অর্থনীতি ও ভবিষ্যৎ মানবসম্পদের ওপর গভীর সংকটের ইঙ্গিত বহন করে। সেই অর্থে দ্য আইরিশ টাইমস-এর এই প্রতিবেদন বাংলাদেশের জন্য একটি সতর্কসংকেত, যা নীতিনির্ধারক, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং সমাজের প্রতিটি স্তরের জন্য সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের উন্নয়ন, অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও সামাজিক পরিবর্তনের নানা গল্পের আড়ালে আরেকটি ভয়ংকর সংকট নিঃশব্দে বিস্তার লাভ করছে—মাদকাসক্তি, বিশেষ করে ইয়াবার ভয়াল বিস্তার। এটি আর শুধু একটি আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, মানসিক স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, পারিবারিক বন্ধন এবং জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত একটি বহুমাত্রিক সংকট। প্রতিদিন হাজারো তরুণ, কর্মজীবী মানুষ এমনকি শিক্ষার্থীরাও এই নেশার ফাঁদে পা দিয়ে নিজেদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার করে তুলছে।
আইরিশ টাইমস বলছে, ঢাকার চল্লিশোর্ধ্ব এক ব্যক্তি, যিনি নিজের পরিচয় গোপন রাখতে "মেটালফ্রিক" ছদ্মনাম ব্যবহার করেছেন, তার জীবনের গল্প যেন হাজারো মাদকাসক্ত মানুষের প্রতিচ্ছবি। একসময় তিনি নিজের পোষা পাখির যত্ন নিতেন, খাঁচা পরিষ্কার করতেন, ভালোবাসা দিয়ে সময় কাটাতেন। আজ তিনি বলেন, "এসব আর করতে ইচ্ছা করে না। এই জিনিসটা আমার মস্তিষ্ক পুরোপুরি নষ্ট করে দিয়েছে।" একটি বাক্যই বুঝিয়ে দেয়, ইয়াবা কেবল শরীর নয়, মানুষের অনুভূতি, সম্পর্ক, স্বপ্ন এবং জীবনের অর্থকেও ধ্বংস করে দেয়।
রসায়নের দৃষ্টিকোণ থেকেও ইয়াবা অত্যন্ত ভয়ংকর একটি সিনথেটিক মাদক। মেথামফেটামিন ও ক্যাফেইনের সংমিশ্রণে তৈরি এই ট্যাবলেট কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রকে অস্বাভাবিকভাবে উদ্দীপিত করে।
ব্যবহারকারীর মধ্যে সাময়িক শক্তি, কৃত্রিম আত্মবিশ্বাস ও উচ্ছ্বাস তৈরি হলেও এর প্রতিক্রিয়ায় মস্তিষ্কের স্বাভাবিক রাসায়নিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়। দীর্ঘমেয়াদে অনিদ্রা, হ্যালুসিনেশন, স্মৃতিশক্তি হ্রাস, হৃদরোগ, স্ট্রোক এবং মানসিক বিকারের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। মেটালফ্রিকের ভাষায়, এটি ধীরে ধীরে বিষ প্রয়োগের মতোই মানুষকে ভেতর থেকে ধ্বংস করে দেয়।
বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সম্প্রতি জানিয়েছেন, প্রায় ১৭ কোটি ৫০ লাখ মানুষের দেশে প্রায় পাঁচ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনো ধরনের মাদকে আসক্ত। এই সংখ্যা যদি বাস্তবতার কাছাকাছি হয়, তাহলে প্রায় ৮০ থেকে ৯০ লাখ মানুষের জীবন কোনো না কোনোভাবে মাদকের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। এর বড় একটি অংশ ইয়াবা ব্যবহারকারী বলে বিভিন্ন গবেষণা ও বিশেষজ্ঞদের ধারণা। এটি নিঃসন্দেহে একটি জাতীয় সংকট।
বাংলাদেশে ইয়াবা বিস্তারের পেছনে অন্যতম কারণ ভৌগোলিক অবস্থান ও সীমান্তভিত্তিক মাদকপাচার। মিয়ানমার, থাইল্যান্ড ও লাওসের সীমান্তবর্তী "গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল" অঞ্চল বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সিনথেটিক মাদক উৎপাদনকেন্দ্র। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় রেকর্ড ২৩৬ টন মেথামফেটামিন জব্দ হয়েছে। বাংলাদেশের দীর্ঘ সীমান্তকে ব্যবহার করে এই মাদকের একটি বড় অংশ দেশে প্রবেশ করছে। ফলে সীমান্ত নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং গোয়েন্দা সমন্বয়কে আরও কার্যকর করা সময়ের দাবি।
একসময় ইয়াবা ছিল ব্যয়বহুল। এখন বাজারে কম দামের ইয়াবাও সহজলভ্য। ফলে নিম্নআয়ের মানুষ, শ্রমজীবী, রিকশাচালক এমনকি শিক্ষার্থীদের কাছেও এটি পৌঁছে গেছে। কোনো সমাজে যখন একটি ভয়ংকর মাদক সহজে পাওয়া যায়, তখন সেটি শুধু ব্যক্তির নয়, পুরো সমাজের জন্য হুমকিতে পরিণত হয়।
বাংলাদেশের জনমিতিক বাস্তবতায় বিষয়টি আরও উদ্বেগজনক। দেশের বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী অর্থনৈতিক উন্নয়নের চালিকাশক্তি হওয়ার কথা থাকলেও ইয়াবার বিস্তার সেই সম্ভাবনাকেই বিপন্ন করছে। হতাশা, বেকারত্ব, অর্থনৈতিক চাপ, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং জলবায়ুজনিত বাস্তুচ্যুতি—এসব কারণ বহু তরুণকে নেশার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ক্ষণিকের স্বস্তি খুঁজতে গিয়ে তারা স্থায়ী ধ্বংসের পথে এগিয়ে যাচ্ছে।
২০১৮ সালে বাংলাদেশে ইয়াবাবিরোধী কঠোর অভিযান পরিচালিত হয়েছিল। বহু মানুষ নিহত হন, হাজার হাজার ব্যক্তি গ্রেপ্তার হন। কঠোর অভিযান কিছু সময়ের জন্য মাদক ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করলেও দীর্ঘমেয়াদে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়নি। কারণ, শুধু গ্রেপ্তার কিংবা শাস্তি দিয়ে মাদকের চাহিদা কমানো যায় না। যতদিন আসক্তি থাকবে, ততদিন নতুন সরবরাহকারী তৈরি হবে। তাই সমস্যার মূল শিকড়ে পৌঁছাতে হবে।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের চিকিৎসকদের মতে, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো মানসিক স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি। সারা দেশে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সংখ্যা অত্যন্ত সীমিত। প্রয়োজনের তুলনায় প্রশিক্ষিত মনোবিজ্ঞানীও খুবই কম। ফলে বিষণ্নতা, উদ্বেগ, ট্রমা কিংবা মানসিক সংকটে থাকা অসংখ্য মানুষ সময়মতো চিকিৎসা পান না। অনেকেই সাময়িক স্বস্তির আশায় মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়েন। অথচ সেটিই তাদের জীবনকে আরও ভয়াবহ সংকটের দিকে ঠেলে দেয়।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপে দেখা গেছে, যাদের চিকিৎসার প্রয়োজন, তাদের প্রায় ৯০ শতাংশ কোনো মানসিক স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করেন না। এর পেছনে যেমন চিকিৎসা অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা রয়েছে, তেমনি রয়েছে সামাজিক কুসংস্কার। এখনও অনেক পরিবার মনে করে, মনোরোগ চিকিৎসকের কাছে যাওয়া মানেই "পাগল" হওয়া। এই ধারণা পরিবর্তন না হলে পরিস্থিতির উন্নতি কঠিন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাদকাসক্তি কেবল ব্যক্তিগত দুর্বলতা নয়; এটি সামাজিক, অর্থনৈতিক ও মানসিক নানা কারণের সমন্বিত ফল। মাদকের অর্থ জোগাতে গিয়ে অনেকেই অপরাধে জড়িয়ে পড়েন, যা সামগ্রিকভাবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, পারিবারিক স্থিতিশীলতা এবং জাতীয় অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
বাংলাদেশে মাদকবিরোধী নীতিকে আরও কার্যকর করতে হলে সমন্বিত কৌশল গ্রহণ ছাড়া বিকল্প নেই। সীমান্তে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, মাদক সিন্ডিকেটের অর্থের উৎস শনাক্ত করে কঠোর ব্যবস্থা, রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রভাবমুক্ত তদন্ত এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে আসক্তদের চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও সমাজে পুনঃএকীভূত করার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পরিবার, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম এবং সামাজিক সংগঠনগুলোকে একযোগে কাজ করতে হবে। স্কুল-কলেজ পর্যায়ে নিয়মিত মাদকবিরোধী শিক্ষা, অভিভাবকদের সচেতনতা বৃদ্ধি, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে তরুণদের সম্পৃক্ত করা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইতিবাচক প্রচারণা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রযুক্তিকেও এই যুদ্ধে কাজে লাগানো সম্ভব। অনলাইন কাউন্সেলিং, গোপনীয় সহায়তা হটলাইন, মানসিক স্বাস্থ্য অ্যাপ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ঝুঁকি শনাক্তকরণ ব্যবস্থা ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পাশাপাশি গবেষণার মাধ্যমে বাংলাদেশে ইয়াবা ব্যবহারের প্রকৃত চিত্র, ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী এবং কার্যকর চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে আরও তথ্যভিত্তিক নীতি প্রণয়ন প্রয়োজন।
সবচেয়ে বড় কথা, মাদকাসক্তিকে শুধুমাত্র অপরাধ হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি একটি জনস্বাস্থ্য সংকট, যা প্রতিরোধে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, স্বাস্থ্য খাত, শিক্ষা ব্যবস্থা, পরিবার, স্থানীয় সরকার এবং নাগরিক সমাজ—সবার সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। মেটালফ্রিকের মতো অসংখ্য মানুষের হারিয়ে যাওয়া স্বপ্ন আমাদের জন্য সতর্কবার্তা।
একটি মানুষ যখন বলে, "ইয়াবা মানুষকে পশু বানিয়ে দেয়", তখন সেটি কেবল একজন আসক্তের হতাশার ভাষা নয়; এটি একটি সমাজের ব্যর্থতারও প্রতিফলন। যদি এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তাহলে এই নীরব মহামারি আগামী প্রজন্মের মেধা, কর্মশক্তি ও মানবিক মূল্যবোধকে আরও গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—মাদকের বিরুদ্ধে কেবল অভিযান নয়, প্রতিরোধ, চিকিৎসা, পুনর্বাসন, সচেতনতা এবং সামাজিক পুনর্গঠনের একটি সমন্বিত জাতীয় কৌশল বাস্তবায়ন করা। কারণ, একটি সুস্থ, উৎপাদনশীল ও মানবিক বাংলাদেশ গড়তে হলে ইয়াবার বিরুদ্ধে এই অদৃশ্য যুদ্ধ জিততেই হবে। সুতরাং রাজনীতিবিদ ও শাসকদের এই সত্য উপলব্ধি করতে হবে যে,মাদকের বিরুদ্ধে জয়ী না হলে জাতি হিসেবে আমরা কখনোই মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবো না।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন।
ই-মেইল: [email protected]
