নৈরাজ্য নয়, শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতার পথে ফিরুক বাংলাদেশ

নৈরাজ্য নয়, শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতার পথে ফিরুক বাংলাদেশ

ফন্ট সাইজ:

মানব সভ্যতার উন্মেষ থেকে শুরু করে আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার বিকাশের একটি মূল লক্ষ্য ছিল শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা। টমাস হবস, জন লক বা জ্যা জ্যাক রুশোর মতো রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা সামাজিক চুক্তির যে ধারণা দিয়েছেন, তার মূল কথাই হলো মানুষ নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থে রাষ্ট্রের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেছে। কিন্তু যখনই নৈরাজ্যবাদ বা রাষ্ট্রহীনতার ধারণা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে, তখন তা কেবল সরকার নয়, বরং পুরো সভ্যতার ভিত্তিমূলেই আঘাত হানে। নৈরাজ্যবাদীরা মনে করে, রাষ্ট্র, সরকার বা আইন-কানুন মানুষের স্বাধীনতার পরিপন্থী এবং তারা যেকোনো ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর বিলুপ্তি চায়। কিন্তু বাস্তবে রাষ্ট্রহীন একটি সমাজ মানেই হলো মৎস্যন্যায় বা ‘জোর যার মুল্লুক তার’ এমন একটি পরিস্থিতি। প্রখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবার বলেছিলেন, রাষ্ট্র হলো সেই প্রতিষ্ঠান, যার নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের ওপর বৈধভাবে বলপ্রয়োগের একচেটিয়া অধিকার রয়েছে। যখন নৈরাজ্যবাদীরা এই একচেটিয়া অধিকারে ভাগ বসাতে চায় বা সহিংসতা ছড়ায়, তখন রাষ্ট্র তার নিজের অস্তিত্ব রক্ষার্থেই তাদের কঠোরভাবে দমন করতে বাধ্য হয়।

বিশ্ব ইতিহাসের পাতা ওল্টালে আমরা দেখতে পাই, কোনো রাষ্ট্রই নৈরাজ্যবাদকে প্রশ্রয় দিয়ে টিকে থাকতে পারেনি। উন্নত থেকে উন্নয়নশীল, সব দেশকেই তাদের অভ্যন্তরীণ শান্তি রক্ষায় কঠোর হাতে নৈরাজ্য দমন করতে হয়েছে। ফরাসি বিপ্লব ছিল সাম্য, মৈত্রী ও স্বাধীনতার লড়াই। কিন্তু বিপ্লবের পর যখন ফ্রান্সে কোনো সুনির্দিষ্ট শাসন কাঠামো দাঁড়াতে পারছিল না, তখন গোটা দেশ নৈরাজ্যের অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়। পরবর্তীতে নেপোলিয়ন বোনাপার্ট যখন ক্ষমতায় আসেন, তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে এই নৈরাজ্য চলতে থাকলে ফ্রান্সের পতন অনিবার্য। তিনি কঠোর হাতে বিশৃঙ্খলা দমন করে নতুন আইন ব্যবস্থা চালু করেন। একই চিত্র দেখা যায় রাশিয়ার বলশেভিক বিপ্লবে। ১৯১৭ সালে ভøাদিমির লেনিনের নেতৃত্বে বলশেভিকরা রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করার মাত্র কয়েক বছর পর ক্রনস্টাডট নৌঘাঁটির নাবিকরা এবং কিছু নৈরাজ্যবাদী গোষ্ঠী বলশেভিক সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে বসে। লেনিন এবং ট্রটস্কি বুঝতে পেরেছিলেন, এই নৈরাজ্যবাদীদের দাবি মেনে নিলে নবগঠিত সোভিয়েত রাষ্ট্র ভেঙে পড়বে। ফলে অত্যন্ত কঠোরভাবে এবং রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে নৈরাজ্যবাদীদের দমন করা হয়।

স্পেনের গৃহযুদ্ধ নৈরাজ্যবাদের ভয়াবহ পরিণতির আরেকটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ। সেখানে রিপাবলিকান সরকারের পক্ষে অনেক নৈরাজ্যবাদী গোষ্ঠী লড়াই করলেও তারা সরকারের আদেশ মানতে অস্বীকৃতি জানায়, নিজেদের মতো করে অর্থনীতি চালাতে শুরু করে এবং চরম বিশৃঙ্খলা তৈরি করে। এর ফলে রিপাবলিকান সরকার ভেতর থেকেই দুর্বল হয়ে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত জেনারেল ফ্রাঙ্কোর ফ্যাসিবাদী বাহিনীর কাছে তাদের পতন ঘটে। এই ইতিহাস প্রমাণ করে, নৈরাজ্যবাদীরা নিজেদের মিত্রদের জন্যও কতটা বিপজ্জনক হতে পারে। আধুনিক বিশ্বেও এর ব্যতিক্রম নেই। ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে জর্জ ফ্লয়েড হত্যাকাণ্ডের পর প্রতিবাদের নামে সিয়াটল শহরে কিছু নৈরাজ্যবাদী একটি নির্দিষ্ট এলাকা দখল করে সেটিকে স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল ঘোষণা করে। সেখানে পুলিশ বা আইন নিষিদ্ধ করা হয়। কিন্তু কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই খুন, ধর্ষণ ও লুটতরাজ মারাত্মক আকার ধারণ করলে মার্কিন প্রশাসন বাধ্য হয়ে কঠোর পুলিশি অভিযানের মাধ্যমে নৈরাজ্যবাদীদের উচ্ছেদ করে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ পুনপ্রতিষ্ঠা করে। একইভাবে, আধুনিক ইউরোপের জার্মানি, ফ্রান্স বা ইতালিতে যখনই জি-২০ বা বড় কোনো সম্মেলন হয়, তখন ব্ল্যাক ব্লক নামক নৈরাজ্যবাদীরা রাস্তায় নেমে গাড়ি পোড়ানো এবং দোকানপাটে লুটতরাজ চালায়। চরম গণতান্ত্রিক এই দেশগুলোও তখন রায়ট পুলিশ, জলকামান ও টিয়ার গ্যাস ব্যবহার করে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করে।

গণতন্ত্রে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আছে, কিন্তু সেই স্বাধীনতার নামে নৈরাজ্য সৃষ্টির কোনো অধিকার নেই। সাধারণ মানুষ সরকারকে কর দেয় তাদের জানমালের নিরাপত্তার জন্য। যখন নৈরাজ্যবাদীরা পাবলিক ট্রান্সপোর্টে আগুন দেয় বা রাস্তাঘাট অবরুদ্ধ করে, তখন রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো কঠোর বলপ্রয়োগ করে হলেও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। নৈরাজ্য এবং দীর্ঘস্থায়ী বিশৃঙ্খলা যেকোনো দেশের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেয়, সাপ্লাই চেইন ভেঙে যায় এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীরা মুখ ফিরিয়ে নেয়। একটি দেশের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড সোজা রাখতে নৈরাজ্য দমনের বিকল্প নেই। নৈরাজ্যবাদীদের দমনে রাষ্ট্রকে অত্যন্ত কঠোর হওয়ার পাশাপাশি কিছু কৌশলগত পদক্ষেপও গ্রহণ করতে হবে। নৈরাজ্য সৃষ্টি, ভাঙচুর ও উসকানিদাতাদের রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে দ্রুত বিচারের আওতায় আনতে হবে। আধুনিক যুগে নৈরাজ্যবাদীরা সাইবার স্পেস ব্যবহার করে সংগঠিত হয় বলে সাইবার পেট্রোলিং এবং গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করে তাদের পূর্বপরিকল্পনা নস্যাৎ করা জরুরি। একইসাথে, শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক বিরোধী দল এবং নৈরাজ্যবাদীদের মধ্যে রাষ্ট্রকে পার্থক্য করতে হবে। বিরোধী মতকে সম্মান জানাতে হবে, কিন্তু যারা জ্বালাও-পোড়াও তত্ত্বে বিশ্বাসী, তাদের সন্ত্রাসী হিসেবে গণ্য করে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।

ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না। দুর্বল রাষ্ট্রকাঠামো সবসময়ই নৈরাজ্যবাদীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়, যার ফল ভোগ করতে হয় সাধারণ মানুষকে। ফরাসি বিপ্লব থেকে শুরু করে আধুনিক ইউরোপ ও আমেরিকা, প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রমাণিত হয়েছে যে, রাষ্ট্রের অস্তিত্ব এবং সাধারণ মানুষের অধিকার রক্ষায় নৈরাজ্যবাদীদের বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। রাষ্ট্রের উচিত তার সম্পূর্ণ আইনানুগ শক্তি প্রয়োগ করে এই অপশক্তিকে শেকড় থেকে উপড়ে ফেলা। কারণ, শৃঙ্খলাই হলো সভ্যতার প্রথম ও প্রধান শর্ত।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন