পার্বত্য চট্টগ্রাম: সংবিধান, শান্তিচুক্তি ও নাগরিকত্বের বিতর্ক

পার্বত্য চট্টগ্রাম: সংবিধান, শান্তিচুক্তি ও নাগরিকত্বের বিতর্ক

ফন্ট সাইজ:

প্রতি বছর ৯ আগস্ট আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস সামনে এলেই বাংলাদেশে পার্বত্য চট্টগ্রামকে ঘিরে পুরোনো বিতর্কগুলো নতুন করে তীব্র হয়ে ওঠে। সংবিধানে পার্বত্য জনগোষ্ঠীর পরিচয়, ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির বাস্তবায়ন, ‘আদিবাসী’ নাকি ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’—এই পরিচয়গত প্রশ্ন, ভূমির অধিকার, আঞ্চলিক পরিষদ ও প্রশাসনিক ক্ষমতা, নিরাপত্তা এবং নাগরিকত্বের বিভিন্ন ব্যাখ্যা নিয়ে একাধিক মত, পাল্টা মত ও রাজনৈতিক অবস্থান সামনে আসে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এই বিতর্কের অধিকাংশই প্রায়শই আবেগ, আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অবস্থান কিংবা পরিচয়-রাজনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে এবং এতে বাস্তব সমস্যার টেকসই সমাধান নিয়ে গভীর আলোচনা তুলনামূলকভাবে কম হয়।

অথচ সাতাশ বছরেরও বেশি সময় পর স্পষ্ট যে, পার্বত্য চট্টগ্রামের ভবিষ্যৎ সংঘাত, অবিশ্বাস কিংবা পরস্পরবিরোধী বয়ানের মধ্যে নয়; বরং সাংবিধানিক কাঠামোর প্রতি শ্রদ্ধা, শান্তিচুক্তির বাস্তবসম্মত ও আইনসম্মত পুনর্মূল্যায়ন, সকল নাগরিকের সমঅধিকার নিশ্চিতকরণ, ভূমি-সংক্রান্ত বিরোধের ন্যায্য নিষ্পত্তি, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক পরিচয় ও ভাষার মর্যাদা রক্ষা, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজিমুক্ত নিরাপদ পরিবেশ প্রতিষ্ঠা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের সমন্বিত পথেই নিহিত।

রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, জাতীয় সংহতি এবং স্থানীয় জনগণের ন্যায্য অধিকার—এই তিনটি লক্ষ্যকে পরস্পরবিরোধী নয়, বরং পরিপূরক হিসেবে বিবেচনা করেই একটি নতুন জাতীয় সংলাপ গড়ে তোলা প্রয়োজন। তাহলেই প্রতি বছরের ৯ আগস্ট বিতর্কের পুনরাবৃত্তির পরিবর্তে পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি, আস্থা ও টেকসই উন্নয়নের একটি সফল মডেলে পরিণত হওয়ার বাস্তব সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রশ্নটি কেবল একটি আঞ্চলিক প্রশাসনিক বিষয় নয়। এটি বাংলাদেশের সংবিধান, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, নাগরিকের সমঅধিকার, মানবাধিকার, নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক আইন—এই সবকিছুর সংযোগস্থলে অবস্থান করছে। ফলে এ বিষয়ে আবেগের পরিবর্তে আইন, সংবিধান এবং রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদী স্বার্থের আলোকে আলোচনা করা প্রয়োজন। কারণ সংবিধানই রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন।

বাংলাদেশের সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদ অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছে—সংবিধানই প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ আইন এবং সংবিধানের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ কোনো আইন কার্যকর হতে পারে না।

এই একটি নীতিই পার্বত্য চট্টগ্রাম-সংক্রান্ত যেকোনো আইন, চুক্তি বা প্রশাসনিক ব্যবস্থার মূল্যায়নের প্রধান ভিত্তি। অর্থাৎ, কোনো বিধিমালা, কোনো প্রশাসনিক আদেশ, কোনো রাজনৈতিক সমঝোতা, এমনকি কোনো শান্তিচুক্তিও সংবিধানের ঊর্ধ্বে নয়। অতএব, রাষ্ট্র পরিচালনার সাংবিধানিক কাঠামো অক্ষুণ্ণ রাখাই বাংলাদেশের আইনি বাধ্যবাধকতা।

এখন ১৯০০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম বিধিমালার বর্তমান প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে আলোচনা করা যাক। পার্বত্য চট্টগ্রাম রেগুলেশন, ১৯০০ প্রণীত হয়েছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের প্রেক্ষাপটে। তখনকার উদ্দেশ্য ছিল—সীমান্ত প্রশাসন সহজ করা, ঔপনিবেশিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, প্রশাসনিক সুবিধা সৃষ্টি করা। এটি কোনো গণতান্ত্রিক সংবিধানের অধীনে প্রণীত আইন ছিল না। বরং একটি উপনিবেশিক প্রশাসনিক ব্যবস্থা।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর রাষ্ট্রের চরিত্র মৌলিকভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। আজ বাংলাদেশ একটি স্বাধীন, সার্বভৌম, সাংবিধানিক প্রজাতন্ত্র। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—একটি ঔপনিবেশিক প্রশাসনিক বিধিমালা কি স্বাধীন বাংলাদেশের সাংবিধানিক দর্শনের সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ? এই প্রশ্নের উত্তর বিচারিক, আইনগত এবং নীতিগতভাবে পুনর্মূল্যায়নের দাবি রাখে।

একইভাবে শান্তিচুক্তির আইনগত অবস্থান বিশ্লেষণ করা যেতে পারে। ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। এটি দীর্ঘ সংঘাত নিরসনের উদ্দেশ্যে স্বাক্ষরিত হয়েছিল। তবে আইনগতভাবে কয়েকটি প্রশ্ন এখনও আলোচনার দাবি রাখে।

প্রথমত, এটি আন্তর্জাতিক চুক্তি নয়। দ্বিতীয়ত, এটি সংবিধানের অংশ নয়। তৃতীয়ত, এর বিভিন্ন অংশ বাস্তবায়নের জন্য পরবর্তী আইন প্রণয়ন এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

অতএব, শান্তিচুক্তিকে একটি রাজনৈতিক সমঝোতা (Political Agreement) এবং পরবর্তীকালে বিভিন্ন আইনের মাধ্যমে আংশিকভাবে বাস্তবায়িত একটি নীতিগত কাঠামো হিসেবে দেখা অধিকতর যথাযথ। এ কারণে যদি কোনো অংশ বর্তমান সাংবিধানিক বাস্তবতা, নিরাপত্তা পরিস্থিতি বা প্রশাসনিক প্রয়োজনের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে প্রতীয়মান হয়, তবে তা আইনসম্মত উপায়ে পর্যালোচনা, সংশোধন বা পুনর্মূল্যায়ন করা যেতে পারে।

এবার দেখা যাক, ‘আদিবাসী’ প্রশ্ন নিয়ে সংবিধান ও আইন কী বলে? বাংলাদেশের সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ২৩ক অনুচ্ছেদে রাষ্ট্র ‘উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃগোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের’ স্বতন্ত্র সংস্কৃতি সংরক্ষণের অঙ্গীকার করেছে।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো—সংবিধানে ‘আদিবাসী’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়নি। বাংলাদেশের বিদ্যমান সাংবিধানিক ভাষ্য এই জনগোষ্ঠীগুলোকে ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃগোষ্ঠী, উপজাতি ইত্যাদি পরিভাষায় উল্লেখ করেছে।

অন্যদিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ‘Indigenous Peoples’ শব্দটির ব্যবহার রয়েছে, বিশেষ করে জাতিসংঘের বিভিন্ন নথিতে। তবে কোনো রাষ্ট্র কী পরিভাষা ব্যবহার করবে, তা অনেকাংশে তার নিজস্ব সাংবিধানিক ও আইনগত কাঠামোর বিষয়। অতএব, এই প্রশ্নে মতভেদ থাকলেও আইনগত আলোচনা হওয়া উচিত সংবিধানের ভাষা, বিচারিক ব্যাখ্যা এবং রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার—এই তিনটির সমন্বয়ে।

এক্ষেত্রে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপপ্রচার হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক পরিসরে পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদন, প্রচারণা ও অভিযোগ উত্থাপিত হচ্ছে। কিছু প্রতিবেদন তথ্যনির্ভর হতে পারে। আবার কিছু ক্ষেত্রে অতিরঞ্জন, অসম্পূর্ণ তথ্য বা বিভ্রান্তিকর উপস্থাপনাও থাকতে পারে।

রাষ্ট্রের করণীয় হওয়া উচিত—প্রথমত, তথ্যভিত্তিক জবাব প্রদান। দ্বিতীয়ত, প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে কূটনৈতিক প্রতিবাদ। তৃতীয়ত, মানহানিকর বা মিথ্যা তথ্যের বিরুদ্ধে প্রযোজ্য আইন অনুসারে ব্যবস্থা গ্রহণ। চতুর্থত, নিজস্ব গবেষণা, তথ্যভাণ্ডার এবং আইনি নথিপত্র আন্তর্জাতিক পরিসরে উপস্থাপন করা।

আমরা মনে করি, আইনের শাসন মানে সমালোচনা বন্ধ করা নয়। বরং সত্য ও অসত্যের মধ্যে আইনি ও তথ্যগত পার্থক্য স্পষ্ট করা। অতএব, আজ পার্বত্য চট্টগ্রাম কেবল অভ্যন্তরীণ প্রশাসনের প্রশ্ন নয়। এটি সীমান্ত নিরাপত্তা, আন্তঃদেশীয় অপরাধ, অস্ত্র পাচার, মানবপাচার, মাদক, আঞ্চলিক ভূরাজনীতি, বিনিয়োগ, পরিবেশ ইত্যাদি সবকিছুর সঙ্গে যুক্ত।

ফলে এ বিষয়ক আইনও স্থির থাকতে পারে না। আইনকে বাস্তবতার সঙ্গে চলতে হয়। তাই, আমার মতে পাঁচটি বিষয়ে জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তোলা জরুরি।

প্রথমত, ১৯০০ সালের বিধিমালার পূর্ণাঙ্গ আইন কমিশনভিত্তিক পর্যালোচনা। দ্বিতীয়ত, শান্তিচুক্তির বাস্তবায়ন, সীমাবদ্ধতা এবং বর্তমান প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে একটি স্বাধীন সাংবিধানিক মূল্যায়ন কমিশন। তৃতীয়ত,পার্বত্য অঞ্চলের সব জনগোষ্ঠীর সমঅধিকার নিশ্চিত করতে আইনি কাঠামোর আধুনিকীকরণ।

চতুর্থত, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও নাগরিক অধিকারের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা। পঞ্চমত, আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরতে শক্তিশালী আইনগত ও গবেষণাভিত্তিক কূটনীতি।

উপসংহার বলতে চাই, শান্তির জনপদ পার্বত্য চট্টগ্রামের ভবিষ্যৎ কোনো সংঘাতের ভবিষ্যৎ হওয়া উচিত নয়। এটি হওয়া উচিত ন্যায়ভিত্তিক শাসন, সাংবিধানিক সমতা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের একটি মডেল। আইন কখনো বিভাজনের হাতিয়ার নয়। আইন ন্যায্যতা ও বিশ্বাসের সেতুবন্ধন। সংবিধানও কোনো পক্ষের দলিল নয়। এটি সকল নাগরিকের সামাজিক চুক্তি। আর সেই চুক্তিকে শক্তিশালী করার মধ্য দিয়েই পার্বত্য চট্টগ্রামে টেকসই শান্তি, উন্নয়ন এবং জাতীয় সংহতির ভিত্তি নির্মাণ সম্ভব।

লেখক: প্রফেসর ও চেয়ারম্যান,

রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং নির্বাহী পরিচালক, চট্টগ্রাম সেন্টার ফর রিজিওনাল স্টাডিজ বাংলাদেশ (সিসিআরএসবিডি)।


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন