নির্বাচন কমিশনের (ইসি) কাছে ৩ দফা প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের প্রার্থী হওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করা, নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব হিসেবে শামসুল আলমের নিয়োগ বাতিল এবং নির্বাচনব্যবস্থা নিয়ে প্রয়োজনীয় সংস্কারের দাবি জানিয়েছে দলটি। বুধবার প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) বরাবর পাঠানো এক চিঠিতে এসব প্রস্তাব তুলে ধরেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার।
চিঠিতে বলা হয়, সংবিধান ও বিদ্যমান আইন অনুযায়ী অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজন করা নির্বাচন কমিশনের অন্যতম সাংবিধানিক দায়িত্ব। সে কারণে নির্বাচন কমিশনের প্রতিটি সিদ্ধান্তে নিরপেক্ষতা, স্বচ্ছতা ও জনআস্থার প্রতিফলন থাকা জরুরি। জামায়াতের দাবি, এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে বিদ্যমান বিধিনিষেধ তাদের সাংবিধানিক অধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাই এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনকে আইন ও বিধিমালা পুনর্বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় সংশোধনের উদ্যোগ নিতে হবে। একই চিঠিতে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব হিসেবে শামসুল আলমের নিয়োগ নিয়েও আপত্তি জানানো হয়েছে। দলটির ভাষ্য, তার নিয়োগ নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতা অক্ষুণ্ন রাখতে ওই নিয়োগ বাতিল করা প্রয়োজন।
এছাড়া নির্বাচন কমিশনের অধীনে পরিচালিত স্থানীয় সরকার নির্বাচন আরও অংশগ্রহণমূলক, স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য করতে সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধিমালা পর্যালোচনারও আহ্বান জানিয়েছে দলটি। জামায়াতে ইসলামী আশা প্রকাশ করে বলেছে, নির্বাচন কমিশন উত্থাপিত বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। এতে নির্বাচনব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা আরও শক্তিশালী হবে।
বৈঠকে আরও যেসব বিষয়ে আলোচনা হয়েছে
বেলা ১১টা থেকে সাড়ে ১২টা পর্যন্ত জামায়াতের ছয় সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল ইসি’র সঙ্গে বৈঠকে অংশ নেয়। বৈঠকে আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচন সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য করার প্রয়োজনে দলটি বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে ইসি’র সঙ্গে আলোচনা করেন। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের প্রার্থী হওয়ার সুযোগ নিশ্চিত, নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব হিসেবে শামসুল আলমের নিয়োগ বাতিল এবং নির্বাচনব্যবস্থা নিয়ে প্রয়োজনীয় সংস্কার ছাড়াই আরও বেশ কিছু বিষয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে এ সময় উপস্থিত ছিলেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ, কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য জসিম উদ্দীন সরকার, শিশির মোহাম্মদ মনির প্রমুখ। বৈঠকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ছাড়াও উপস্থিত ছিলেনÑ নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ, তাহমিদা আহমদ ও নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ।
বৈঠক শেষে জনাব মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, কোনো রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম সরকারিভাবে নিষিদ্ধ থাকলে সেই দলের পদধারী ব্যক্তিদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে। আমরা মনে করি, কোনো ব্যক্তি যদি নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব বা পদে থেকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন, তাহলে সেটি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডেরই অংশ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তাই নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের পদধারীদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের কোনো সুযোগ নেই।
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, বর্তমান সরকারের আমলে সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ও বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের বিষয়েও আমরা নির্বাচন কমিশনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি। স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আগে এসব প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিকভাবে নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিরা সরকারি সুযোগ-সুবিধা ও দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে নিজেদের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি করে পরবর্তী সময়ে নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারেন। এতে নির্বাচনের মাঠে অসম প্রতিযোগিতার পরিবেশ সৃষ্টি হতে পারে। তাই আমরা রাজনৈতিকভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে অযোগ্য ঘোষণা করার দাবি জানিয়েছি।
তিনি বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন যদি দলীয় প্রতীক ছাড়া ও অরাজনৈতিকভাবে অনুষ্ঠিত হয়, তাহলে মন্ত্রী, সংসদ সদস্যসহ রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা ব্যক্তিদের কোনো প্রার্থীর পক্ষে সভা, সমাবেশ বা প্রচারণায় অংশগ্রহণের সুযোগ থাকা উচিত নয়। আমরা এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে রাজনৈতিক তৎপরতা হিসেবে বিবেচনা করে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপের দাবি জানিয়েছি।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, নির্বাচনের তফসিল ও তারিখ ঘোষণা করা নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক দায়িত্ব। কিন্তু বিভিন্ন সময়ে সরকারের মন্ত্রীসহ রাজনৈতিক ব্যক্তিরা নির্বাচন কখন হবেÑএ বিষয়ে বিভিন্ন তারিখ ঘোষণা করছেন। নির্বাচন হবে কী-না, সে বিষয়ে রাজনৈতিক সরকারের সিদ্ধান্ত থাকতে পারে; কিন্তু নির্বাচনের তফসিল, তারিখ ও সময়সূচি নির্ধারণ এবং ঘোষণা করার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। তাই এ বিষয়ে কমিশনকে তার সাংবিধানিক ক্ষমতা ও দায়িত্ব যথাযথভাবে প্রয়োগ করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, নির্বাচন কমিশন একটি স্বাধীন ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান এবং সংবিধান তাকে নির্বাচন পরিচালনার ক্ষেত্রে ব্যাপক ক্ষমতা দিয়েছে। কমিশনের উচিত সরকারের সঙ্গে তার সাংবিধানিক পৃথক সত্তা ও দায়িত্ব বজায় রেখে স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করা। তিনি নির্বাচন কমিশনকে আরও সতর্ক ও সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, কমিশনের ওপর জনগণের আস্থা নির্ভর করে তারা কতটা নিরপেক্ষভাবে সাংবিধানিক ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারে তার ওপর।
তিনি বলেন, চট্টগ্রামের একটি নির্বাচনী বিষয়ে আদালতের আদেশের পর দ্রুত গেজেট প্রকাশ ও শপথের ব্যবস্থা করা হয়েছে। আদালতের আদেশের প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই কীভাবে এত দ্রুত গেজেট প্রকাশ ও শপথের ব্যবস্থা করা হলো, সে বিষয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এ ক্ষেত্রে কোনো ধরনের রাজনৈতিক চাপ ছিল কী-না, তা নিয়েও আমরা নির্বাচন কমিশনের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছি।
জামায়াত থেকে বহিষ্কৃত গাজী নজরুল ইসলামের সংসদ সদস্যপদ নিয়ে প্রশ্নের জবাবে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, দলীয় সংবিধান অনুযায়ী তদন্তে অপরাধ প্রমাণিত হলে বহিষ্কার সর্বোচ্চ সাংগঠনিক শাস্তি। ওই ব্যক্তিকে আমরা প্রকাশ্যে দল থেকে বহিষ্কার করেছি। তিনি এখন আর জামায়াতের কেউ নন। তার সংসদ সদস্যপদ থাকবে কি-না, সেটি সাংবিধানিক ও আইনগত বিষয়। এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার এখতিয়ার নির্বাচন কমিশন ও জাতীয় সংসদের স্পিকারের। আমরা এ বিষয়ে তাদের সাংবিধানিক সিদ্ধান্তের ওপর বিষয়টি ছেড়ে দিয়েছি।
সম্প্রতি যশোরে সংঘটিত একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন তথ্যের প্রসঙ্গ তুলে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, সত্য ঘটনা তুলে ধরার ক্ষেত্রে জামায়াতে ইসলামীর কোনো আপত্তি নেই। তবে কোনো ঘটনা অতিরঞ্জিত করা বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে কারও ভাবমর্যাদা ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি গণমাধ্যমকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, কোনো ঘটনা প্রকাশের আগে বাস্তবতা যাচাই করে সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশ করতে হবে। তিনি এক্ষেত্রে গণমাধ্যমের সহযোগিতা কামনা করেন।
