বিয়ের আগেই বিচ্ছেদের চুক্তি

প্রেনাপ

বিয়ের আগেই বিচ্ছেদের চুক্তি

ফন্ট সাইজ:

ক্যালিফোর্নিয়ার সেলিন সাই ও চার্লস মকের প্রথম পরিচয়ের পর বাগদান হতে এক বছরও সময় লাগেনি। সেলিনের বয়স যখন ২৩ ও চার্লসের ২৭, তখন গোলেটাতে তাদের প্রথম দেখা হয়। এর আট মাস পরই তাদের বাগদান সম্পন্ন হয়। এই খবর শুনেই তাদের বন্ধুরা সরাসরি প্রশ্ন করে বসেন, তোমরা কি প্রেনাপ (প্রাক-বিবাহ চুক্তি) করেছ? সেলিনের মতে, বৈবাহিক জীবনে অনেক কিছুই ঘটতে পারে। সম্পর্ক খারাপ হওয়া কিংবা বিচ্ছেদের পর প্রতিশোধ নেওয়ার মতো মনোভাব তৈরি হওয়ার আগেই, যখন একে অপরের প্রতি ভালোবাসা থাকে, তখনই এসব বিষয়ে আলোচনা করে নেওয়া ভালো।

আজকাল কেবল ধনী বা বিখ্যাত ব্যক্তিরাই নন, বরঞ্চ সাধারণ মানুষও প্রাক-বিবাহ চুক্তি বা প্রেনাপকে যুক্তিসঙ্গত মনে করছেন। বিয়ে ভেঙে গেলে উভয়ের সম্পদের কী হবে, তা পরিষ্কার করতে এই আইনি চুক্তির শরণাপন্ন হচ্ছেন অনেকে। বিশেষ করে তরুণ দম্পতিদের মধ্যে এই প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। এমনকি যেখানে সম্পদের বড় কোনো বৈষম্য নেই সেখানেও। পেশায় নার্স চার্লসের আয় পিএইচডি শিক্ষার্থী সেলিনের চেয়ে বেশি হলেও, জমানো টাকার দিক দিয়ে সেলিন কিছুটা এগিয়ে ছিলেন। ফলে আয়ের তেমন বড় পার্থক্য না থাকলেও শুরু থেকেই দুজন গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক বিষয়ে মুখোমুখি হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। বিচ্ছেদ হলে বাড়িটি যাতে সেলিনের নামে থাকে চার্লসের এমন প্রস্তাবে বেশ অভিভূত হন সেলিন। তার মতে, কেবল এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করাই বুঝিয়ে দেয় যে জীবনসঙ্গী হিসেবে মানুষটি কেমন। যুক্তরাষ্ট্রে বিবাহবিচ্ছেদ সংক্রান্ত আদালতগুলোতে প্রেনাপের স্বীকৃতি সব সময়ই ছিল।

যদিও এর কোনো সরকারি পরিসংখ্যান নেই, তবুও জানা যায় যুক্তরাষ্ট্রের বিবাহিত মিলেনিয়ালদের প্রায় অর্ধেক এবং জেন-জি তরুণদের এক-তৃতীয়াংশের বেশি দম্পতির মধ্যে প্রেনাপ রয়েছে। সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি পাঁচ বিবাহিত দম্পতির মধ্যে একজনের এই প্রাক-বিবাহ চুক্তি রয়েছে। অন্যদিকে বৃটেনেও আইনি কাঠামোর ইতিবাচক পরিবর্তনের ফলে এখন প্রতি ১০টি দম্পতির মধ্যে একটির প্রেনাপ রয়েছে। এখানেও তরুণ প্রজন্মই এগিয়ে, যেখানে ৩৫ বছরের কম বয়সী বিবাহিত দম্পতিদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন।

‘এটি একটি ন্যায্য বিষয়’: জেএমডব্লিউ সলিসিটর্সের লন্ডনভিত্তিক আইনজীবী মার্ক গিলমার্টিন জানান, গত ১৮ মাসে তিনি প্রেনাপের চাহিদায় ব্যাপক বৃদ্ধি দেখেছেন। বিলিয়নেয়ার ও সাধারণ কর্মীদের পুরোনো ছক ভেঙে এখন উদীয়মান পেশাজীবী, উদ্যোক্তা এবং সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সাররা এই চুক্তির দিকে ঝুঁকছেন। বর্তমানে যা আছে তা রক্ষার চেয়ে ভবিষ্যতে যা হবে, তার সুরক্ষা নিশ্চিত করাই মূলত এর প্রধান উদ্দেশ্য। ধারণা করা হয় জেফ বেজোস এবং লরেন সানচেজ গত বছর তাদের বিয়ের আগে একটি বিবাহপূর্ব চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিলেন। তারকাদের বাইরে সাধারণ দম্পতিদের মধ্যেও নিজেদের উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পদ রক্ষায় এই চুক্তির বেশ আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। যেমন ওয়েস্ট সাসেক্সের ৩৩ বছর বয়সী বেকা গিবস এবং ৪৫ বছর বয়সী ডেভ হাউয়েলস। আর কয়েক দিন পরই ডেভের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে যাচ্ছেন বেকা। তবে বিয়ে ভেঙে যাওয়ার বিষয় না ভেবেও তারা ভবিষ্যতের নিরাপত্তার জন্য একটি পরিকল্পনা করে রেখেছেন। ফিন্যান্স খাতে কর্মরত ডেভের বার্ষিক আয় ১,৩০,০০০ পাউন্ড, যা আইল্যাশ এক্সটেনশনের ব্যবসা চালানো বেকার আয়ের চেয়ে তিন গুণ বেশি। তবুও প্রেনাপের প্রস্তাবে বেশ ইতিবাচক ছিলেন বেকা, বিশেষ করে তার প্রথম বিয়েটি সুখকর না হওয়ায়। প্রথম পক্ষের তিন সন্তান নিয়ে বেকা জানেন যে আদালতের রায়ে তিনি হয়তো আর্থিকভাবে আরও বেশি লাভবান হতে পারতেন, যেখানে ডেভের মাত্র এক সন্তান।

কিন্তু তার মতে, প্রেনাপ না করা হয়তো তার জন্য বাড়তি সুবিধা হতো, তবে প্রেনাপ করাটাই সবচেয়ে ন্যায্য সমাধান। বাবা-মার কাছ থেকে বেশ বড় অঙ্কের স্থাবর সম্পত্তি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বেকার, যা তিনি সুরক্ষিত রাখতে চান। ফলে বিচ্ছেদ হলেও দুজনেই বিয়ের আগের অবস্থায় ফিরে যাবেন। ডেভ বিষয়টিকে একদমই রোমান্টিক না বললেও বিচ্ছেদের পরিসংখ্যান বিবেচনা করে তিনি বাস্তবমুখী হতে চান। নিজের কষ্টার্জিত ভবিষ্যৎ ও পেনশন রক্ষায় তার মতে, একে অপরকে ভালোবাসা এক জিনিস, কিন্তু বিচ্ছেদ হলে অন্য একজনের জীবনের পুরো দায়িত্ব নেওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই।

‘দ্য গ্রেট ওয়েলথ ট্রান্সফার’: অনেক পরিবার থেকেই সন্তানেরা বিশাল অঙ্কের সম্পত্তি পায় যা ‘দ্য গ্রেট ওয়েলথ ট্রান্সফার’ নামে পরিচিত। তরুণ প্রজন্ম পরিবারের কাছ থেকে যে বিশাল সম্পত্তি উত্তরাধিকার সূত্রে পাচ্ছে, তা সুরক্ষিত রাখতে অনেক সময় অভিভাবকরাই সন্তানদের প্রেনাপ করতে উৎসাহিত করছেন। আইনজীবীদের মতে, আগের বিচ্ছেদের তেতো অভিজ্ঞতা বা ছোটবেলায় বাবা-মার জটিল বিবাহবিচ্ছেদ প্রত্যক্ষ করাই তরুণদের প্রেনাপ করার অন্যতম কারণ। তবে অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোর কারণে এটি এখন অনেক বেশি সহজলভ্য, দ্রুত ও সাশ্রয়ী হয়ে উঠেছে। ডেভ প্রথমে স্থানীয় একটি ল ফার্মে ৫,০০০ পাউন্ড খরচের কথা ভেবেছিলেন, কিন্তু পরবর্তীতে ‘উইন্যাপ’ নামের একটি আধা-স্বয়ংক্রিয় সেবার মাধ্যমে মাত্র ১,৬০০ পাউন্ডে এই চুক্তি সম্পন্ন করেন। আমেরিকান প্রেনাপ প্ল্যাটফর্ম ‘হ্যালোপ্রেনাপ’-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়া রজার্স জানান, আজকাল তরুণরা কিছুটা বেশি বয়সে বিয়ে করছেন। ৩৪ বছর বয়সের মধ্যে অনেকেরই বিশ্ববিদ্যালয়ের ঋণ, নিজস্ব ব্যবসা বা ঘরবাড়ি তৈরি হয়ে যায়। ফলে হারানোর বা সুরক্ষিত রাখার মতো অনেক কিছু থাকে।

অতীতে প্রেনাপকে নারীদের অধিকারের জন্য ক্ষতিকর মনে করা হলেও রজার্স মনে করেন, এটি এখন নারীদের শুরু থেকেই নিজেদের অধিকার স্পষ্ট করার সুযোগ দিচ্ছে। এটি দম্পতিদের জীবন লক্ষ্য, আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং সংসারের দায়িত্ব নিয়ে খোলামেলা ও স্বচ্ছ আলোচনা করতে সাহায্য করছে, যাতে তাদের বাবা-মার মতো কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়তে না হয়। সেলিন জানান, তার বন্ধুদের বেশিরভাগই প্রেনাপকে ভালো উদ্যোগ মনে করেন। অনলাইনে মাত্র কয়েকশো ডলারে এটি সম্পন্ন করা যায়। ল ফার্মের পেছনে খরচ হলেও তিনি একে দাম্পত্যের বড় বিনিয়োগ মনে করতেন। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, তিনি ও চার্লস সব কঠিন আলোচনা বিয়ের আগেই শেষ করে ফেলেছেন, যার ফলে অর্থ নিয়ে তাদের মাঝে এখন পর্যন্ত একটি তর্কও হয়নি।

(বিবিসির প্রতিবেদনের অনুবাদ)

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন