বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার অভিযোগ করেছেন, জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের শহীদ ও আহতদের আত্মত্যাগের মাধ্যমে যে বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন তৈরি হয়েছিল, ক্ষমতাসীন বিএনপি সেই অঙ্গীকার থেকে সরে এসেছে। তিনি বলেন, জুলাই সনদের ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত গণভোটের রায় কার্যকর না করে সরকার জনগণের সঙ্গে করা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয়, সাংবিধানিক ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোতে ব্যাপক দলীয়করণের মাধ্যমে বিএনপি নিজেদের ঘোষিত ৩১ দফারও লঙ্ঘন করছে।
মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীর আল-ফালাহ মিলনায়তনে সমসাময়িক বিষয় নিয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে সহস্রাধিক মানুষ শহীদ হয়েছেন এবং ২০ থেকে ৩০ হাজার মানুষ আহত হয়েছেন। অনেকেই চিরতরে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন। তাদের আত্মদানের বিনিময়ে জনগণ একটি বৈষম্যহীন ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রত্যাশা করেছিল। কিন্তু জাতীয় নির্বাচন এবং পরবর্তী কয়েক মাসের বাস্তবতায় সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পরিবর্তে দেশ আবারও হতাশার দিকে এগোচ্ছে বলে জাতির মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন নানা কর্মসূচি পালন করছে। এসব কর্মসূচির মধ্য দিয়ে আন্দোলনের স্মৃতি ফিরে আসছে এবং মানুষের মনে প্রশ্ন জাগছে—এত রক্ত, এত আত্মত্যাগ শেষ পর্যন্ত বৃথা যাবে কি না।
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, নির্বাচন-পরবর্তী সময় থেকেই দলটি সংসদের ভেতরে ও বাইরে ধারাবাহিকভাবে সরকারের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে আসছে। বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানও সংসদে একাধিক বক্তব্যে বিষয়গুলো তুলে ধরেছেন। তার দাবি, বিএনপি রাষ্ট্র সংস্কারের প্রতিশ্রুতি, সংবিধান সংস্কারের অঙ্গীকার এবং তাদের ঘোষিত ৩১ দফার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না করে উল্টো সেগুলো থেকে সরে এসেছে।
তিনি বলেন, বিএনপির ৩১ দফার নবম দফায় রাষ্ট্রীয়, সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানকে সংকীর্ণ দলীয়করণের ঊর্ধ্বে রেখে পুনর্গঠনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে জাতীয় নির্বাচনের পর জেলা পরিষদ, সিটি করপোরেশন, উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সংস্থায় দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে।
মিয়া গোলাম পরওয়ার অভিযোগ করেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন না দিয়ে প্রশাসক নিয়োগ এবং পরে সেই পদগুলোতে বিএনপির লোকদের বসানো হয়েছে। অথচ সংবিধান অনুযায়ী স্থানীয় সরকার নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে পরিচালিত হওয়ার কথা। তিনি দাবি করেন, বিএনপি আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচন না করে একটি ‘গোপন সমঝোতার’ মাধ্যমে গণভোট বাস্তবায়নও ঠেকিয়েছে।
তিনি বলেন, সর্বশেষ ছাত্রদলের তিন নেতাকে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠানে ষষ্ঠ গ্রেডে ডেপুটি ডিরেক্টর পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এদের মধ্যে রয়েছেন ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রদলের সহসভাপতি আব্দুল্লাহ আল, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রদলের সহসভাপতি মেহেদী হাসান আবির এবং ঢাকা কলেজ ছাত্রদলের যুগ্ম সম্পাদক রাকিবুল হাসান রাকিব।
নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব হিসেবে চুক্তিভিত্তিক শামসুল আলমের নিয়োগেরও তীব্র সমালোচনা করেন তিনি। তার দাবি, শামসুল আলম অবসরের পর বিএনপির সংসদীয় আসন পুনর্বিন্যাস কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। এমন একজন ব্যক্তিকে নির্বাচন কমিশনের মতো সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ দেওয়ায় ভবিষ্যৎ স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিরপেক্ষ হবে না বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি। অবিলম্বে তার নিয়োগ বাতিলের দাবি জানান মিয়া গোলাম পরওয়ার।
এছাড়াও তিনি সম্প্রতি বিভিন্ন উন্নয়ন করপোরেশনসহ কয়েকটি জায়গায় বিএনপি নেতাকর্মীদের নিয়োগের তীব্র সমালোচনা করেন।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, আওয়ামী লীগের আমলে যেভাবে দলীয়করণ ও দুর্নীতির সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, মাত্র পাঁচ মাসেই তার আলামত দেখা যাচ্ছে। শুধু নাম বদলেছে, চরিত্র বদলায়নি। এখন মেধা বা যোগ্যতার পরিবর্তে বিএনপি বা ছাত্রদলের পদধারী হওয়াই যেন নিয়োগের প্রধান যোগ্যতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তিনি বলেন, এসব রাজনৈতিক নিয়োগ অবিলম্বে বাতিল করতে হবে। অন্যথায় নির্বাচন কমিশন ও অন্যান্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে এবং ভবিষ্যৎ স্থানীয় সরকার নির্বাচন গ্রহণযোগ্যতা হারাবে। এমন পরিস্থিতিতে বিরোধী দলগুলোর নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়টিও নতুন করে বিবেচনার প্রয়োজন হতে পারে।
সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এ টি এম মাসুম, হামিদুর রহমান আজাদ, অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়েরসহ কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
