উত্তর-পূর্ব ভারতের আসাম রাজ্যের জোরহাট জেলার বাসিন্দা শালিনী পাত্র ১৯ জুলাই নিজের বাড়িতে বসে বৃষ্টি দেখছিলেন। তখনও তিনি জানতেন না, কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তার জীবন সম্পূর্ণ বদলে যাবে। ১৮ বছর বয়সী শালিনী জানান, বিকেলের দিকে হঠাৎ প্রবল স্রোতের শব্দ এবং মানুষের চিৎকার শুনতে পান। তিনি বলেন, কয়েক মিনিটের মধ্যেই হাঁটুসমান পানি আমাদের ঘরে ঢুকে পড়ে। শালিনী প্রথমে তার বৃদ্ধ বাবা-মা ও ছোট ভাইকে নিরাপদ উঁচু জায়গায় পৌঁছে দেন। এরপর কিছু প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বাঁচানোর জন্য আবার বাড়িতে ফেরেন। কিন্তু পানির প্রবল স্রোত ঠেলে যখন তিনি ফিরে আসেন, ততক্ষণে তাদের বাড়িটি ভেসে গেছে।
একটি ত্রাণশিবির থেকে বিবিসিকে তিনি বলেন, আমাদের একটি টেলিভিশন, একটি আলমারি আর একটি সোফা ছিল। কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। পানি খাওয়ার জন্য একটি গ্লাসও আমরা বাঁচাতে পারিনি। তিনি বলেন, বন্যা আমাদের সবকিছু কেড়ে নিয়েছে। শালিনীর ভাষ্য, ঝানজি নদীর তীরে অবস্থিত তাদের গ্রাম সেলেং সুমনি পাঠারে প্রতি বছরই বন্যা হয়। ঝানজি নদী বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ নদ ব্রহ্মপুত্রের একটি উপনদী।
কিন্তু এবারের বন্যা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। আসামে বন্যা নতুন কোনো ঘটনা নয়। ভারতের জাতীয় বন্যা কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, রাজ্যের প্রায় ৪০ শতাংশ এলাকা বন্যাপ্রবণ। হিমালয় থেকে নেমে আসা ব্রহ্মপুত্র নদ আসামের বিস্তীর্ণ সমভূমির ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ৫০টিরও বেশি উপনদী। প্রতি বছরের বর্ষা মৌসুমে ভারী বৃষ্টিতে নদীর পানির পরিমাণ বেড়ে যায়। সমতল ভূমির ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার সময় ব্রহ্মপুত্র বিপুল পরিমাণ বালু ও পলি বহন করে জমা করে। এতে নদীর পানি ধারণক্ষমতা কমে যায় এবং বন্যার ঝুঁকি বাড়ে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উজানে বন উজাড়, পুরোনো ও দুর্বল বাঁধ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অস্বাভাবিক ভারী বৃষ্টিপাত- সব মিলিয়ে সময়ের সঙ্গে বন্যা আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছে। জুলাইয়ের মাঝামাঝি নাগাল্যান্ড ও আসামের বিভিন্ন এলাকায় অস্বাভাবিক ভারী বৃষ্টিপাতের পর শুরু হয় এবারের ভয়াবহ বন্যা। আসামের মন্ত্রী পীযূষ হাজারিকা একে গত ছয় দশকের মধ্যে রাজ্যের সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যা বলে উল্লেখ করেছেন। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত চার সপ্তাহে কমপক্ষে ৬৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে শুধু গত এক সপ্তাহেই প্রাণ হারিয়েছেন ৫৮ জন। এখনও প্রায় ৪০ জন নিখোঁজ রয়েছেন। বন্যায় ৬ লাখের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। হাজার হাজার মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়ে এখন ত্রাণশিবিরে আশ্রয় নিয়েছেন।
শুধু ২১ জুলাই ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ২১ জনের মৃত্যু হয়। তাদের বেশিরভাগই বন্যার পানিতে ভেসে যান বা ডুবে মারা যান। এছাড়া ভূমিধস ও ঘরবাড়ি ধসে আরও কয়েকজন নিহত হয়েছেন। আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা বলেন, ওই সময় নাগাল্যান্ড ও আসামের বিভিন্ন জেলায় স্বাভাবিকের তুলনায় ৪৩৫ থেকে ৪৯০ শতাংশ বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে। ফলে নদীগুলোর পানি নজিরবিহীন গতিতে বেড়ে যায়। বিশেষ করে উজানের আসাম অঞ্চল, যেখানে পাহাড়ি নদীগুলো ব্রহ্মপুত্রে এসে মিশেছে, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শিবসাগর, চরাইদেও এবং জোরহাট জেলা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়ে। বহু গ্রাম বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় আটকে পড়া মানুষদের কাছে উদ্ধারকারী দল পৌঁছাতে হিমশিম খায়। রাজ্যের প্রধান সচিব রবি কোট্টা জানান, সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলোতে কর্মকর্তাদের মোতায়েন করা হয়েছে, যাতে দ্রুত ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম চালানো যায়। ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দেয়া এবং জরুরি সেবা পুনরুদ্ধারই এখন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।
