দেশে গ্যাস সংকট কাটছে না। সরবরাহও দ্রুত বাড়ানো যাচ্ছে না। তাতে ঘাটতি থাকছেই। এতে ভুগছেন সব শ্রেণির গ্রাহকরা। এই সংকট আরও কয়েকদিন অব্যাহত থাকতে পারে। কক্সবাজারের মহেশখালীস্থ দেশের একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল কারিগরি সমস্যার কারণে এক সপ্তাহ জাতীয় গ্যাস গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ সাময়িকভাবে বন্ধ রেখেছে। এতে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি) গ্যাস সরবরাহ কমে গেছে। ফলে দেশের বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্র, শিল্পকারখানা, সিএনজি স্টেশনসহ বিভিন্ন শ্রেণির গ্রাহক গ্যাস সংকটে পড়েছেন।
জানা গেছে, গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন আবাসিক গ্রাহকরা। রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় বাসাবাড়িতে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় অনেক পরিবার রান্না করতে পারছে না। বাধ্য হয়ে কেউ বৈদ্যুতিক চুলা, কেউ এলপিজি সিলিন্ডারে কেউবা মাটির চুলা বা অন্যান্য বিকল্প ব্যবস্থায় রান্না করছেন।
সবচেয়ে বেশি গ্যাস ব্যবহৃত হয় বিদ্যুৎ খাতে। গ্যাস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে গেছে প্রায় দেড় হাজার মেগাওয়াটের মতো। এতে বিদ্যুৎ ঘাটতির শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এরপর সবচেয়ে বেশি গ্যাস ব্যবহার করে শিল্পকারখানা। বিদ্যুৎ-শিল্প ছাড়াও রান্নার কাজে ও পরিবহনের জ্বালানি হিসেবে গ্যাস (সিএনজি) ব্যবহার হয়। নিম্ন আয়ের মানুষ মাটির চুলায় লাকড়ি দিয়ে রান্নার চেষ্টা করছেন। সিএনজি স্টেশনগুলোতে গ্যাস নিতে গাড়ির সারি দীর্ঘ হচ্ছে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার গৃহিণীরা জানান, দিনের বেশির ভাগ সময় চুলায় গ্যাস থাকছে না। ফলে সময়মতো রান্না করা সম্ভব হচ্ছে না। অনেক সময় চুলায় সামান্য আগুন জ্বললেও তা দিয়ে রান্না করা যাচ্ছে না। এতে পরিবারের দৈনন্দিন কাজ ব্যাহত হচ্ছে।
এদিকে গ্যাস সংকটে সিএনজি স্টেশনগুলোতেও দেখা দিয়েছে দীর্ঘ সারি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও অনেক চালক গ্যাস পাচ্ছেন না। ফলে যাত্রী নিয়ে রাস্তায় বের হতে না পেরে অনেকেই আয়-রোজগার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন। অন্যদিকে, গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, গ্যাসের চাপ কম থাকায় কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা কমে গেছে। কোনো কোনো কারখানায় উৎপাদন আংশিকভাবে বন্ধ রাখতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ক্ষতির পাশাপাশি শ্রমিক ও কর্মীদের কাজেও প্রভাব পড়ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এলএনজি রূপান্তর করে পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহের ভাসমান টার্মিনালটি রোববারও চালু করা যায়নি। এতে রাজধানীর কলাবাগান, মোহাম্মদপুর, কাফরুল, বাড্ডাসহ বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের সংকট দেখা দিয়েছে। কোথাও নিভু নিভু আবার কোথাও একেবারেই চুলা জ্বলে না।
জানা গেছে, দেশে আমদানি করা এলএনজি রূপান্তর করে সরবরাহের জন্য কক্সবাজারের মহেশখালীতে দু’টি ভাসমান টার্মিনাল রয়েছে। এর একটি টার্মিনাল পরিচালনা করে মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জি ও আরেকটি বেসরকারি কোম্পানি সামিট। এর মধ্যে গত মঙ্গলবার আগুন লেগে এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। এরপর দেশে গ্যাসের সংকট বেড়ে যায়। চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে ঘাটতি দেশে দেড় দশক ধরে চলছে গ্যাস খাতে। এর মধ্যে কয়েক বছর ধরে দেশি গ্যাসের উৎপাদনও টানা কমছে। তাই নিয়মিত বাড়ছে এলএনজি’র ওপর নির্ভরতা। প্রতিদিন সরবরাহ করা মোট গ্যাসের ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশই আসে এলএনজি থেকে।
বাংলাদেশ তেল, গ্যাস, খনিজ সম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা) সূত্র বলছে, এক্সিলারেটের টার্মিনালে দু’টি বয়লার আছে। আগুনে একটি বয়লার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অক্ষত বয়লারটি চালু করা গেলে আরও ৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো যাবে। গত বৃহস্পতিবার থেকে টার্মিনালে কাজ শুরু করেছে যুক্তরাজ্য ও আরব আমিরাত থেকে আসা বিশেষজ্ঞ দল।
এ সমস্যা কবে নাগাদ কাটতে পারে জানতে চাইলে পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন ও মাইনস) প্রকৌশলী মো. রফিকুল ইসলাম মানবজমিনকে বলেন, কারিগরি দল কাজ করছে। এখনো চালু করার অবস্থায় আনা যায়নি। যত দ্রুত সম্ভব চালু করার চেষ্টা করছেন তারা। তবে নির্দিষ্ট করে সময় বলা যাচ্ছে না।
পেট্রোবাংলা বলছে, দিনে গ্যাসের চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট। যদিও গত বছর থেকে দিনে সরবরাহ করা হচ্ছে গড়ে ২৭০ কোটি ঘনফুট। অগ্নিদুর্ঘটনায় এলএনজি’র একটি টার্মিনাল বন্ধ হওয়ায় গ্যাস সরবরাহ কমে ২১৫ কোটি ঘনফুটের নিচে নেমে এসেছে।
এদিকে, গ্রাহকদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করে শনিবার বিবৃতি দিয়েছে পেট্রোবাংলা। এতে বলা হয়, এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালের কারিগরি ত্রুটি মেরামত করে চালু করার জন্য দেশি ও বিদেশি কারিগরি দল নিরলসভাবে কাজ করছে। গতকাল রাজধানী ও আশপাশের জেলায় গ্যাস বিতরণকারী প্রতিষ্ঠান তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসি বলেছে, পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত তিতাসের আওতাধীন এলাকার সব শ্রেণির গ্রাহক প্রান্তে গ্যাসের স্বল্পচাপ বিরাজ করবে।
এ বিষয়ে কনজ্যুমারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম মানবজমিনকে বলেন, আমরা অনেক আগেই বলেছিলাম এ ধরনের জ্বালানি সোর্স (উৎস, ভাসমান টার্মিনাল) নির্ভরশীল হওয়ার মতো নয়। তবে তাৎক্ষণিক হতে পারে। আমাদের নদীগুলো অনেক সময় রাফ অ্যান্ড টাফ থাকে। তাছাড়া এটা ব্যয়বহুল জ্বালানি সোর্স। এখান থেকে সব সময় নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি পাওয়া যায় না। আবার এ ধরনের জ্বালানির মূল্য উঠা-নামার মধ্যে থাকে। এলএনজি আমাদের জন্য মরণফাঁদ বলেও মন্তব্য করেন দেশের এই জ্বালানি বিশেষজ্ঞ।
তবে এলএনজি টার্মিনাল মেরামতের পর সহসাই গ্যাস সংকট কাটছে না বলে জানিয়েছেন তিতাসের কর্মকর্তারা। তারা বলেন, আমরা এখন এক হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুটের মতো গ্যাস পাচ্ছি। আমাদের চাহিদা এক হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। এফএসআরইউ ঠিক হলেই সংকট কেটে যাবে বিষয়টা এমন নয়। এফএসআরইউ নষ্ট হওয়ার আগে আমাদের দেয়া হচ্ছিল এক হাজার ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। এর মধ্যে ৪০০ মিলিয়ন বিদ্যুৎ ও সার উৎপাদনে যাচ্ছে। সেখানে অন্যান্য সেক্টরের জন্য আমাদের থাকে এক হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট, যেখানে প্রয়োজন মিনিমাম এক হাজার ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। এজন্য ২০০ থেকে ২৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সংকট এমনিতেই থাকবে সব সময়।
