বৈজ্ঞানিক চিকিৎসাই হোক বাংলাদেশের একমাত্র মানদণ্ড
ডা. এ কে এম মহিউদ্দিন ভূঁইয়া মাসুম।

অপবিজ্ঞানভিত্তিক চিকিৎসার বিস্তার

বৈজ্ঞানিক চিকিৎসাই হোক বাংলাদেশের একমাত্র মানদণ্ড

ফন্ট সাইজ:

মানুষের জীবন নিয়ে কোনো আপস নয়। স্বাস্থ্য একটি জাতির সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। একটি সুস্থ জনগোষ্ঠী ছাড়া টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সামাজিক অগ্রগতি কিংবা একটি সমৃদ্ধ রাষ্ট্র গঠন সম্ভব নয়। গত দুই দশকে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। চিকিৎসা শিক্ষা, আধুনিক হাসপাতাল, বিশেষায়িত চিকিৎসাকেন্দ্র, উন্নত ক্যাথল্যাব, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (Artificial Intelligence), রোবোটিক সার্জারি এবং আন্তর্জাতিক মানের চিকিৎসা নির্দেশিকা অনুসরণের মাধ্যমে দেশের স্বাস্থ্যসেবা বিশ্বমানের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

কিন্তু এই অগ্রযাত্রার মাঝেই নীরবে বিস্তার লাভ করছে আরেকটি বিপজ্জনক প্রবণতা—অপবিজ্ঞানভিত্তিক, অপ্রমাণিত ও প্রতারণামূলক চিকিৎসা।

আজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ইউটিউব, ফেসবুক, টেলিভিশন, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, এমনকি কিছু নিবন্ধনবিহীন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি চিকিৎসাবিজ্ঞানের নামে এমন সব দাবি করছেন, যেগুলোর কার্যকারিতা বৈজ্ঞানিকভাবে কখনোই প্রমাণিত হয়নি। অলৌকিকভাবে ক্যানসার নিরাময়, অপারেশন ছাড়াই হার্টের ব্লক দূর করা, কয়েক দিনে কিডনি ভালো করা, শতভাগ ডায়াবেটিস নিরাময় কিংবা এক ওষুধে শত রোগের চিকিৎসার মতো প্রচারণা প্রতিনিয়ত সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করছে।

এই প্রবণতা শুধু একটি চিকিৎসাগত সমস্যা নয়; এটি এখন জনস্বাস্থ্য, অর্থনীতি, আইনশৃঙ্খলা এবং রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের আস্থার জন্য একটি নীরব সংকটে পরিণত হয়েছে।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভিত্তি কী?

আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের মূল দর্শন হলো Evidence-Based Medicine (EBM) বা প্রমাণভিত্তিক চিকিৎসা। ১৯৯০-এর দশকে কানাডার ম্যাকমাস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের হাত ধরে চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই ধারণার বিকাশ ঘটে। বর্তমানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), ইউরোপিয়ান সোসাইটি অব কার্ডিওলজি (ESC), আমেরিকান কলেজ অব কার্ডিওলজি (ACC), আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন (AHA), ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর হেলথ অ্যান্ড কেয়ার এক্সিলেন্সসহ (NICE) বিশ্বের সব স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান Evidence-Based Medicine-কে চিকিৎসার একমাত্র গ্রহণযোগ্য ভিত্তি হিসেবে অনুসরণ করে।

প্রমাণভিত্তিক চিকিৎসার তিনটি প্রধান স্তম্ভ হলো—

* সর্বোচ্চ মানের বৈজ্ঞানিক গবেষণা (Best Available Scientific Evidence)।
* চিকিৎসকের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা (Clinical Expertise)।
* রোগীর মূল্যবোধ, প্রয়োজন ও পছন্দ (Patient Values and Preferences)।

এই তিনটির সমন্বয়েই নিরাপদ, কার্যকর ও নৈতিক চিকিৎসা নিশ্চিত হয়।

একটি চিকিৎসা কীভাবে বৈজ্ঞানিক স্বীকৃতি পায়?

অনেকেই মনে করেন, কোনো নতুন ওষুধ বা চিকিৎসাপদ্ধতি আবিষ্কার হলেই তা ব্যবহার করা যায়। বাস্তবে বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন। একটি চিকিৎসা পদ্ধতি রোগীর

জন্য অনুমোদিত হওয়ার আগে সাধারণত নিম্নলিখিত ধাপ অতিক্রম করে—

* গবেষণাগারে (Laboratory) পরীক্ষা।
* প্রাণীর ওপর গবেষণা (Preclinical Study)।
* Phase I Clinical Trial (নিরাপত্তা মূল্যায়ন)।
* Phase II Trial (কার্যকারিতা মূল্যায়ন)।
* Phase III Randomized Controlled Trial (বৃহৎ জনগোষ্ঠীর ওপর পরীক্ষা)।
* আন্তর্জাতিক Peer-reviewed Journal-এ প্রকাশ।
* স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের পর্যালোচনা।
* FDA, EMA, MHRA বা অন্যান্য নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন।
* আন্তর্জাতিক Clinical Guideline-এ অন্তর্ভুক্তি।
* দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ (Post-marketing Surveillance)।
এই দীর্ঘ বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হলে কোনো চিকিৎসাকে নিরাপদ বা কার্যকর বলা যায় না।

অপবিজ্ঞানভিত্তিক চিকিৎসা কী?

যেসব চিকিৎসার—

* বৈজ্ঞানিক গবেষণা নেই।
* Randomized Controlled Trial নেই।
* আন্তর্জাতিক চিকিৎসা নির্দেশিকায় স্থান নেই।
* কার্যকারিতা প্রমাণিত নয়।
* অথচ ‘শতভাগ রোগমুক্তি’, ‘অলৌকিক নিরাময়’ বা ‘গ্যারান্টিযুক্ত ফলাফল’-এর মতো দাবি করা হয়, সেগুলোকে অপবিজ্ঞানভিত্তিক (Pseudoscientific) বা অপ্রমাণিত চিকিৎসা বলা হয়।

সব ভেষজ, সম্পূরক বা বিকল্প চিকিৎসা নিজে থেকেই অকার্যকর—এমন কথা নয়। তবে যে চিকিৎসার কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা বৈজ্ঞানিকভাবে যথাযথভাবে প্রমাণিত নয়, সেটিকে প্রমাণিত চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে প্রচার করা উচিত নয়। এটিই আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের মৌলিক নীতি।

বাংলাদেশে কেন এ ধরনের চিকিৎসা বাড়ছে?

বাংলাদেশে অপচিকিৎসা বিস্তারের পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে। প্রথমত, স্বাস্থ্য সম্পর্কে জনগণের পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক জ্ঞান নেই। দ্বিতীয়ত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্বাস্থ্যবিষয়ক ভুল তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। তৃতীয়ত, অসুস্থ মানুষ দ্রুত সুস্থ হওয়ার আশায় অলৌকিক প্রতিশ্রুতিতে বিশ্বাস করেন। চতুর্থত, অনেক ক্ষেত্রেই বিভ্রান্তিকর চিকিৎসা-বিজ্ঞাপন কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয় না। পঞ্চমত, কিছু অসাধু ব্যক্তি চিকিৎসা-পেশার ভাবমূর্তি ব্যবহার করে মানুষের দুর্বলতাকে পুঁজি করেন।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত কারা?

এই প্রতারণার শিকার হন—

* ক্যানসার রোগী।
* হার্ট অ্যাটাক ও হৃদরোগে আক্রান্ত ব্যক্তি।
* স্ট্রোকের রোগী।
* কিডনি বিকল রোগী।
* লিভার সিরোসিসের রোগী।
* ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তি।
* বন্ধ্যাত্বে ভোগা দম্পতি।
* অটিজম ও স্নায়ুবিক সমস্যায় আক্রান্ত শিশু।
* দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা বা বাতের রোগী।

অনেক ক্ষেত্রে রোগীরা মূল্যবান সময় হারিয়ে ফেলেন। পরে যখন তারা আধুনিক চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে আসেন, তখন রোগটি এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় যেখানে চিকিৎসার সুযোগ অনেক কমে যায়।

জনস্বাস্থ্যের ওপর এর প্রভাব

অপবিজ্ঞানভিত্তিক চিকিৎসার ক্ষতি বহুমাত্রিক। সবচেয়ে বড় ক্ষতি হলো চিকিৎসা শুরুতে বিলম্ব (Delay in Treatment)। হৃদ্‌রোগ, স্ট্রোক, সেপসিস কিংবা ক্যানসারের মতো রোগে সময়ই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কার্ডিওলজিতে একটি বহুল ব্যবহৃত কথা হলো—‘Time is Muscle’। অর্থাৎ হার্ট অ্যাটাকের চিকিৎসায় প্রতিটি মিনিট মূল্যবান।

এছাড়া অপচিকিৎসার কারণে—

* মৃত্যুহার বৃদ্ধি পায়
* রোগ জটিল আকার ধারণ করে
* পরিবার আর্থিকভাবে নিঃস্ব হয়
* চিকিৎসকদের প্রতি জনগণের আস্থা কমে
* দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়
* জাতীয় উৎপাদনশীলতা কমে যায়।

উন্নত বিশ্বের অভিজ্ঞতা

যুক্তরাষ্ট্রে FDA, যুক্তরাজ্যে MHRA, ইউরোপে EMA, অস্ট্রেলিয়ায় TGA—এসব সংস্থা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত নয় এমন চিকিৎসা বা ওষুধের প্রচার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে। মিথ্যা স্বাস্থ্যবিজ্ঞাপন, বিভ্রান্তিকর চিকিৎসা দাবি কিংবা রোগীদের প্রতারণার বিরুদ্ধে অনেক দেশে বড় অঙ্কের জরিমানা, লাইসেন্স বাতিল এবং কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।

বাংলাদেশে এখন কী করা প্রয়োজন?

বাংলাদেশে নিরাপদ স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে কয়েকটি পদক্ষেপ জরুরি।

* বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত নয় এমন চিকিৎসার বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ করতে হবে।

* স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, বিএমডিসি, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ে একটি কার্যকর টাস্কফোর্স গঠন করতে হবে।
* নিবন্ধনবিহীন চিকিৎসাকেন্দ্রের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করতে হবে।
* সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর স্বাস্থ্যবিষয়ক প্রচারণা পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
* জাতীয় পর্যায়ে Evidence-Based Healthcare Policy প্রণয়ন করতে হবে।
* চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের মাননিয়ন্ত্রণ (Quality Assurance) ও স্বীকৃতি (Accreditation) বাধ্যতামূলক করতে হবে।
* রোগীর নিরাপত্তা (Patient Safety) নিশ্চিত করতে স্বাধীন তদারকি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
* স্কুল, কলেজ ও গণমাধ্যমে স্বাস্থ্যশিক্ষা এবং বৈজ্ঞানিক সচেতনতা বাড়াতে হবে

চিকিৎসকদেরও আত্মসমালোচনা প্রয়োজন

চিকিৎসা একটি মহৎ পেশা। তাই চিকিৎসকদেরও নৈতিকতা, স্বচ্ছতা এবং সর্বশেষ বৈজ্ঞানিক নির্দেশিকা অনুসরণে আপসহীন থাকতে হবে। রোগীকে পর্যাপ্ত সময় দেয়া, সঠিক পরামর্শ প্রদান, অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা এড়ানো এবং নিয়মিত পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে চিকিৎসা পেশার প্রতি জনগণের আস্থা আরও সুদৃঢ় করা সম্ভব।

সরকারের প্রতি আবেদন

জনস্বার্থে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীসহ স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি), ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট সকল নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রতি বিনীত আহ্বান—
বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত নয় এমন চিকিৎসা, বিভ্রান্তিকর স্বাস্থ্যবিজ্ঞাপন এবং প্রতারণামূলক স্বাস্থ্যসেবার বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করুন।
স্বাস্থ্যসেবাকে জবাবদিহিমূলক, নিরাপদ এবং বিজ্ঞানভিত্তিক করার এখনই উপযুক্ত সময়।

উপসংহার

চিকিৎসাবিজ্ঞান বিশ্বাসের নয়, প্রমাণের বিষয়। মানুষের জীবন নিয়ে কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা, বাণিজ্য বা প্রতারণার সুযোগ নেই। একটি উন্নত, মানবিক ও কল্যাণমুখী বাংলাদেশ গড়তে হলে চিকিৎসাক্ষেত্রে একটিই মানদণ্ড থাকতে হবে—বিজ্ঞান, নৈতিকতা ও জবাবদিহিতা।

প্রতিটি নাগরিকের অধিকার নিরাপদ, কার্যকর এবং প্রমাণভিত্তিক চিকিৎসা পাওয়া। সেই অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্র, চিকিৎসক, নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং সমাজ—সবার সম্মিলিত দায়িত্ব। বৈজ্ঞানিক চিকিৎসার কোনো বিকল্প নেই। প্রমাণভিত্তিক চিকিৎসাই হোক বাংলাদেশের একমাত্র মানদণ্ড।

লেখক: অধ্যাপক ডা. এ কে এম মহিউদ্দিন ভূঁইয়া মাসুম,
এমবিবিএস (ঢাকা মেডিকেল কলেজ), এমডি (কার্ডিওলজি),
ক্লিনিক্যাল ও ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজিস্ট,
বিভাগীয় প্রধান, কার্ডিওলজি বিভাগ,
পপুলার মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, ঢাকা।

MD HUSAIN AHMED

১৮ মিনিট আগে

আমি যে পানিপড়া তেলপড়া ব্যবহার করি।

Md. Monirul Islam

১ ঘন্টা আগে

অসাধারণ সময়োপযোগী লেখা। কিন্তু যাদের উদ্দেশ্যে মূলতঃ লিখেছেন, তাদের রিডিং, হিয়ারিং, + অন্যান্য জটিল মানষিক উপসর্গ থাকায়, তাদের কর্ণকুহরে এ লেখা প্রবেশ করিবে না। বড়োই দুর্ভাগা এই জাতি। মহান আল্লাহ আপনার কল্যাণ করুন।

মন্তব্য করুন