বাংলাদেশসহ ৬০ দেশের উপর নতুন শুল্ক আরোপ করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। মূলত জোরপূর্বক শ্রমরোধে ব্যর্থতার অভিযোগে এই পদক্ষেপ নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। দেশগুলোর উপর ১০ শতাংশ এবং ১২.৫ শতাংশ হারে নতুন শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। অস্থায়ী ১০ শতাংশ বৈশ্বিক শুল্কের মেয়াদ শেষ হওয়ায় এ পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার ফেডারেল রেজিস্টারের বিজ্ঞপ্তিতে নতুন শুল্ক ঘোষণা করা হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প গত বছর ক্ষমতায় আসার পর বিশ্ব বাণিজ্যে যে নতুন উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল, এটি তারই সবশেষ সংযোজন।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৯৯.৪ শতাংশ আমদানি এ শুল্কের আওতায় আসবে। তবে তেল ও গ্যাস, সার এবং নির্দিষ্ট কিছু খাদ্যদ্রব্যসহ অসংখ্য পণ্যকে এ শুল্ক থেকে ছাড় দেয়া হবে।
এই দেশগুলো থেকে পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে নিয়মিত শুল্কের অতিরিক্ত হিসেবে নতুন এই শুল্ক আদায় করবে যুক্তরাষ্ট্র কাস্টমস, যেমন বাংলাদেশের পণ্যে গড় শুল্ক ১৫ শতাংশ। তার সঙ্গে নতুন শুল্ক যুক্ত হয়ে মোট শুল্ক দাঁড়াবে ২৫ শতাংশ। অন্য দেশের ক্ষেত্রেও এভাবেই শুল্কের হিসাব হবে।
নতুন এই শুল্কে বাংলাদেশের পণ্য বাণিজ্যে কতোটা প্রভাব পড়বে, সে বিষয়ে রপ্তানিকারকরা জানান, গত ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন আদালতে পাল্টা শুল্ক স্থগিত হওয়ার পর ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইন প্রয়োগের মাধ্যমে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ হয়। সেটি শেষ হতে নতুন করে ১০ শতাংশ শুল্ক বসছে। ফলে মোট শুল্কহারে কোনো পরিবর্তন আসছে না। তবে দুশ্চিন্তা হচ্ছে, ট্রাম্প প্রশাসন আরেকটি বিষয়ে তদন্ত করছে। সেখানে কোনো শুল্ক আরোপ হয় কিনা, সেটির জন্য অপেক্ষায় থাকতে হবে।
এক বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার বলেন, প্রায় এক শতাব্দী ধরে যুক্তরাষ্ট্রে জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্য আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে এবং আমরা তা কঠোরভাবে কার্যকর করছি। নতুন পদক্ষেপ মানবাধিকার লঙ্ঘন ও বাণিজ্য বিকৃতিকারী এই চর্চা সংশোধনের সূচনা করবে এবং বিশ্বের সর্বত্র শ্রমিকদের কল্যাণে সহায়তা করবে।’
পাল্টা শুল্ক নিয়ে যা হয়েছে: যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ২০২৫ সালের ২রা এপ্রিল বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে পণ্য আমদানির ওপর বিভিন্ন হারে পাল্টা শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন। শুরুতে বাংলাদেশের জন্য এই হার ছিল ৩৭ শতাংশ। পরে শুল্ক আরোপ তিন মাসের জন্য পিছিয়ে দেয় যুক্তরাষ্ট্র। গত বছরের ৭ই জুলাই বাংলাদেশের ওপর আরোপিত শুল্ক ৩৭ থেকে ৩৫ শতাংশে নামানোর ঘোষণা দেন ট্রাম্প। আরও দর-কষাকষির পর ২রা আগস্ট এই হার কমে হয় ২০ শতাংশ। গত বছরের ৭ই আগস্ট থেকে এই পাল্টা শুল্কহার কার্যকর হয়। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানিতে গড় শুল্ক ১৫ শতাংশ। পাল্টা শুল্ক এই শুল্কের অতিরিক্ত হিসেবে আরোপ হয়।
গত ৯ই ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশ পারস্পরিক বাণিজ্যচুক্তি করে। সে চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশের উপর দেশটির পাল্টা শুল্কের হার ১৯ শতাংশ। দুই সপ্তাহ পার না হতেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প যে পাল্টা শুল্ক আরোপ করেছিলেন, তা মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট অবৈধ ঘোষণা করেন। সেই রায়ের কয়েক ঘণ্টার মাথায় সব দেশের পণ্যের উপর ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইন প্রয়োগের মাধ্যমে নতুন করে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন ট্রাম্প। নতুন শুল্ক ২৪শে ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যকর হয়। আইন অনুযায়ী ১৫০ দিনের জন্য শুল্ক আরোপ করতে পারেন প্রেসিডেন্ট। সেই শুল্ক শেষ হওয়ার সময় থেকেই নতুন আরোপিত এই শুল্কহার কার্যকর হবে।
অন্য দেশের শুল্ক হার: ইউএসটিআরের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১৭টি দেশের পণ্য আমদানিতে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করবে যুক্তরাষ্ট্র। দেশগুলো হচ্ছে বাংলাদেশ, ভারত, আর্জেন্টিনা, যুক্তরাজ্য, কম্বোডিয়া, কানাডা, ইকুয়েডর, এল সালভাদর, গুয়াতেমালা, হন্ডুরাস, ইন্দোনেশিয়া, জর্ডান, মালয়েশিয়া, মেক্সিকো, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও ত্রিনিদাদ অ্যান্ড টোবাগো। অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), তাইওয়ান, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও সুইজারল্যান্ডের ক্ষেত্রে মোট শুল্ক ১০ অথবা ১২.৫ শতাংশ হবে। এর বাইরে চীন, ভিয়েতনাম, তুরস্ক, ব্রাজিল, মিসরসহ ৩৮টি দেশের পণ্যে ১২.৫ শতাংশ শুল্ক নির্ধারণ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে স্প্যারো গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শোভন ইসলাম বলেন, শুল্ক আরোপ করায় যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান অনেকটাই অক্ষুণ্ন থাকছে। বৈশ্বিক বাণিজ্যের ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জের মধ্যেও এটি বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক দিক।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগী দেশগুলোর শুল্কহার মোটামুটি অপরিবর্তিত থাকায় বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিতে নতুন করে কোনো চাপ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা নেই। মোহাম্মদ হাতেম বলেন, জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে বাংলাদেশ ব্যর্থ হয়েছে- এমন অভিযোগের ভিত্তিতে এই শুল্ক আরোপকে তিনি ‘অন্যায় ও অযৌক্তিক’ মনে করেন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ব্যাখ্যা: যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে যে শুল্ক আরোপ করেছে সেক্ষেত্রে অন্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশ সর্বনিম্ন শুল্ক হারের আওতায় রয়েছে বলে জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। শুক্রবার এক বিবৃতিতে এ কথা জানানো হয়। এতে বলা হয়, শুল্কের হার ১০% থেকে সর্বোচ্চ ১২.৫% পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। এটি আগে ১২২ ধারার অধীনে কার্যকর করা সাময়িক ১০% বৈশ্বিক শুল্ক ব্যবস্থাকে প্রতিস্থাপন করবে। ফলে, যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক ও রপ্তানি বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান অক্ষুণ্ন থাকবে।
বাণিজ্যমন্ত্রীর বক্তব্য: যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক নীতি ও পেট্রোলিয়াম পণ্যের দাম প্রসঙ্গে বাণিজ্য, শিল্প, পাট ও বস্ত্রমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বঘোষিত শুল্ক আইন অনুযায়ী ১৫০ দিনের মেয়াদ শেষ হওয়ায় নতুন নামে একই শুল্ক পুনর্বহাল করা হয়েছে। এটি মূলত পুরনো শুল্কেরই একটি ‘রিপ্লেসমেন্ট’ বা প্রতিস্থাপন। নতুন কোনো অতিরিক্ত শুল্ক চাপানো হয়নি। ফলে শুল্ক পরিস্থিতিতে বাস্তবে কোনো পরিবর্তন আসছে না। শুক্রবার সিলেট সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের উপর শুল্কের বোঝা বেশি না হলে দেশের প্রতিযোগিতা-সক্ষমতা বজায় থাকবে। তিনি বলেন, প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় আমাদের শুল্কহার বেশি হলে আমরা অসুবিধায় পড়বো। অন্যথায় উদ্বিগ্ন হওয়ার তেমন কোনো কারণ নেই।
