‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ আয়োজিত জাতীয় পর্যায়ের মেয়েদের ফুটবলে বরিশাল অঞ্চলকে ৫-০ গোলে হারালো রাজশাহী অঞ্চল। দলের এই জয়ের পেছনে একক অবদান এক কিশোরীর, যার পা থেকে এসেছে চার গোল। তিনি রাজশাহীর নাটোর জেলার লালপুর উপজেলার বিস্ময় বালিকা জান্নাতুল ফেরদৌস ফারিহা। সপ্তম শ্রেণি পড়ুয়া এই ফরোয়ার্ডের ফুটবলের আঙিনায় উঠে আসার গল্পটা সহজ ছিল না। ফারিহার পরিবার চরম প্রতিকূলতা আর অভাব-অনটনে ঘেরা। বাবা বাকপ্রতিবন্ধী হওয়ায় কাজ করতে পারেন না। এক বোন ও এক ভাইসহ ফারিহাদের পাঁচজনের এই সংসারটি টানছেন তার মা। তিনি স্থানীয় এলজিইডি’র রাস্তায় দিনমজুরের কাজ করেন।
মায়ের সামান্য আয়ে চলে সংসার। এই টানাপড়েনের মধ্যেও ফুটবলের স্বপ্নকে বুকে আগলে রেখেছেন ফারিহা। বাবার অনুপস্থিতিতে নিজের সামান্য জমিতে ভাইয়ের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ধান রোপণ কিংবা পাট ধোয়ার মতো কঠিন কায়িক পরিশ্রমও করতে হয় তাকে। ফুটবলার হওয়ার তীব্র তাড়নায় প্রতিদিনের ক্লান্তি উপেক্ষা করে বাড়ি থেকে ৮ কিলোমিটার সাইকেল চালিয়ে নাটোর বেঙ্গল একাডেমিতে গিয়ে নিয়মিত অনুশীলন করে সে। পারিবারিক সমর্থন থাকলেও ফারিহার ফুটবলার হওয়ার পথে সবচেয়ে বড় প্রাচীর হয়ে দাঁড়ায় সমাজের রক্ষণশীল দৃষ্টিভঙ্গি। মেয়ে মানুষ কেন হাফপ্যান্ট পরে ফুটবল খেলবে, পড়ালেখা শেষ করে অল্প বয়সে বিয়ে করে সন্তান ও সংসার সামলানোই মেয়েদের একমাত্র কাজ- এমন হাজারো কটু কথা প্রতিনিয়ত শুনতে হয়েছে তাকে। সমাজের সেই বাঁকা চোখকে একপাশে ঠেলে ফারিহা তার লক্ষ্য স্থির রেখেছে। এই লড়াইয়ে তার পাশে ঢাল হয়ে দাঁড়ান তার মা এবং কোচ মোহাম্মদ জুয়েল।
অনুশীলনে যাওয়ার মতো যাতায়াত ভাড়া কিংবা ভালো বুট কেনার টাকা যখন ফারিহার ছিল না, তখন নিজের সন্তানের মতো তার পাশে দাঁড়ান কোচ জুয়েল, দিয়েছেন যাতায়াত ভাড়াও। তৃণমূল থেকে জাতীয় পর্যায়ে উঠে আসাটা ফারিহার জন্য যেমন ছিল কষ্টের, তেমনি আনন্দের। তৃতীয় শ্রেণি থেকে ফুটবলের আঙিনায় পা রাখা ফারিহা উপজেলা পর্যায়ে চোটের কারণে খেলতে পারেনি। তবে জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে দুর্দান্ত পারফর্ম করে জাতীয় আসরে নিজের জাত চিনিয়েছে। মাঠে বসে বরিশাল ও রাজশাহীর মধ্যকার পুরো ম্যাচটি উপভোগ করে নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসের ফুটবল ডিসিপ্লিনের বাছাই কমিটি। জাতীয় দলের তারকা ফরোয়ার্ড ঋতুপর্ণা চাকমা ফারিহার প্রিয় ফুটবলার। তার প্রতি ভালোবাসা থেকে নিজের জার্সির নম্বরও বেছে নিয়েছেন ১৭। ম্যাচে চার গোল করার কৃতিত্ব একা নিতে নারাজ এই কিশোরী। তার মতে, সতীর্থদের দারুণ পাসের কারণেই সে গোল করতে পেরেছে।
