পদত্যাগ করছেন প্রেসিডেন্ট মো. সাহাবুদ্দিন। তার পদত্যাগের মধ্যদিয়ে নতুন প্রেসিডেন্টের জন্য বঙ্গভবনের দুয়ার খুলছে। পদত্যাগের পর নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় নতুন প্রেসিডেন্ট পেতে কিছু সময় লাগতে পারে। সে পর্যন্ত জাতীয় সংসদের স্পিকার মেজর(অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করবেন। মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ায় এখন নতুন আলোচনা- কে হচ্ছেন বঙ্গভবনের নতুন বাসিন্দা।
বিএনপি’র নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, দলের সিনিয়র একজন নেতাকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে বেছে নেয়া হবে-আপাতত এমন সিদ্ধান্ত রয়েছে। সে হিসেবে দলের সিনিয়র কয়েকজন নেতার নাম তালিকায় আছে। দলের বাইরের একজন প্রেসিডেন্ট হচ্ছেন নানা মাধ্যমে এমন আলোচনা ছড়ালেও সূত্রটি তা নাকচ করে জানিয়েছে একজন রাজনীতিবিদই হচ্ছে দেশের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট। এই পদ নিয়ে ইতিমধ্যে বিএনপিতে আলোচনা শুরু হয়েছে জানিয়ে দলের একজন সিনিয়র নেতা জানিয়েছেন, দলের সিনিয়র কাউকে প্রেসিডেন্ট করতে হবে এমন আলোচনাই হচ্ছে। দায়িত্ব গ্রহণের সোয়া তিন বছরের মাথায় পদত্যাগ করছেন মো. সাহাবুদ্দিন। ২০২৪ সালের ৫ই আগস্টে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর সাহাবুদ্দিনকে অপসারণের জোর দাবি উঠে। তাকে অপসারণ ও গ্রেপ্তারের দাবিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল বঙ্গভবন ঘেরাও সহ নানা কর্মসূচি পালন করে।
কিন্তু অভ্যুত্থান পরবর্তী পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পরামর্শে প্রেসিডেন্ট পদে পরিবর্তনের উদ্যোগ নেয়নি অন্তর্বর্তী সরকার। তবে প্রেসিডেন্ট সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে ছিলেন। গত ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর প্রেসিডেন্ট পদে পরিবর্তনের ফের আলোচনা শুরু হলেও বিএনপি’র নেতৃত্ব দেখে শুনে ব্যবস্থা নেয়ার পথে হাঁটে। দেড় বছর মেয়াদ থাকায় প্রেসিডেন্ট পদে পরিবর্তনে তাড়াহুড়ো ছিল না এতদিন। কিন্তু সাহাবুদ্দিন নিজেই পরিস্থিতি জটিল করে তুলেছেন। গত মে মাসে লন্ডন সফরের সময় তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেনÑ গোয়েন্দা সূত্রের বরাতে এমন তথ্য সামনে এসেছে। গত ৯ থেকে ১৮ই মে সাহাবুদ্দিন চিকিৎসার জন্য লন্ডন সফর করেন। এসময় তিনি দিল্লিতে অবস্থানরত শেখ হাসিনার সঙ্গে যোগাযোগ করেন বলে গোয়েন্দা সূত্রের দাবি। অনেকে বলছেন, অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তার এই যোগাযোগ সরাসরি শপথ ভঙ্গের মধ্যে পড়ে। এ ছাড়া তার এই যোগাযোগ প্রমাণ করে তিনি ফ্যাসিস্টদের পক্ষে এখনো কাজ করছেন। এ কারণে তাকে এই পদে রাখার আর কোনো সুযোগ নেই। শেখ হাসিনার সঙ্গে সাহাবুদ্দিনের যোগাযোগের বিষয়ে তথ্য পাওয়ার পরই সরকারের পক্ষ থেকে বঙ্গভবনে বিশেষ বার্তা দেয়া হয়। তাকে সরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে বলা হয়। জুলাই মাসের মধ্যেই এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে সরকারি ইচ্ছার বিষয়টিও তাকে অবহিত করা হয়। সরকারি সূত্রের দাবি আপাতত সরে যাওয়ার বিষয়ে প্রেসিডেন্টকে ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে। তিনি নিজে থেকে পদত্যাগ করবেন। সেক্ষেত্রে স্বাস্থ্যগত বা পারিবারিক কারণ দেখিয়ে তিনি পদত্যাগ করতে পারেন। সরকারের এমন ইচ্ছা প্রকাশের পরই সাহাবুদ্দিন সরে দাঁড়ানোর প্রস্তুতি নিয়েছেন। আজ কালের মধ্যেই স্পিকার বরাবর পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে দেবেন বলে বঙ্গভবন সূত্র জানিয়েছে।
সূত্র জানায়, প্রেসিডেন্ট পদত্যাগের প্রস্তুতি শুরু করেছেন। নিয়ম অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট জাতীয় সংসদের স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেবেন। স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বিদেশে থাকায় দুই/একদিন সময় লাগার বিষয় আলোচনা হলেও সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী আজই স্পিকার সফর সংক্ষিপ্ত করে দেশে ফিরছেন। তিনি দেশে আসার পর আজ বা আগামীকালই প্রেসিডেন্ট পদত্যাগপত্র জমা দিতে পারেন।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে প্রেসিডেন্টের প্রেস সচিব মো. সারওয়ার আলম মানবজমিনকে বলেন, প্রেসিডেন্ট পদত্যাগ করলে এটা আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হবে। এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো তথ্য নেই।
সংবিধান অনুযায়ী প্রেসিডেন্টের পদত্যাগপত্র স্পিকার বরাবর পাঠানোর মধ্য দিয়েই শেষ হবে বঙ্গবভনে সাহাবুদ্দিন অধ্যায়। দেশের বাইশতম প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি তিন বছর তিন মাস এই ভবনের বাসিন্দা হিসেবে আছেন। সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করলেও পদটি শূন্য হবে না। নিয়ম অনুযায়ী পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার আগ পর্যন্ত অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট হিসেবে স্পিকার মেজর অব. হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম এ পদে দায়িত্ব পালন করবেন। সংবিধান অনুয়ায়ী পদত্যাগের পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচন করতে হবে। জাতীয় সংসদের পরবর্তী অধিবেশন বসবে দুই মাস পর। তখন আনুষ্ঠানিকভাবে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হবে। তবে সরকার চাইলে জরুরি অধিবেশন ডেকে তার আগেও এই নির্বাচন হতে পারে।
ওদিকে বঙ্গভবনে সাহাবুদ্দিনের উত্তরসূরি কে হচ্ছেন এ নিয়ে আলোচনা রাজনৈতিক অঙ্গনে। বিভিন্ন মাধ্যমে আলোচনায় এসেছে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি প্রেসিডেন্ট পদে পছন্দের তালিকায় আছেন। বিষয়টি প্রথম সামনে আসে প্রবাসী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়েরের এক ফেসবুক পোস্ট ঘিরে। সায়ের ফেসবুকে লেখেন, ‘আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করতে যাচ্ছেন রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন। এর চাইতেও বিস্ময়কর খবর হলো নতুন রাষ্ট্রপতি হিসেবে বিএনপি’র কোনো শীর্ষ নেতার পরিবর্তে পছন্দের তালিকায় রয়েছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণি।’ তার এই ফেসুবক স্ট্যাটাসের পর থেকেই মূলত প্রেসিডেন্টের পদত্যাগ ও নতুন প্রেসিডেন্ট নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।
নাসিমুল গনি বিএনপি আমলের প্রভাবশালী আমলা ও জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকার ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের একান্ত সচিব (পিএস) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তাকে পুনরায় চাকরিতে ফিরিয়ে আনে। প্রথমে তাকে প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের সচিব, পরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এবং সর্বশেষ ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে মন্ত্রিপরিষদ সচিব হিসেবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া হয়। বিধিসম্মতভাবে নাসিমুল গণির নিয়োগ সম্ভব নয় কারণ মন্ত্রিপরিষদ সচিব চাকরিরত থাকায় সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার যোগ্য নন। রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হতে গেলে তাকে সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচন করার যোগ্যতা থাকতে হয়।
এদিকে, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ছাড়া অরাজনৈতিক কোনো ব্যক্তিকে রাষ্ট্রপতির মতো জাতীয় জনগুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ দলের জন্য অতীতে সুফল বয়ে আনেনি বলেও বিএনপিতে আলোচনা চলছে। এক্ষেত্রে অনেকে প্রফেসর ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ এর উদাহরণ সামনে আনছেন।
নতুন প্রেসিডেন্ট কে হচ্ছেন রাজনীতিবিদ না আমলা এ বিষয়ে গতকাল বিএনপি’র সিনিয়র কয়েকজন নেতা ও গুরুত্বপূর্ণ সূত্রের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে মানবজমিন। নেতাদের প্রায় সবাই জানিয়েছেন, দলের কোনো সিনিয়র নেতাই যাচ্ছেন বঙ্গভবনে। কোনো আমলার এ পদে যাওয়ার সম্ভাবনা কম। তারা জানিয়েছেন অতীত অভিজ্ঞতা পরিস্থিতি বিবেচনায় দলের পরীক্ষিত একজন নেতাকেই এই পদে দায়িত্ব দিতে হবে।
দলের ভেতরে এই পদে তালিকায় বেশি আলোচনা হচ্ছে স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য ড. আব্দুল মঈন খানের নাম। দলীয় সূত্রের দাবি এই তিনজন থেকেই একজনকে বেছে নেয়া হতে পারে দেশের তেইশতম প্রেসিডেন্ট। আরেক সিনিয়র নেতা নজরুল ইসলাম খানের নামও কেউ কেউ বলছেন।
যিনি নির্বাচন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বঙ্গভবনের পরবর্তী বাসিন্দা হবেন। ইতিমধ্যে এ বিষয়ে দলে আলোচনা শুরু হয়েছে বলে দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে। এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে গতকাল ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন মানবজমিনকে বলেন, আমি এ বিষয়ে কিছু অবগত নই।
বিকালে মন্ত্রিপরিষদের বৈঠক শেষে স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ গতকাল এ বিষয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, শুক্রবার পর্যন্ত অপেক্ষা করুন।
প্রেসিডেন্টের পদত্যাগের বিষয়ে বিএনপি’র ভাইস চেয়ারম্যান ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদীন মানবজমিনকে বলেন, বর্তমান প্রেসিডেন্ট পদত্যাগ করলে পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নিয়ে আলোচনা শুরু হবে।
