যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব ঐতিহাসিক পারমাণবিক চুক্তিতে সই করেছে। এর মাধ্যমে উপসাগরীয় দেশটি একটি বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচি গড়ে তোলার সুযোগ পাবে। চুক্তিটিকে ‘শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি মন্ত্রণালয় (ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব এনার্জি) জানিয়েছে, এই চুক্তির মাধ্যমে সৌদি আরবের পারমাণবিক জ্বালানি কর্মসূচিতে মার্কিন কোম্পানিগুলোর জন্য বড় ধরনের সুযোগ তৈরি হবে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি।
তবে পূর্ণাঙ্গ চুক্তি প্রকাশ করা হয়নি। মার্কিন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভবিষ্যতে এই চুক্তির আওতায় সৌদি আরবকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অনুমতি দেওয়া হতে পারে। সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হলেও, তা পারমাণবিক বোমা তৈরিতেও ব্যবহার করা সম্ভব। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি হলে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এমন পদক্ষেপ হবে প্রথম, যা অস্থিতিশীল মধ্যপ্রাচ্যে ভবিষ্যতে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এই সহযোগিতা চুক্তির পাশাপাশি একটি দ্বিপক্ষীয় নিরাপত্তা সুরক্ষা চুক্তিও সই হয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এই দুটি চুক্তি কয়েক দশকব্যাপী বহু বিলিয়ন ডলারের অংশীদারিত্বের আইনি ভিত্তি তৈরি করেছে, যা পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধসহ একাধিক অর্থনৈতিক ও কৌশলগত লক্ষ্য বাস্তবায়নে সহায়তা করবে।
সৌদি সরকারও এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, এই চুক্তি দুই দেশের জ্বালানি খাতে বিদ্যমান সহযোগিতারই সম্প্রসারণ। তারা আরও উল্লেখ করেছে, গত নভেম্বরে সৌদি নেতার ওয়াশিংটন সফরের পরই এই চুক্তির পথ প্রশস্ত হয়। ওদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংঘাত আরও তীব্র হচ্ছে। দীর্ঘদিনের মার্কিন মিত্র সৌদি আরবে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। সেগুলো ইতিমধ্যে ইরানের হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। একই সঙ্গে চুক্তি ঘোষণার মাত্র দুই দিন আগে ইয়েমেনে ইরান সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে ‘সামুদ্রিক অবরোধ’ ঘোষণা করেছে।
চুক্তির নির্দিষ্ট শর্ত প্রকাশ করা হয়নি। তবে এর আগে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথ সমীক্ষা শেষে সৌদি আরবকে নিজেদের ভূখণ্ডে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অনুমতি দেয়া হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিতে নির্মিত একটি স্থাপনায় এই জ্বালানি উৎপাদন করা হবে, যাতে আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভর করতে না হয়। এতে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কয়েক বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি হতে পারে। কারণ মার্কিন কোম্পানিগুলো সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম উৎপাদন কেন্দ্র নির্মাণে অংশ নিতে পারবে।
যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি মন্ত্রী ক্রিস রাইট এক বিবৃতিতে বলেন, নিশ্চিত থাকুন, এই চুক্তিগুলো পারমাণবিক নিরাপত্তা ও অস্ত্র বিস্তার রোধে সর্বোচ্চ মান বজায় রাখবে। পাশাপাশি এতে বিশ্বের সেরা পারমাণবিক প্রযুক্তি ও বিজ্ঞান ব্যবহৃত হবে, যা যুক্তরাষ্ট্রেই উদ্ভাবিত। জ্বালানি মন্ত্রণালয় আরও জানিয়েছে, এই চুক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও ওই অঞ্চলের নিরাপত্তা জোরদার করবে এবং পারমাণবিক নিরাপত্তা, সুরক্ষা ও অস্ত্র বিস্তার রোধে উচ্চমান বজায় রাখবে। একই সঙ্গে বেসামরিক পারমাণবিক প্রযুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানও শক্তিশালী হবে। তবে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান মিত্র ইসরাইলের কয়েকজন পারমাণবিক বিশেষজ্ঞ ও সাবেক কর্মকর্তা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এই পরিকল্পনার মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত সৌদি আরব পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জন করতে পারে। যদিও অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, সেই পর্যায়ে পৌঁছাতে কয়েক দশক সময় লাগবে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কঠোর বিরোধিতার মুখে পড়তে হবে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক থিংক ট্যাঙ্ক ডিফেন্স প্রায়োরিটিজের মধ্যপ্রাচ্য কর্মসূচি বিষয়ক পরিচালক রোজমেরি কেলানিক বলেন, যদি এই চুক্তিতে সৌদি আরবকে নিজস্ব ভূখণ্ডে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার সুযোগ দেয়া হয়, তবে সেটি হবে অত্যন্ত বিস্ময়কর। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র আগে কখনও কোনো দেশকে তাদের নিজস্ব মাটিতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করতে সহায়তা করেনি। কারণ, একটি দেশ যদি নিজেই পারমাণবিক জ্বালানি উৎপাদন করতে পারে, তাহলে তাদের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।
চুক্তিটি অনুমোদনের জন্য মার্কিন কংগ্রেসে পাঠানো হবে। ডেমোক্রেট ও রিপাবলিকান উভয় দলের কয়েকজন আইনপ্রণেতা চুক্তির বিরোধিতা করতে পারেন। তবে বর্তমানে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির নিয়ন্ত্রণেই কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সমালোচকদের উদ্বেগ নাকচ করে দিয়ে বলেন, বিশ্বের কোনো দেশের সঙ্গে এমন কোনো চুক্তি যুক্তরাষ্ট্র করবে না, যা পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তারের ঝুঁকি তৈরি করে। তিনি ফিলিপাইন সফরকালে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন।
চুক্তির বিরোধিতাকারী কয়েকজন ডেমোক্রেট স্মরণ করিয়ে দেন, সিনেটর থাকাকালে রুবিও ‘নো নিউক্লিয়ার উইপনস ফর সৌদি অ্যারাবিয়া অ্যাক্ট’কে সমর্থন করেছিলেন। ওই আইনে সৌদি আরবের সঙ্গে কোনো পারমাণবিক চুক্তির আগে কংগ্রেসের অনুমোদন বাধ্যতামূলক করা হয়। ম্যাসাচুসেটসের ডেমোক্রেট সিনেটর এডওয়ার্ড মার্কি এক বিবৃতিতে ট্রাম্প ও রুবিওর সমালোচনা করে বলেন, তাদের ভণ্ডামির সঙ্গে পাল্লা দিতে পারে শুধু তাদের বেপরোয়া আচরণ। তিনি বলেন, ইরানের পারমাণবিক বোমা ঠেকানোর অজুহাতে তারা ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছে, অথচ একই সময়ে সৌদি আরবের মতো একটি যুদ্ধপ্রবণ ও কর্তৃত্ববাদী দেশকে পারমাণবিক প্রযুক্তি অর্জনের সুযোগ দিচ্ছে।
যদি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের বিধান এই চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত থাকে, তাহলে এটি ২০০৯ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের করা চুক্তি থেকে আলাদা হবে। ওই চুক্তিতে আমিরাত নিজস্ব জ্বালানি উৎপাদন করে না এবং আরও নানা ধরনের বিধিনিষেধ মেনে চলে। এ কারণে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠনও এই চুক্তি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করতে পারে। তাদের লক্ষ্যই হলো বিশ্বে পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশের সংখ্যা না বাড়তে দেয়া। সৌদি আরব বহু বছর ধরেই বিভিন্ন মার্কিন প্রশাসনের কাছে এমন একটি চুক্তির জন্য তদবির করে আসছিল। তবে ওয়াশিংটন এতদিন একটি প্রধান শর্ত দিয়েছিল- ইসরাইলকে স্বীকৃতি দিতে হবে সৌদি আরবকে এবং তার সঙ্গে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে হবে।
তবে মার্কিন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই শর্তটি এবার চুক্তির পূর্বশর্ত হিসেবে বাদ দেয়া হয়েছে। হোয়াইট হাউসে দায়িত্ব পালনকালে ডনাল্ড ট্রাম্প সৌদি আরবের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলতে কাজ করেছেন। বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তি থেকে কৌশলগত ও বাণিজ্যিক সুবিধা পাওয়ার পাশাপাশি আরেকটি কারণও থাকতে পারে। কারণ, রাশিয়া ও চীনও সৌদি আরবের সঙ্গে একই ধরনের পারমাণবিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করছিল। যুক্তরাষ্ট্র সম্ভবত সেই প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে থাকতে চায়নি। এই চুক্তি সৌদি আরবের জন্য বড় ধরনের কূটনৈতিক সাফল্য।
এটি ভবিষ্যতে মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্যে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। যদিও সেই পরিবর্তন তাৎক্ষণিকভাবে নয়, বরং কয়েক বছর বা তারও বেশি সময় পরে স্পষ্ট হতে পারে। কয়েক মাস ধরে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল ও ইরানের সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতেই রয়েছে পারমাণবিক ইস্যু। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল দাবি করে, ফেব্রুয়ারিতে তারা ইরানের ওপর হামলা চালিয়েছিল যাতে দেশটি কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে। যদিও তেহরান বরাবরই এমন পরিকল্পনার কথা অস্বীকার করেছে।
সৌদি আরবের কার্যত শাসক যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ২০১৮ সালে সিবিএস নিউজকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, তার দেশ পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের পরিকল্পনা করছে না। তবে তিনি যোগ করেন, এতে কোনো সন্দেহ নেই, যদি ইরান পারমাণবিক বোমা তৈরি করে, তাহলে আমরাও যত দ্রুত সম্ভব একই পথ অনুসরণ করব।
