ধর্ষণের শিকার হওয়ার কথা জানানোর পর ব্ল্যাকমেইল এবং বিচার প্রক্রিয়ায় ব্যাঘাত ঘটানোর দায়ে এক বৃটিশ নারীকে ছয় বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে হংকং এর আদালত। হংকং পুলিশের কাছে তিনি ধর্ষণের অভিযোগ করেছিলেন। পরবর্তীতে তিনি ব্ল্যাকমেইল করেছেন বলে প্রমাণিত হয়। ইসাবেল রোজ নামের ২৬ বছর বয়সী দক্ষিণ-পূর্ব লন্ডনের বাসিন্দা ওই নারী দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ভ্রমণের সময় এক বৃটিশ ব্যাংকারের সঙ্গে পরিচিত হন এবং ২০২৪ সালের শুরুর দিকে তার সঙ্গে দেখা করতে হংকং যান। এ খবর দিয়েছে অনলাইন গার্ডিয়ান।
জামিনে থাকাকালীন রোজ বলেছিলেন, চার দিনের পোশাক নিয়ে এখানে এসেছিলাম, ভাবিনি দুই বছর থাকতে হবে, হংকং আসার পরপরই কোনো এক পর্যায়ে বিষয়গুলো ভুল দিকে মোড় নেয়। হংকংয়ের জেলা বিচারক অ্যাড্রিয়ানা নোয়েল সে চিং সাজা ঘোষণার আগে বলেন, অভিযুক্ত নারী অনুশোচনার কোনো লক্ষণ দেখাননি এবং তিনি অভিযোগটিকে সম্পূর্ণ বানোয়াট বলে অভিহিত করেন। ২০২৪ সালে প্রথম গ্রেফতার হওয়া এই ইভেন্টস ম্যানেজার পুরো বিচার প্রক্রিয়া জুড়ে তিনি ধর্ষণের শিকার হয়েছেন বলেই দাবি করে গেছেন। মামলাটির মূল ভিত্তি ছিল বৃটিশ ব্যাংকারের বিরুদ্ধে তোলা ধর্ষণের অভিযোগ এবং তার কাছে অর্থ দাবির অভিযোগ, যেখানে আইনি কারণে ব্যাংকারের নাম প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি। রোজ থাইল্যান্ডে ছুটিতে গিয়ে ব্যাংকারের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পর ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে হংকং সফরে যান।
যোগাযোগের ধারাবাহিকতায় ব্যাংকার তাকে হংকংয়ে আমন্ত্রণ জানান এবং বিমানের টিকিটের খরচ বহনের প্রস্তাব দেন। রোজের দাবি, হংকংয়ে নামার প্রায় ১২ ঘণ্টা পর ওই ব্যাংকারের ফ্ল্যাটে তিনি ধর্ষণের শিকার হন এবং বিষয়টি পুলিশকে জানান। পুলিশ প্রথমে ওই পুরুষকে গ্রেফতার করলেও পরে তাকে ছেড়ে দিয়ে রোজকে গ্রেফতার করে। পরবর্তীকালে তার বিরুদ্ধে ব্ল্যাকমেইল ও বিচার প্রক্রিয়ায় বিঘ্ন ঘটানোর অভিযোগ আনা হয়। ধর্ষণ প্রমাণের জন্য করা ফরেনসিক পরীক্ষা থেকে সুস্পষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি। ৩০০ পৃষ্ঠার রায়ে বিচারক জানান যে তিনি ব্যাংকারের বক্তব্য গ্রহণ করেছেন এবং রোজের সাক্ষ্য প্রত্যাখ্যান করেছেন। আদালতকে জানানো হয়, কথিত যৌন নির্যাতনের পর রোজ প্রথমে ৫,০০০ পাউন্ড এবং পরে পুলিশে অভিযোগ দেয়ার হুমকি দিয়ে ১,০০,০০০ পাউন্ড দাবি করেন, যা রোজ অস্বীকার করেন। রোজ জানান, এই অর্থ ছিল বিমান ভাড়া, থাকা-খাওয়া ও চিকিৎসা খরচের ক্ষতিপূরণ, যা তিনি নিজে থেকেই দেয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। বিচারক বলেন, দিন দিন অর্থ দাবির মাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় তা ব্ল্যাকমেইলের পর্যায়ে পড়ে। গ্রেফতারের পর রোজ জামিনে মুক্ত হলেও বিচারের অপেক্ষায় প্রায় দুই বছর হংকং ছাড়তে পারেননি।
মামলাটি লড়তে গিয়ে তাদের পরিবার হাজার হাজার পাউন্ড খরচ করেছে বলে জানায়। রোজ শুরু থেকেই নিজের নির্দোষ দাবি করে আসছেন। মামলাটিতে কথিত আক্রমণের পর রোজ ও ব্যাংকারের মধ্যে বিনিময় হওয়া হোয়াটসঅ্যাপ বার্তার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়। একটি বার্তায় রোজ লিখেছিলেন, তুমি গত রাতে আমার অনিচ্ছা সত্ত্বেও আমার সঙ্গে যৌন সম্পর্ক করে আমার সঙ্গে জঘন্য কাজ করেছ। জবাবে ব্যাংকার লিখেছিলেন, আমি সত্যিই দুঃখিত। আমি কিছুটা মাতাল ছিলাম এবং তোমার সংকেত বুঝতে ভুল করেছিলাম, তবে এটি কোনো অজুহাত হতে পারে না এবং পরিস্থিতি এতে ভালো হয় না। পরবর্তীতে ব্যাংকার আদালতকে বলেন, রোজের লেখা বার্তার অর্থ তিনি আবেগের দিক থেকে অপমান হিসেবে বুঝেছিলেন, ধর্ষণের অভিযোগ হিসেবে নেননি এবং তিনি দুটি ভাগে বার্তাটি পড়েছিলেন। বিচারক উল্লেখ করেন যে রোজ কিছু মেসেজ মুছে ফেলেছেন এবং অদৃশ্য হয়ে যাওয়া মেসেজ (ডিসঅ্যাপেয়ারিং টেক্সট) বৈশিষ্ট্যটি ব্যবহার করেছেন। ব্যাংকার অভিযুক্তের প্রতি অত্যন্ত সহানুভূতিশীল ছিলেন দাবি করে বিচারক বলেন, রোজ তার এই সরলতা, বন্ধুত্ব ও ভালোবাসার সুযোগ নিয়েছেন। সাজা কমানোর জন্য রোজের আইনি দলের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে বিচারক তার আচরণকে হিংসাত্মক ও দুষ্ট প্রকৃতির বলে বর্ণনা করেন।
অধিকারকর্মীরা বলেছেন, এই মামলাটি যৌন নির্যাতনের পর ভুক্তভোগীর আচরণ আদালতে যেভাবে মূল্যায়ন করা হয় সে বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করে। তাদের মতে, আঘাতের পরবর্তী অনিশ্চিত আচরণ ট্রমার প্রমাণ, কোনো বানোয়াট তথ্য নয়। পারিবারিক সহিংসতা ও যৌন নির্যাতনের শিকার আফ্রিকান ও ক্যারিবীয় ঐতিহ্যের নারীদের সহযোগিতাকারী লন্ডনভিত্তিক সংস্থা সিস্টা স্পেস-এর প্রতিষ্ঠাতা এনগোজি ফুলানি বলেন, আমরা এমন এক বিশ্বে বাস করি যেখানে মানুষ মনে করে ধর্ষণের প্রতিক্রিয়ার একটি নির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে, কিন্তু তা সত্য নয়। এখানে একজন ভুক্তভোগীকেই ভুক্তভোগী হওয়ার জন্য দায়ী করা হয়েছে। বৃটেনের পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, তারা হংকংয়ে আটকে থাকা ওই বৃটিশ নারীকে সহায়তা করছে এবং তার পরিবার ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে।
