প্রায় এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ডেঙ্গু প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় শ্রীলঙ্কা নতুন কৌশল নিয়েছে। দেশটির সামরিক বাহিনী এখন ড্রোন ব্যবহার করে ভবনের ছাদ, নির্মাণাধীন এলাকা এবং অন্যান্য স্থানে জমে থাকা পানির উৎস শনাক্ত করছে। এসব স্থানে এডিস মশা বংশবিস্তার করে। চলতি বছর দক্ষিণ এশিয়ার দেশটিতে ডেঙ্গুতে ৫৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। ৭৭ হাজারের বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন। শুধু জুলাই মাসেই মোট আক্রান্তের এক-চতুর্থাংশের বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছে। ডেঙ্গু হলো একটি ভাইরাসজনিত জ্বর, যা সংক্রমিত এডিস মশার কামড়ে মানুষের শরীরে ছড়ায়। এডিস মশা সাধারণত বালতি, ফুলের টবের নিচের প্লেট, ফুলদানি বা অন্য যেকোনো স্থির পানিতে ডিম পাড়ে। এরা মূলত দিনের বেলায় সক্রিয় থাকে এবং সূর্যোদয়ের পর ও সূর্যাস্তের আগে বেশি কামড়ায়। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত অনেকের কোনো লক্ষণই দেখা যায় না। তবে যাদের লক্ষণ দেখা দেয়, তাদের মধ্যে সাধারণত থাকে উচ্চ জ্বর, তীব্র মাথাব্যথা, পেশি ও জয়েন্টে ব্যথা, বমি বমি ভাব, ত্বকে র্যাশ ও বেশিরভাগ রোগী এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে সুস্থ হয়ে ওঠেন। তবে গুরুতর ক্ষেত্রে ডেঙ্গু অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ, শক সিনড্রোম বা মৃত্যুর কারণ হতে পারে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি।
দ্বিতীয়বার আক্রান্ত হলে ঝুঁকি বেশি কেন?
ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি পৃথক ধরন (সেরোটাইপ) রয়েছে। শ্রীলঙ্কার ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ ইউনিটের পরিচালক কাপিলা কান্নাঙ্গারা বলেন, একবার একটি ধরনে আক্রান্ত হয়ে সুস্থ হলে শুধু সেই নির্দিষ্ট ধরনটির বিরুদ্ধেই রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়। অন্য তিনটি ধরন থেকে সুরক্ষা পাওয়া যায় না। ফলে অন্য কোনো ধরনে আবার আক্রান্ত হলে রোগ আরও গুরুতর হতে পারে।
ডেঙ্গুর চিকিৎসা কী?
এখনও ডেঙ্গুর জন্য সব ধরনের ভাইরাসের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো সার্বজনীন টীকা নেই। সাধারণত প্যারাসিটামল দিয়ে জ্বর ও ব্যথা নিয়ন্ত্রণ করা হয়। গুরুতর রোগীদের হাসপাতালে ভর্তি রেখে নিবিড় পর্যবেক্ষণে চিকিৎসা দেয়া প্রয়োজন। কারণ জটিলতা প্রাণঘাতী হতে পারে।
শ্রীলঙ্কায় কেন বেড়েছে ডেঙ্গু?
শ্রীলঙ্কার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের মতে, গত ডিসেম্বরে দেশটিতে আঘাত হানা একটি ঘূর্ণিঝড়ের পর বিভিন্ন জায়গায় জমে থাকা ধ্বংসাবশেষে পানি জমে নতুন নতুন মশার প্রজননক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার সামরিক বাহিনীকে ড্রোন দিয়ে বাড়ির ছাদ, স্কুল ও নির্মাণাধীন এলাকা পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব দিয়েছে। পুলিশকে বাড়ি বাড়ি গিয়ে পরিদর্শনের নির্দেশ দিয়েছে। চলতি মাসেই প্রায় ১১ হাজার মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করেছে। ৪ হাজারের বেশি স্থাপনার মালিককে জরিমানা করেছে। দেশজুড়ে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়লেও রাজধানী কলম্বোসহ শহরাঞ্চলে আক্রান্তের সংখ্যা বেশি। হাসপাতালগুলোতে অতিরিক্ত শয্যা যুক্ত করা হয়েছে এবং চিকিৎসাকর্মীদের কর্মঘণ্টাও বাড়ানো হয়েছে। জাতীয় ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ ইউনিটের পরিচালক কাপিলা কান্নাঙ্গারা রয়টার্সকে বলেন, রোগীর সংখ্যা যেমন বেশি, তেমনি গুরুতর রোগীর সংখ্যাও উদ্বেগজনক। তার মতে, প্রায় ৭৫ শতাংশ রোগী বেশি মারাত্মক ডেঙ্গু ভাইরাসের একটি ধরনে আক্রান্ত। হাসপাতালের সক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কারণে হালকা উপসর্গের রোগীদের বাড়িতে বিশ্রাম নিয়ে সুস্থ হওয়ার পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। এ ছাড়া সরকার ডেঙ্গুর টীকা ব্যবহারের বিষয়টিও বিবেচনা করছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, ভাইরাসের চারটি পৃথক ধরন থাকায় কার্যকর টীকা তৈরি করা অত্যন্ত কঠিন। এটি অবশ্য শ্রীলঙ্কায় প্রথম বড় ডেঙ্গু মহামারি নয়। ২০১৭ সালে প্রবল মৌসুমি বৃষ্টিপাতের পর ডেঙ্গুতে ৪৫০ জনের মৃত্যু হয়।
বিশ্বজুড়ে কেন বাড়ছে ডেঙ্গু?
ডেঙ্গু সাধারণত উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়ার দেশগুলোতে বেশি দেখা যায়। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, লাতিন আমেরিকা এবং ক্যারিবীয় অঞ্চলে ডেঙ্গুর প্রকোপ সবচেয়ে বেশি। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা বাড়ছে। ফলে এডিস মশা এখন ইউরোপ ও ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলসহ নতুন নতুন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে। একই সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী ও বেশি বৃষ্টিপাতের মৌসুম মশার বংশবিস্তারের জন্য আরও অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জানিয়েছে, গত ৫০ বছরে বিশ্বে ডেঙ্গুর প্রকোপ ৩০ গুণ বেড়েছে। সংস্থাটি ডেঙ্গুকে বিশ্বের শীর্ষ ১০টি জনস্বাস্থ্য হুমকির একটি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ২০০০ সালে বিশ্বে ডেঙ্গুর রিপোর্ট হওয়া রোগীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৫ লাখ। ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ৪৪ লাখে। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠী ডেঙ্গু সংক্রমণের ঝুঁকিতে।
ডেঙ্গু প্রতিরোধের উপায়
ডেঙ্গু প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা। এজন্য ফুলের টবের নিচের প্লেটের পানি নিয়মিত ফেলে দিতে হবে। অব্যবহৃত বালতি, টব বা পাত্র উল্টে রাখতে হবে। যেখানেই পানি জমতে পারে, তা দ্রুত পরিষ্কার করতে হবে। এ ছাড়া কিছু দেশ ওলবাকিয়া নামের একটি প্রাকৃতিক ব্যাকটেরিয়া ব্যবহার করছে। এটি মশাকে মেরে ফেলে না, তবে মশার মাধ্যমে ডেঙ্গু ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেয়।
