ছাত্রদের দাবির তোয়াক্কা না করে সরকার জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছে: নাহিদ

ফন্ট সাইজ:

ছাত্রদের দাবির তোয়াক্কা না করে সরকার জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেছেন, আমাদের যে দাবিগুলো ছিল সংস্কার, বিচার, অর্থনৈতিক লুটপাটের বিচার, ফ্যাসিবাদ এবং আধিপত্যবাদের কবর রচনা করাÑসেই সবকিছুকে তোয়াক্কা না করে যারা সরকার দলে রয়েছে, তারা জনগণের বিরুদ্ধে আবার অবস্থান নেয়ার চেষ্টা করছে। জাতীয় ছাত্রশক্তির প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে গতকাল বিকালে রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
নাহিদ বলেন, বিএনপি বিনা কারণ ও বিনা অভিযোগে ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরকে সরিয়ে দিলো। বিচারে তাদের নানা ধরনের হস্তক্ষেপের কথা আমরা শুনতে পাচ্ছি। যারা ভিকটিম ও সাক্ষী ছিলেন, তাদের নানা ধরনের হুমকি দেয়া হচ্ছে। এই সরকারের আমলে সুষ্ঠুভাবে বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে কি না- তা নিয়ে জনগণের মনে সন্দেহ রয়েছে। এসময় তিনি ট্রাইব্যুনালে হস্তক্ষেপ না করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি বলেন, আমরা যখন গণ-অভ্যুত্থান করেছিলাম, তখন একটা কথা খুব স্পষ্টভাবে বলেছিলাম যে, আমরা কেবল শেখ হাসিনার পতন চাই না। আমরা পুরোনো রাজনৈতিক বন্দোবস্তের পতন চাই। আমরা এমন একটা বন্দোবস্ত প্রতিষ্ঠা করতে চাই যেখানে বারবার বাংলাদেশকে স্বৈরাচারের কবলে পড়তে হবে না। এ দেশের ছাত্র-জনতাকে বারবার রাজপথে জীবন দিতে হবে না। এ দেশে বৈষম্য দূর হবে, মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে। এ দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং জাতীয় মর্যাদা নিশ্চিত হবে। বাংলাদেশ কারও তাঁবেদার রাষ্ট্রে পরিণত হবে না। এগুলো ছিল আমাদের আকাক্সক্ষা ও প্রতিশ্রুতি।
এনসিপি আহ্বায়ক বলেন, বাংলাদেশ যখন সংকটে পড়েছে, তখনই ছাত্ররা এগিয়ে এসেছে। কিন্তু ছাত্রদের সঙ্গে বারবার প্রতারণা হয়েছে। নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক দলগুলো ছাত্রদের সঙ্গে প্রতারণা করেছে। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পরও একই চিত্র আমরা দেখতে পেয়েছি। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে জীবন দিয়েছে ছাত্র ও সাধারণ মানুষ। কিন্তু তার ফল ভোগ করছে এখন নানান রাজনৈতিক শক্তিগুলো। সংস্কার ও বিচারের যে দাবিগুলো আমাদের ছিল, সেগুলোকে তোয়াক্কা না করে সরকারি দল জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ার চেষ্টা করছে।
সংস্কার পরিষদে বিএনপি’র শপথ না নেয়ার সমালোচনা করে তিনি বলেন, এর মাধ্যমে বিএনপি গণরায়ের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। সংস্কার পরিষদের শপথ গ্রহণ না করে আওয়ামী লীগের মতো সংবিধানের দোহাই দিয়ে বিএনপি শপথ নেয়নি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে সরিয়ে দেয়ার বিষয়ে নাহিদ বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে নির্লজ্জভাবে মব তৈরি করে অগণতান্ত্রিকভাবে সরিয়ে দিয়ে একজন ঋণখেলাপি ব্যবসায়ীকে গভর্নর করা হয়েছে। বিগত সময়ে এ দেশের ৩০ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে নিয়োগপ্রাপ্ত গভর্নর চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন সেই টাকা ফিরিয়ে আনার। পাশাপাশি এই লুটপাটের সঙ্গে জড়িতদের বিচারের আওতায় আনার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু আমরা দেখছি যে, সেই বিচার প্রক্রিয়া ভণ্ডুল করতে, ঋণখেলাপিদের আরও সুযোগ-সুবিধা করে দিতে এবং আর্থিক লুটপাটের পথকে প্রশস্ত করতে বাংলাদেশ ব্যাংক দখলের নির্লজ্জ চেষ্টা করলো সরকারি দল। তিনি বর্তমান গভর্নরকে সরিয়ে দক্ষ, যোগ্য ও সৎ ব্যক্তিকে গভর্নর করার আহ্বান জানান।
এনসিপি’র আহ্বায়ক বলেন, বিএনপি নির্বাচনের আগে এক ধরনের কথা বলেছে, পরে আরেক রকম কথা বলছে। এ বিষয়ে নির্বাচনের আগেই জনগণকে সতর্ক করেছিলাম। আমরা জানি, জনগণ তাদের বিপক্ষে ভোট দিয়েছে। কিন্তু নানান ইঞ্জিনিয়ারিং করে তারা ফলাফলটাকে নিজেদের পক্ষে নিতে সক্ষম হয়েছে। সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ সংসদ সদস্যের পদ নিজেদের আওতায় করেছে, যাতে তারা নিজের মতো আইন ও বিচার তৈরি করতে পারে। যেমনটা ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ বিরোধী দলকে দূরে সরিয়ে রেখে সংবিধানকে নিজেদের মতো করে দেশ পরিচালনা করেছে। আজকের সরকারি দল আওয়ামী লীগের পথেই হাঁটছে।
বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ বলেন, সংস্কার প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন হতেই হবে। যদি সংসদে না হয়, তাহলে সেই লড়াই রাজপথে গড়াবে। আমরা সেই লড়াই রাজপথে গড়াতে চাই না। মানুষ ভোট দিয়েছেন। যেমনই হোক, সেই ফলাফলকে মেনে নিয়ে আমরা সংসদে গিয়েছি। সংসদে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে আমরা সমস্যার সমাধান করবো। সংসদে অবশ্যই সংস্কার পরিষদ হতে হবে। তা না হলে আমরা রাজপথে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি।
তিনি বলেন, শোনা যাচ্ছে যে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে পুলিশ হত্যার তদন্ত করা হবে। এই বিচার যদি নিশ্চিত করতে হয়, তাহলে গণ-অভ্যুত্থানে নিহত ও আহতদের বিচার আগে নিশ্চিত করতে হবে। এই অপরাধে পুরো পুলিশ বাহিনী দায়ী ছিল। তবে আমরা পুরো বাহিনীকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাইনি। আমরা কেবল অভিযুক্তদের বিচারের আওতায় আনতে বলেছি। পুরো পুলিশ বাহিনীকে সংস্কার করে মানুষের বন্ধু হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
ছাত্রশক্তির সভাপতি জাহিদ আহসানের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক আবু বাকের মজুমদারের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন এনসিপি’র সদস্য সচিব আখতার হোসেন, উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম, যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার, যুগ্ম সদস্য সচিব আবদুল্লাহ আল আমিন, যুবশক্তির আহ্বায়ক এডভোকেট তারিকুল ইসলাম, ছাত্রশক্তির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ সম্পাদক আল আমিন সরকার প্রমুখ।


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন