সীমান্ত অঞ্চলগুলোতে দৃষ্টি দেয়া জরুরি

স্টেটসম্যানের সম্পাদকীয়

সীমান্ত অঞ্চলগুলোতে দৃষ্টি দেয়া জরুরি

ফন্ট সাইজ:

সীমান্ত অঞ্চল জুড়ে যখন রাজনীতি পরিবর্তন হয়, তা সচরাচর কেবল আদর্শগত পরিবর্তনের গল্প নয়। বরং সেটি উপস্থিতির গল্প- কে মাঠে আছে, কে মানুষের কথা শুনছে, আর দূরবর্তী রাষ্ট্র যে ফাঁকা জায়গা ফেলে রেখেছে তা কে পূরণ করছে। বাংলাদেশের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের কিছু জেলায়, ভারতের দীর্ঘ সীমান্তঘেঁষা অঞ্চলে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সাম্প্রতিক নির্বাচনী অগ্রগতি নাটকীয় আদর্শগত বাঁক নয়; বরং এটি স্মরণ করিয়ে দেয় যে, অবহেলিত অঞ্চলগুলো শেষ পর্যন্ত নিজেদের মতো করে রাজনীতিকে পুনর্গঠন করে।

ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত ঘেঁষে থাকা রংপুর, রাজশাহী এবং খুলনা- এই জেলাগুলো দীর্ঘদিন ধরেই জাতীয় উন্নয়নের মূল স্রোতের বাইরে পড়ে আছে। এগুলো এমন স্থান, যেখানে অবকাঠামো দুর্বল, জনসেবা খণ্ডিত, আর তরুণদের কাছে সুযোগের চেয়ে প্রবাসগমনই যেন একমাত্র পথ। সীমান্তের ওপারে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও আসামও একই ধরনের চাপে জর্জরিত। আছে কর্মসংস্থান সংকট, নাগরিকত্ব বিতর্ক, আর ছিদ্রযুক্ত সীমান্ত পেরিয়ে মানুষের চলাচল নিয়ে উদ্বেগ। এমন বাস্তবতায় রাজনীতি হয়ে ওঠে তীব্রভাবে স্থানীয় ইভেন্টকেন্দ্রিক, যদিও এর আন্তর্জাতিক পরিণতি আছে। এসব সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে জামায়াতের সাফল্য একটি পরিচিত রাজনৈতিক ধারার দিকে ইঙ্গিত করে। যেখানে রাষ্ট্রের উপস্থিতি ক্ষীণ এবং মূলধারার দলগুলো বিশ্বাসযোগ্যতা হারায়, সেখানে ভোটাররা এমন সংগঠনকে পুরস্কৃত করে যারা মাঠে থাকে- সেবা দেয়, শৃঙ্খলা বজায় রাখে, স্থানীয়ভাবে সংগঠিত থাকে। ঢাকায় বসে তৈরি করা স্লোগানের চেয়ে স্থানীয় ক্লিনিক, স্কুল, ত্রাণ কার্যক্রম ও নিবিড় সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক অনেক বেশি কার্যকর হয়ে ওঠে।

বহু বছর ধরে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল জাতীয় রাজনীতিতে প্রাধান্য বিস্তার করেছে। কিন্তু কেন্দ্রের প্রভাব স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রান্তিক পর্যায়ে আস্থা তৈরি করে না। ভারতের ক্ষেত্রে সীমান্তের কাছে কোনো ইসলামপন্থি দলের উত্থানকে নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হবে। অভিবাসন বিতর্ক, বিশেষ করে আসামে নাগরিকপঞ্জি (এনআরআই) নিয়ে বিতর্ক, কিংবা পশ্চিমবঙ্গে সময় সময় উত্তেজনা- এসব ইতিহাস সেই প্রতিক্রিয়াকে বোধগম্য করে তোলে। তবে অতিরঞ্জিত আশঙ্কা বাস্তবতাকে আড়াল করতে পারে। নির্বাচনী মানচিত্র কোনো ব্যাপক আদর্শিক রূপান্তরের ইঙ্গিত দেয় না; বরং দেখায় স্থানীয় অসন্তোষের পকেট, যেখানে শাসনব্যবস্থা দূরবর্তী মনে হয় আর বিকল্পগুলো স্পর্শযোগ্য হয়ে ওঠে। ঢাকার জন্য এই বার্তাটি প্রতিরক্ষামূলক হওয়ার চেয়ে আত্মসমালোচনামূলক হওয়া উচিত। সীমান্তবর্তী জেলাগুলোকে প্রায়শই ‘বাফার’ অঞ্চল হিসেবে দেখা হয়- নিরাপত্তা ব্রিফিংয়ে গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু উন্নয়ন পরিকল্পনায় কম জরুরি। অথচ সড়ক, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও স্থানীয় কর্মসংস্থানই একটি সীমান্তকে স্থিতিশীল করে, স্থিতিশীলতা নিয়ে বক্তৃতা নয়।

যদি ভোটাররা শক্তিশালী তৃণমূল কাঠামোসম্পন্ন দলের দিকে ঝুঁকে থাকে, তার কারণ দৈনন্দিন শাসনব্যবস্থা মানুষের দৈনন্দিন চাহিদার সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি। নয়াদিল্লির দিক থেকেও গত এক দশকে বাণিজ্য, ট্রানজিট রুট ও নিরাপত্তা সহযোগিতার মাধ্যমে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক উন্নয়নে বড় বিনিয়োগ হয়েছে। এই কাঠামো টেকসই হতে পারে- কিন্তু তখনই, যখন দুই পক্ষই মনে রাখবে যে সীমান্ত কেবল টহল ও প্রটোকল দিয়ে পরিচালিত হয় না। এটি পরিচালিত হয় জীবিকা, প্রাতিষ্ঠানিক আস্থা এবং সেই নীরব বিশ্বাস দিয়ে যে, রাজনীতি এখনো ফল দিতে পারে। সীমান্তঘেঁষা অঞ্চলগুলোর প্রকৃত বার্তা আদর্শিক নয়; এটি প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক। প্রান্তিক অঞ্চলকে দীর্ঘদিন উপেক্ষা করলে, তারাই একসময় নিজের রাজনৈতিক কাহিনী নিজে লিখতে শুরু করে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন