'শ্বেত অস্ট্রেলিয়া’ নীতি ঘিরে নতুন বিতর্ক অভিবাসন রাজনীতিতে উত্তাপ

ফন্ট সাইজ:

অস্ট্রেলিয়ার অভিবাসন রাজনীতিতে আবারও আলোচনায় উঠে এসেছে দেশটির ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত অধ্যায়-‘শ্বেত অস্ট্রেলিয়া’ (White Australia) নীতি। কট্টর ডানপন্থী রাজনৈতিক দল ওয়ান নেশনের নেত্রী পলিন হ্যানসনের সাম্প্রতিক একাধিক বক্তব্যকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।
যদিও অস্ট্রেলিয়া কয়েক দশক আগেই আনুষ্ঠানিকভাবে ‘শ্বেত অস্ট্রেলিয়া নীতি’ বাতিল করেছে। তবুও সাম্প্রতিক অভিবাসন বিতর্কে সেই নীতির ধারণা ও উত্তরাধিকার আবারও আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে। অনেকের মতে, বর্তমান রাজনৈতিক বক্তব্য ও অভিবাসনবিরোধী প্রচারণা সেই পুরোনো নীতির আদর্শকে নতুনভাবে উসকে দিচ্ছে।
ব্রিটিশ কট্টর ডানপন্থী অভিবাসনবিরোধী কর্মী ও সাজাপ্রাপ্ত অপরাধী টমি রবিনসনের একটি পডকাস্টে পলিন হ্যানসনের অংশগ্রহণকে ঘিরে বিতর্কের শুরু হয়। সেখানে তিনি বলেন, "সমস্যার শুরু হয়েছিল ১৯৭৩ সালে গফ হুইটলামের সময়, যখন ‘হোয়াইট অস্ট্রেলিয়া’ নীতি বাতিল করা হয়। এরপর বিভিন্ন দেশ থেকে ব্যাপক অভিবাসন শুরু হয়। এই বক্তব্য প্রকাশের পর দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক ভিডিওতে পলিন হ্যানসন বলেন, "আমি কখনোই ‘হোয়াইট অস্ট্রেলিয়া’ নীতির পক্ষে কথা বলিনি এবং আমি এ নীতিতে বিশ্বাসও করি না।"তবে তিনি অভিবাসন নীতিতে কঠোর অবস্থানের পক্ষে নিজের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন।
গত রবিবার চ্যানেল সেভেনের ‘স্পটলাইট’ অনুষ্ঠানে অস্ট্রেলিয়ায় গণ-নির্বাসনের ধারণা সম্পর্কে জানতে চাইলে পলিন হ্যানসন জবাবে বলেন, "আমি এটা ভালোবাসি।"
ওয়ান নেশন দলের ঘোষিত নীতিতে প্রায় ৭৫ হাজার অবৈধ অভিবাসীকে বহিষ্কারের কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে দলটি কিছু মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ থেকে অভিবাসন সীমিত করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
পলিন হ্যানসন দাবি করেন, তিনি কোনো ধর্মের বিরুদ্ধে নন। তবে "উগ্র ইসলামি মতাদর্শ" নিয়ে উদ্বিগ্ন। যদিও কোন কোন দেশের ক্ষেত্রে তিনি এই নিষেধাজ্ঞা চান, তার নির্দিষ্ট তালিকা প্রকাশ করেননি। এটি অবশ্য তার প্রথম বিতর্কিত মন্তব্য নয়। ২০১৬ সালে সিনেটে দেওয়া প্রথম ভাষণে তিনি কোনো তথ্য-প্রমাণ ছাড়াই বলেছিলেন, "অস্ট্রেলিয়া মুসলিমদের দ্বারা প্লাবিত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। যাদের সংস্কৃতি ও মতাদর্শ আমাদের সমাজের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
চলতি বছরের শুরুতে বিরোধীদলীয় নেতা অ্যাঙ্গাস টেলর অভিবাসীদের জন্য বাধ্যতামূলক 'অস্ট্রেলীয় মূল্যবোধ' পরীক্ষাচালুর প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন, "অভিবাসনের মানদণ্ড অত্যন্ত নিচে নেমে গেছে। মৌলবাদী, চরমপন্থী ও স্বৈরশাসিত দেশ থেকে আসা ব্যক্তিদের তুলনায় উদার গণতান্ত্রিক দেশ থেকে আসা মানুষ অস্ট্রেলীয় মূল্যবোধে বিশ্বাসী হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই প্রস্তাব জাতি, ধর্ম বা জাতীয়তার ভিত্তিতে বৈষম্য সৃষ্টি করবে না। অন্যদিকে গ্রিনস দল অভিযোগ করেছে, এই ধরনের প্রস্তাব আসলে পরোক্ষভাবে ‘শ্বেত অস্ট্রেলিয়া’ নীতির দর্শনকে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা।
অস্ট্রেলিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসবিদ বেঞ্জামিন টি জোন্স এসবিএসকে বলেন, "এই নীতির মূল বিশ্বাস ছিল অস্ট্রেলিয়াকে একটি সমজাতীয় শ্বেতাঙ্গ সমাজে পরিণত করা। বিশেষ করে ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত অভিবাসীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হতো, কারণ মনে করা হতো তারাই অস্ট্রেলীয় সমাজে সবচেয়ে সহজে মিশে যেতে পারবেন। ১৯০১ সালের ইমিগ্রেশন রেস্ট্রিকশন অ্যাক্ট-এর মাধ্যমে এ নীতির আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। আইনে যেকোনো ইউরোপীয় ভাষায় ৫০ শব্দের শ্রুতিলিখন পরীক্ষার বিধান ছিল। বাস্তবে এই পরীক্ষা নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে অস্ট্রেলিয়ায় প্রবেশে বাধা দেওয়ার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হতো। জোন্স আরো বলেন, "ইতিহাস দেখায়, নতুন অভিবাসী গোষ্ঠীকে ঘিরে প্রথমদিকে ভয় ও বর্ণবাদ দেখা দিলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তারাই সমাজ, অর্থনীতি ও জাতীয় জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে। তারা অস্ট্রেলিয়ায় বিনিয়োগ করে, সন্তানদের বড় করে, অর্থনীতিতে অবদান রাখে; এমনকি অনেকেই জাতীয় ফুটবল দলের প্রতিনিধিত্বও করেছে।
অস্ট্রেলিয়ার অভিবাসনের অর্থনৈতিক ইতিহাস নিয়ে গবেষক ও লেখক মার্ক কালি এসবিএসকে বলেন, "ডিকটেশন টেস্ট কখনোই পাস করার জন্য তৈরি করা হয়নি। এটি এমন একটি পরীক্ষা ছিল, যা মানুষকে ব্যর্থ করার উদ্দেশ্যেই তৈরি করা হয়েছিল। তিনি বলেন, পরীক্ষা তুলে নেওয়ার পরও দীর্ঘ সময় ধরে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বাইরে থেকে আসা মানুষের জন্য স্থায়ীভাবে অস্ট্রেলিয়ায় বসবাসের সুযোগ কার্যত সীমিত ছিল। মার্ক কালির মতে, ১৯৬০-এর দশক থেকে ধীরে ধীরে এই নীতির অবসান শুরু হয় এবং ১৯৭৫ সালের বর্ণবৈষম্যবিরোধী আইন কার্যকরের মাধ্যমে এর আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে। তিনি বলেন, "আজকের আইন, প্রশাসনিক কাঠামো ও আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতার বাস্তবতায় জন্মস্থান, জাতিসত্তা বা ধর্মের ভিত্তিতে মানুষকে বাদ দেওয়ার পুরোনো ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়া রাজনৈতিকভাবেও এবং আইনগতভাবেও প্রায় অসম্ভব।
জনসংখ্যাবিদ লিজ অ্যালেনের মতে, ‘শ্বেত অস্ট্রেলিয়া’ নীতির মানসিক প্রভাব পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি।
তিনি বলেন, "অস্ট্রেলিয়া এখনও এমন কিছু ধারণা বহন করে, যেন এটি কেবল শ্বেতাঙ্গদের দেশ। অথচ আমাদের একটি আদিবাসী ইতিহাস রয়েছে এবং আমরা ভৌগোলিকভাবে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অংশ। তিনি আরও বলেন, 'অস্ট্রেলীয় মূল্যবোধ' বলতে ঠিক কী বোঝায়, সেটির কোনো আনুষ্ঠানিক সংজ্ঞা নেই। এই অস্পষ্টতাই অভিবাসন বিতর্ককে আরও জটিল করে তুলছে।
প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি অ্যালবানিজ বলেছেন, 'শ্বেত অস্ট্রেলিয়া' নীতি থেকে সরে আসা শুধু লেবার পার্টির সিদ্ধান্ত ছিল না; এটি ছিল একটি দ্বিদলীয় জাতীয় সিদ্ধান্ত। তিনি বলেন, "আদিবাসী জনগোষ্ঠী ছাড়া আধুনিক অস্ট্রেলিয়া গড়ে উঠেছে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা মানুষদের অবদানে। তারা নিজেদের এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি উন্নত জীবন গড়তে এখানে এসেছে, আর তাদের অবদানেই আজকের বহুসংস্কৃতির অস্ট্রেলিয়া গড়ে উঠেছে।"
বিশেষজ্ঞদের অভিমত, অভিবাসন নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক অস্ট্রেলিয়ায় ভবিষ্যতেও চলবে। তবে বর্তমান সংবিধান, বৈষম্যবিরোধী আইন, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার অঙ্গীকার এবং বহুসংস্কৃতিবাদভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থার কারণে ‘শ্বেত অস্ট্রেলিয়া’ নীতির মতো বৈষম্যমূলক অভিবাসন ব্যবস্থা পুনরায় কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ। তাদের মতে, বর্তমান বিতর্ক মূলত অভিবাসনের পরিমাণ, নিরাপত্তা ও জাতীয় পরিচয় নিয়ে রাজনৈতিক অবস্থানকে কেন্দ্র করে। অতীতের বৈষম্যমূলক নীতিতে বাস্তবিক অর্থে ফিরে যাওয়ার নয়।

Anwarul Azam

৮ ঘন্টা আগে

শ্বেত অস্ট্রেলিয়া।।। আরও কত কি শুনতে হবে।

মন্তব্য করুন