দেশে পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু প্রতিরোধ কার্যক্রমকে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই করতে সরকারি অর্থায়নের পাশাপাশি বেসরকারি খাত, স্থানীয় সরকার, উন্নয়ন সহযোগী, গণমাধ্যম ও অন্যান্য অংশীজনের কার্যকর অংশগ্রহণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বিশিষ্টজনরা।
রোববার রাজধানীর ডেইলি স্টার সেন্টারে আয়োজিত ‘পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু প্রতিরোধ ও শিশু সুরক্ষায় টেকসই অর্থায়ন’ শীর্ষক অংশীজন সংলাপে বক্তারা বলেন, পানিতে ডুবে মৃত্যু একটি প্রতিরোধযোগ্য সমস্যা হলেও ধারাবাহিক অর্থায়ন কাঠামোর অভাবে কার্যকর উদ্যোগগুলো দীর্ঘমেয়াদে পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
গণমাধ্যম ও যোগাযোগবিষয়ক উন্নয়ন সংগঠন সমষ্টি মিডিয়া কমিউনিকেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের আয়োজনে এবং যুক্তরাষ্ট্রের গ্লোবাল হেলথ এডভোকেসি ইনকিউবেটরের সহযোগিতায় আয়োজিত এ সংলাপে সরকারি কর্মকর্তা, বেসরকারি খাতের প্রতিনিধি, উন্নয়ন সহযোগী, গণমাধ্যম প্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা অংশ নেন।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য ও সংলাপের প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন সমষ্টির নির্বাহী পরিচালক মীর মাসরুজ্জামান। তিনি বলেন, বাংলাদেশে প্রতিদিন গড়ে ৪০ জন শিশু পানিতে ডুবে মারা যাচ্ছে, কিন্তু এই নীরব সংকট যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে না। তিনি উল্লেখ করেন, অধিকাংশ শিশু সকাল ৯টা থেকে দুপুর ২টার মধ্যে মারা যায়, যখন অভিভাবকেরা কাজে ব্যস্ত থাকেন এবং শিশুর নিরাপদ তত্ত্বাবধানের সুযোগ কম থাকে। তিনি বলেন, একটি শিশু শুধু বড় জলাশয়ে নয়, অল্প পানিতেও ডুবে মারা যেতে পারে। তাই ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধে নিরাপদ তত্ত্বাবধানের ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সমষ্টির গবেষণা ও যোগাযোগ পরিচালক রেজাউল হক বাংলাদেশে পানিতে ডুবে মৃত্যুর পরিস্থিতি, জাতীয় কর্মকৌশল, বর্তমান অর্থায়ন কাঠামো এবং বেসরকারি খাতসহ অন্যান্য অংশীজনদের সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে উপস্থাপনা করেন। তিনি জানান, জাতীয় কর্মপরিকল্পনায় ২০৩০ সালের মধ্যে ডুবে মৃত্যু ৫০ শতাংশ কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বর্তমানে প্রতিবছর ১৮ হাজারের বেশি মানুষ মারা যাচ্ছে। তবে বাস্তবায়নের জন্য অর্থের উৎস, বাজেট লাইন ও ব্যয়-ট্র্যাকিং ব্যবস্থা আরও স্পষ্ট করা প্রয়োজন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. কাজী মারুফুল ইসলাম বলেন, পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধকে শুধু একটি প্রকল্প হিসেবে নয়, বরং একটি ধারাবাহিক সামাজিক সেবা হিসেবে দেখতে হবে। তিনি স্থানীয় সরকার কাঠামোকে কাজে লাগানো এবং বিদ্যমান ব্যবস্থার সঙ্গে এই কার্যক্রম যুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেন।
অর্থ বিভাগের উপ-সচিব জামিরা শবনম ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাকে অগ্রাধিকার দিয়ে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধে কেন্দ্রীয় সরকারের পাশাপাশি স্থানীয় সরকার ও অন্যান্য অংশীজনের সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন।
ঢাকা ট্রিবিউনের সম্পাদক রিয়াজ আহমদ বলেন, চলমান প্রকল্পগুলো বন্ধ না করে প্রয়োজন অনুযায়ী সম্প্রসারণ করা জরুরি। তিনি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাভিত্তিক পরিকল্পনা এবং ডুবে মৃত্যুর তথ্যভিত্তিক ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন।
সাদাকালোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক আজহারুল হক আজাদ বলেন, ডুবে মৃত্যু সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়ানো জরুরি। তিনি মনে করেন, গণমাধ্যম ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো সম্মিলিতভাবে কাজ করলে এ বিষয়ে বড় ধরনের সামাজিক উদ্যোগ তৈরি করা সম্ভব।
চর্চা ডটকমের সম্পাদক সোহরাব হাসান বলেন, ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সামাজিক উদ্যোগকে আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। তিনি স্থানীয় পর্যায়ে বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দেয়ার ওপর গুরুত্ব দেন।
নগদের হেড অব পাবলিক কমিউনিকেশন্স জাহিদুল ইসলাম সজল বলেন, বেসরকারি খাতকে যুক্ত করতে হলে বিষয়টির সামাজিক গুরুত্ব ও দৃশ্যমান প্রভাব তুলে ধরতে হবে। তিনি বলেন, “কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোকে যুক্ত করতে হলে তাদের কাছে বিষয়টির গুরুত্ব এবং অংশগ্রহণের সুযোগ স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে হবে।” তিনি ডিজিটাল প্ল্যাটফরম ব্যবহার করে জনসম্পৃক্ততা ও অর্থ সংগ্রহের সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করেন।
মানবজমিনের বার্তা সম্পাদক কাজল ঘোষ, দৈনিক ইত্তেফাকের স্টাফ রিপোর্টার রাবেয়া বেবী, প্রথম আলো’র সহকারী বার্তা সম্পাদক পার্থ শংকর সাহা, চ্যানেল আইয়ের স্টাফ রিপোর্টার জাহিদ রহমান, আগামী সময়ের সাইদুজ্জামান রওশনসহ গণমাধ্যম প্রতিনিধিরা ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধে গণমাধ্যমের ভূমিকা, জনসচেতনতা এবং নীতি পর্যায়ে বিষয়টি তুলে ধরার গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করেন।
