তেলাপোকাদের এড়াতে চাইলেও শেষ অব্দি তাদের আঁচড় গিয়ে লেগেছে ভারতের ক্ষমতার কেন্দ্রস্থলে। সোমবার যন্তর মন্তর থেকে বিক্ষোভকারীদের মিছিল দিল্লি সংসদের সন্মুখে পৌঁছায়। সেখানে পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ হয় বিক্ষোভকারীদের। যদিও ভারতের তরুণদের নেতৃত্বাধীন আন্দোলন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) জানিয়েছে, তাদের দাবিগুলো সরকার বিবেচনা করে দেখবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তবে সামাজিক মাধ্যম থেকে জন্ম নেয়া এই আন্দোলন এখন ছড়িয়ে পড়েছে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে। সোমাবার আন্দোলনের এক পর্যায়ে পুলিশ টিয়ার গ্যাস এবং লাঠিচার্জ করে ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করা সত্ত্বেও হাজার হাজার বিক্ষোভকারী সংসদের দিকে মিছিল নিয়ে এগিয়ে যায়। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
কয়েক মাস ধরে চলা এই আন্দোলন ও বিক্ষোভকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির টানা তৃতীয় মেয়াদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সামাজিক মাধ্যমে লাখ লাখ তরুণের সমর্থন পাওয়ার পর আন্দোলনটি এখন বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোরও সমর্থন লাভ করছে। অনশনরত আন্দোলনকর্মী সোনাম ওয়াংচুককে গত শনিবার পুলিশ জোরপূর্বক হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর থেকে পরীক্ষা ব্যবস্থা সংস্কারের এই আন্দোলন আরও জোরদার হয়। তারা শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে একাট্টা হয়। আন্দোলনকারীদের মতে, গত মে মাসে চিকিৎসা বিজ্ঞানের জাতীয় প্রবেশিকা পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার কারণে প্রায় ২০ লাখ শিক্ষার্থীকে পুনরায় পরীক্ষা দিতে হয়েছিল এবং হতাশা থেকে কয়েকজন শিক্ষার্থী আত্মহত্যার পথ বেছে নেন যা ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থার গভীর দুর্নীতিরই প্রতিফলন। সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশনের উদ্বোধনী দিনে দিল্লির যন্তর মন্তর প্রতিবাদ স্থলে রাতভর অবস্থান নিয়ে হাজার হাজার তরুণ সমর্থক জড়ো হন। পরবর্তীতে তারা পার্লামেন্ট অভিমুখে মিছিল শুরু করেন। প্রতিবাদকারীরা হিন্দিতে স্লোগান দিয়ে বলতে থাকেন, পদত্যাগ করুন, পদত্যাগ করুন! ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করুন, নরেন্দ্র মোদি পদত্যাগ করুন! রাজধানীজুড়ে বিপুল সংখ্যক পুলিশ ও আধা-সামরিক বাহিনী মোতায়েন করা হয়, যারা জাতীয় পতাকা নিয়ে স্লোগান দিতে থাকা বিক্ষোভকারীদের বাধা দেয়।
মুম্বই, গোয়া ও ব্যাঙ্গালোরেও ছড়িয়েছে বিক্ষোভ
নয়াদিল্লি ছাড়াও ব্যাঙ্গালোর এবং মুম্বইয়ে ব্যাপক বিক্ষোভ প্রদর্শিত হয়েছে। মুম্বইয়ে পুলিশ কয়েকজন বিক্ষোভকারীকে আটক করে ভ্যানে তুলে নিয়ে যায়। গোয়ায় মোদির পদত্যাগের দাবিতে বেশ কিছু মানুষ মোমবাতি জ্বালিয়ে মিছিল ও স্লোগান দেন। সিজেপির জাতীয় মুখপাত্র আশুতোষ রাঙ্কা সোমবার সোশ্যাল মিডিয়া এক্সে দেওয়া এক পোস্টে জানান, ভারতের স্বাস্থ্যমন্ত্রী জে পি নাড্ডা আন্দোলনের দাবিগুলো নিয়ে সরকারের অভ্যন্তরে আলোচনার জন্য সময় চেয়েছেন। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে আন্দোলনের সংহতি জানিয়ে অনশনরত সামাজিক আন্দোলনকর্মী সোনাম ওয়াংচুককে অবিলম্বে মুক্তি দেওয়া, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ এবং প্রশ্ন ফাঁসের পর মানসিক আঘাতে প্রাণ হারানো শিক্ষার্থীদের পরিবারকে ১ কোটি রুপি করে ক্ষতিপূরণ দেওয়া। গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, এই ঘটনায় প্রায় ১২ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী নাড্ডা জানান, সিজেপি নেতারা মৌখিক আলোচনার পর সরকারের কাছে তাদের লিখিত স্মারকলিপি জমা দিয়েছেন। এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, আমি সমস্ত বিক্ষোভকারীদের তাদের অবস্থান কর্মসূচি শেষ করার এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে প্রশাসনকে সহযোগিতা করার জন্য অনুরোধ জানিয়েছি।
অনশন ভাঙতে শর্ত দিয়েছেন সমাজকর্মী ওয়াংচুক
গত মাসে সিজেপি’র প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ ডিপকে এবং তাঁর সমর্থকেরা শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে ধর্না (অবস্থান) কর্মসূচি শুরু করেন। পরবর্তীতে ২৮ জুন তাঁদের সাথে যোগ দেন প্রখ্যাত সমাজকর্মী সোনাম ওয়াংচুক। এরপর তিনি অনির্দিষ্টকালের জন্য অনশন শুরু করেন। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ওয়াংচুক এক হাতে লেখা চিঠিতে সোমবারের পার্লামেন্ট মিছিলে তাঁকে সাময়িকভাবে অংশ নেওয়ার অনুমতি দেওয়ার জন্য কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ জানিয়েছেন। এর আগে সোমবার সকালে ওয়াংচুক জানান, সরকার যদি শিক্ষা ব্যবস্থার সাম্প্রতিক ব্যর্থতা ও প্রশ্ন ফাঁসের দায় স্বীকার করে নেয়সহ তিনটি শর্ত মেনে নেয়, তবে তিনি অনশন ভাঙতে প্রস্তুত আছেন। তিনি আরও জানান, সরকারের প্রতিনিধি বা রাজনৈতিক দলের নেতারা হাসপাতালে এসে যদি এই শর্তগুলো পূরণের আশ্বাস দেন, তাহলেও তিনি তাঁর আন্দোলন স্থগিত করবেন।
